আবদুল গফুর হালীর ৯৮তম জন্মদিন আজ

স্টাফ রিপোর্টার:

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক সংগীত, মাইজভাণ্ডারী ও মরমী গানের কিংবদন্তি গীতিকার, সুরকার ও শিল্পী আবদুল গফুর হালীর ৯৮তম জন্মদিন আজ, বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট)। ১৯২৮ সালের এই দিনে চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার রশিদাবাদ গ্রামে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা আবদুস সোবহান এবং মা গুলতাজ খাতুন। দীর্ঘ ছয় দশকের সংগীতজীবনে অসামান্য অবদান রেখে ২০১৬ সালের ২১ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তবে তাঁর সৃষ্টিকর্ম আজও চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক অঙ্গনসহ বাংলা সংগীতের ভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করে চলেছে।

আবদুল গফুর হালী ছিলেন একাধারে গীতিকার, সুরকার, কণ্ঠশিল্পী ও নাট্যকার। ১৯৫৬ সাল থেকে আমৃত্যু প্রায় ৬০ বছর তিনি সংগীতচর্চা করেছেন। এই সময়ে তিনি প্রায় দুই হাজার গান রচনা করেন, যার অধিকাংশই চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষা, মাইজভাণ্ডারী দর্শন, মরমী ভাবধারা এবং সুফিবাদকে কেন্দ্র করে সৃষ্টি হয়েছে।

চট্টগ্রামের আঞ্চলিক গানের ইতিহাসে শেফালী ঘোষ ও শ্যামসুন্দর বৈষ্ণবের কণ্ঠে জনপ্রিয় হয়ে ওঠা অসংখ্য কালজয়ী গানের রচয়িতা ছিলেন আবদুল গফুর হালী। তাঁর লেখা গান শুধু বিনোদনের উপকরণ নয়, বরং চট্টগ্রামের ইতিহাস, সংস্কৃতি, লোকজ ঐতিহ্য ও মানুষের জীবনবোধের এক মূল্যবান দলিল হিসেবে বিবেচিত হয়।

মাইজভাণ্ডারী গানের অন্যতম প্রধান রূপকার হিসেবেও তিনি সুপরিচিত। মোহছেন আউলিয়ার দর্শন ও সুফি ভাবধারাকে সহজ ভাষা ও সুরে মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে তাঁর অবদান অনস্বীকার্য। পাশাপাশি চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষার নাটক রচনার ক্ষেত্রেও তিনি পথিকৃৎ হিসেবে স্বীকৃত।

দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও তাঁর কর্ম ও সৃষ্টিশীলতা গবেষণার বিষয় হয়ে উঠেছে। জার্মানির হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. হান্স হার্ডার তাঁর মরমী ও মাইজভাণ্ডারী গান নিয়ে জার্মান ভাষায় ‘ডার ফেরুখটে গফুর স্প্রিখট’ শীর্ষক গবেষণাগ্রন্থ প্রকাশ করেন। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের প্রখ্যাত নৃবিজ্ঞানী পিটার জে. বার্টুসি এবং ড. বেঞ্জামিন ক্রাকাউরও তাঁর গান ও সংগীতধারা নিয়ে গবেষণা পরিচালনা করেছেন।

সাহিত্য ও সংগীতচর্চায়ও তিনি রেখে গেছেন সমৃদ্ধ উত্তরাধিকার। ১৯৬৯ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর গীতিকাব্য ‘তত্ত্ববিধি’ এবং ১৯৮৯ সালে প্রকাশিত হয় ‘জ্ঞানজ্যোতি’। পরবর্তীতে ২০১২ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে সুফী মিজান ফাউন্ডেশন তাঁর গীতিকাব্য ‘সুরের বন্ধন, শিকড় ও দিওয়ানে মাইজভাণ্ডারী’ এবং সংকলন গ্রন্থ ‘আবদুল গফুর হালীর চাটগাঁইয়া নাটকসমগ্র’ প্রকাশ করে। এসব প্রকাশনা তাঁর সাহিত্য ও সংগীতকর্মকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

এদিকে, ৯৮তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে আবদুল গফুর হালী রিসার্চ সেন্টার আগামী ১২ আগস্ট সন্ধ্যা ৭টায় চট্টগ্রাম জেলা শিল্পকলা একাডেমির মূল মিলনায়তনে আলোচনা সভা ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আল-ফোরকান। বিশেষ অতিথি হিসেবে থাকবেন খ্যাতিমান লোকগবেষক ও লেখক ড. সেলিম জাহাঙ্গীর এবং প্রথম আলো-এর যুগ্ম সম্পাদক কবি বিশ্বজিৎ চৌধুরী। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করবেন আবদুল গফুর হালী রিসার্চ সেন্টারের ভাইস চেয়ারম্যান ও পিএইচপি ফ্যামিলির ভাইস চেয়ারম্যান মোহাম্মদ মহসিন।

সংগীতবোদ্ধাদের মতে, আবদুল গফুর হালী শুধু একজন গীতিকার নন; তিনি চট্টগ্রামের লোকসংস্কৃতি, আঞ্চলিক ভাষা ও সুফি সংগীতের এক জীবন্ত ইতিহাস। তাঁর সৃষ্টি আগামী প্রজন্মকে যেমন অনুপ্রাণিত করবে, তেমনি বাংলার লোকঐতিহ্য সংরক্ষণেও চিরকাল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। তাঁর ৯৮তম জন্মদিনে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা ব