এইচ এম হাকিম:
সমবায় সমিতির নিবন্ধন, তদারকি, আইনগত পরামর্শ প্রদান এবং সমবায়ীদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দেশের তৃণমূল পর্যায়ে আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার কথা সমবায় অধিদপ্তরের। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর অনিয়ম, দুর্নীতি ও ক্ষমতার অপব্যবহারের কারণে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি ক্রমেই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এমনই একজন বিতর্কিত কর্মকর্তা হিসেবে সমবায় অধিদপ্তরের অতিরিক্ত নিবন্ধক (প্রশাসন, মাসউ ও ফাইন্যান্স) মো. নবীরুল ইসলামের নাম উঠে এসেছে। ২০তম বিসিএসের মাধ্যমে সমবায় অধিদপ্তরে যোগদানকারী এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে চাকরিতে প্রবেশের শুরু থেকেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র দাবি করেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, নবীরুল ইসলাম জালিয়াতির মাধ্যমে মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কোটা ব্যবহার করে সরকারি চাকরিতে প্রবেশ করেন। জানা যায়, সমবায় অধিদপ্তরে যোগদানের পূর্বে তিনি বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি)-এ কর্মরত ছিলেন এবং সেখানকার এক কর্মকর্তার সহযোগিতায় বিসিএস পরীক্ষায় অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে তার পিতা মৃত মো. সহিদুল ইসলামকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে দেখিয়ে চাকরিতে প্রবেশের অভিযোগ ওঠে।
এ বিষয়ে ২০০১ সালের ১২ ডিসেম্বর রাজধানীর কাফরুল থানায় একটি মামলা (মামলা নং-২৪) দায়ের হয়, যার তদন্তভার পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। দুদকের অভিযোগের ভিত্তিতে ২০০২ সালের ১৫ জুন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হলেও পরবর্তীতে বিভিন্ন প্রভাব খাটিয়ে তিনি দায়মুক্তি লাভ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এছাড়া ২০১১ সালে সিরাজগঞ্জে উপ-নিবন্ধক হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে সিরাজগঞ্জ কেন্দ্রীয় সমবায় ব্যাংকের ৬ শতক জমি বিক্রির মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় তার সম্পৃক্ততার অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় বিভাগীয় মামলা হলেও সেই তথ্য গোপন রেখে তিনি পরবর্তীতে পদোন্নতি গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে নবীরুল ইসলাম বদলি বাণিজ্য, পদোন্নতি বাণিজ্য, ঘুষ গ্রহণ, লাইসেন্স সিন্ডিকেটসহ নানা অনিয়মের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। অভিযোগ রয়েছে, বর্তমান সরকারের সময়ও তিনি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য গোপন করে অতিরিক্ত নিবন্ধক পদে পদোন্নতি নিয়েছেন।
অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা অভিযোগ করেছেন, দুর্নীতি দমন কমিশনসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার কাছে তার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকা সত্ত্বেও ব্যবস্থা না নেওয়ায় সৎ কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
রাজশাহীতে অনিয়মের অভিযোগ
২০১২ সালে রাজশাহী বিভাগীয় কার্যালয়ে দায়িত্ব পালনকালে বন্ধকী জমির ওপর অবৈধ স্থাপনা নির্মাণে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দিয়ে সমবায় ও সরকারের সম্পদ বেহাতের সুযোগ করে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে নবীরুল ইসলামের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন বিভাগীয় যুগ্ম নিবন্ধক এতে বাধা দিলে তাকেও লাঞ্ছিত করা হয়।
এছাড়া সমিতির নিবন্ধন, পরিদর্শন ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের নামে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
সিন্ডিকেটের সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, নবীরুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে সমবায় অধিদপ্তরের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে আসছে। এই সিন্ডিকেটের অন্যতম সদস্য হিসেবে উপজেলা সমবায় অফিসার আব্দুল্লাহ আল মামুনের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বদলির ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করতেন।
তহমিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ
সাবেক জেলা সমবায় কর্মকর্তা তহমিদুজ্জামানের বিরুদ্ধে কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি অ্যাপার্টমেন্ট মালিক সমিতির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
শাহবাগ থানায় দায়েরকৃত অভিযোগ অনুযায়ী, ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি পদপ্রার্থীদের কাছ থেকে নির্বাচনে বিজয়ী করার আশ্বাস দিয়ে পৃথকভাবে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ ওঠে। এক ভুক্তভোগী ব্যবসায়ী পরবর্তীতে দুদকে ফাঁদ মামলার আবেদন করেন।
অভিযোগ রয়েছে, তহমিদুজ্জামানের নির্দেশে ১৬ জুন ২০২৫ তারিখে বাংলামোটরে ওই ব্যবসায়ীর অফিসে ঘুষের অর্থ নিতে গেলে সমবায় অধিদপ্তরের পরিদর্শক শাহজাহান আলী, সহকারী পরিদর্শক শাখাওয়াত হোসেন এবং মনির হোসেন পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে এ ঘটনায় মামলা দায়ের হয় এবং সংশ্লিষ্টরা কারাভোগ করেন।
অভিযোগ রয়েছে, নবীরুল ইসলাম এখনও তার সহযোগী তহমিদুজ্জামানকে বিভাগীয় দায়মুক্তি দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন এবং তাকে পুনরায় ঢাকায় ফিরিয়ে আনার তদবির করছেন।
শিহাব উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে অভিযোগ
ঢাকার জেলা সমবায় কর্মকর্তা শিহাব উদ্দিন আহমেদের বিরুদ্ধে প্রায় ২২টি সমবায় সমিতি থেকে ভয়ভীতি প্রদর্শন ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রায় ১০ কোটি টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
ভুক্তভোগী সমিতিগুলো এ বিষয়ে পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় বিভাগের সচিব বরাবর লিখিত অভিযোগ দাখিল করে। অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রভাব খাটিয়ে তদন্ত কার্যক্রম ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
এ বিষয়ে ১ নং মুক্তিযোদ্ধা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতি মো. আলমাস হোসেন তুহিন শেরেবাংলা নগর থানায় সিআর মামলা নং-১৯৩/২০২৩ দায়ের করেন।
সাদ্দামের বিরুদ্ধে ঘুষ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ
নবীরুলের সিন্ডিকেট সদস্য জেলা সমবায় অফিসার সাদ্দামের বাড়ি গোপালগঞ্জ হওয়ায় বিগত দিনগুলোতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতা ও সরকারের প্রভাব বিস্তার করে দপ্তরটিতে নবীরুল কাণ্ড প্রচলিত রেখেছিলেন।
বিগত সময়ে সাদ্দামের বিরুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধা বহুমুখী সমবায় সমিতিতে দুর্নীতি ও ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
২০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ: শাহআলী থানাধীন ১ নং মুক্তিযোদ্ধা বহুমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সাধারণ নির্বাচন ষড়যন্ত্রমূলকভাবে বাতিল করে দীর্ঘ ৭ মাস কমিটিশূন্য রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর বিনিময়ে তিনি বহিরাগত ৯ ব্যক্তিকে সমিতিতে অবৈধভাবে সদস্যভুক্ত করার আদেশ দিয়ে ২০ লাখ টাকা ঘুষ গ্রহণ করেন।
দোকান ভেঙে হোটেল করার চুক্তি ও ২৫ লাখ টাকা আত্মসাৎ: সমিতির মালিকানাধীন ‘মুক্তিপ্লাজা শপিং কমপ্লেক্স’ অবৈধভাবে দখলে নিতে ভূমিদস্যু চক্রকে সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে। মার্কেটের ৪র্থ, ৫ম ও ৬ষ্ঠ তলায় সমিতির সদস্যদের নামে বরাদ্দকৃত দোকান ভেঙে আবাসিক হোটেল করার উদ্দেশ্যে ৫০ লাখ টাকার একটি অবৈধ চুক্তি সম্পাদন করান তিনি। এই মধ্যস্থতার অগ্রিম বাবদ ২৫ লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে তিনি স্ত্রীর চিকিৎসার কথা বলে থাইল্যান্ড ভ্রমণ করেন।
ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
থানা সমবায় অফিসার ফরহাদ হোসেনের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, তিনি ছাত্রলীগের সাবেক নেতা হওয়ার সুবাদে বিগত সরকারের আমলে অধিদপ্তরে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছেন। কর্ণফুলী গার্ডেন সিটি নির্বাচন এবং ম্যাক্সিম ফাইন্যান্স অ্যান্ড কমার্স মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেডকে কেন্দ্র করে আর্থিক অনিয়ম ও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের বক্তব্য অনুযায়ী, এসব ঘটনায় বিপুল অঙ্কের অর্থ লেনদেন হয়েছে।
আলাউদ্দিন মোল্লা
আলাউদ্দিন মোল্লা মেট্রোপলিটন থানা সমবায় অফিসার হিসেবে রমনায় পোস্টিং নেন। রাজউক, ওয়াসা ও অন্যান্য সমিতি থেকে শত কোটি টাকার বাণিজ্য করে বিশাল ফ্ল্যাট ও বসিলায় জায়গা ক্রয়সহ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন। অনিয়মের দায়ে রমনা থেকে বদলি করে ঢাকার বাইরে পোস্টিং হলে বিপুল পরিমাণ অর্থের বিনিময়ে লালবাগ মেট্রোপলিটন থানায় পোস্টিং নেন। বর্তমানে অন্যান্য মেট্রোপলিটন থানার পোস্টিং রক্ষা করবেন বলে সূত্রাপুর, মিরপুর ও গুলশান থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা উৎকোচ গ্রহণ করেন। ফ্যাসিস্ট আমলে নজরুল ইসলাম বাবুর ছত্রছায়ায় ঢাকা জেলায় চাকরি করেন।
তাসকেরা সুলতানার বিরুদ্ধে অভিযোগ
সমবায় অধিদপ্তরের পরিদর্শক তাসকেরা সুলতানার বিরুদ্ধে বিভিন্ন সমবায় সমিতির অডিট কার্যক্রমে অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, অনেক ক্ষেত্রে মাঠ পর্যায়ে সরেজমিনে যাচাই ছাড়াই অর্থের বিনিময়ে টেবিল অডিট সম্পন্ন করা হয় এবং ভুয়া প্রতিবেদন প্রদান করা হয়। এছাড়া নিয়মিত পরিদর্শনের দায়িত্ব থাকা সত্ত্বেও কিছু ভুঁইফোড় সমিতিকে অবৈধ সুবিধা দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ইলিয়াস সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ
মো. ইলিয়াস সরকার পূর্বে ঢাকা জেলা সমবায় কার্যালয়ে কর্মরত ছিলেন। বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলা হয় এবং পদোন্নতি স্থগিত ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে পরবর্তীতে প্রভাব খাটিয়ে তিনি পদোন্নতি নিয়ে পুনরায় ঢাকায় পদায়ন পান। অভিযোগ রয়েছে, অতীতে তিনি সাবেক সমবায় মন্ত্রীর আত্মীয় পরিচয় ব্যবহার করে প্রভাব বিস্তার করতেন এবং বর্তমানে রাজনৈতিক অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে নিজ অবস্থান টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন।
নাসির উদ্দিনের বিরুদ্ধে অভিযোগ
নাসির উদ্দিন সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর অভিযোগ, তিনি বিগত সরকারের আমলে শাহআলী ও মিরপুর থানায় দায়িত্ব পালন করেছেন এবং বর্তমানে পুনরায় শাহআলী থানায় পদায়ন হয়েছেন। তার বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতির বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
অভিযোগকারীদের ভাষ্যমতে, তার দায়িত্ব পালনকালীন সময়ে বিভিন্ন কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল এবং এসব বিষয়ে যথাযথ তদন্তের দাবি জানানো হয়েছে।
সমবায় অধিদপ্তরের একাধিক কর্মকর্তা ও ভুক্তভোগীদের দাবি, এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হলে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হবে।
এ বিষয়ে প্রতিবেদক নবীরুলের বক্তব্য চাইলে তিনি প্রতিবেদকের সঙ্গে অশালীন ভাষায় কথা বলেন এবং তার সিন্ডিকেটের সদস্য ইলিয়াস সরকারসহ অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিরা প্রাণনাশের হুমকি প্রদান করেন।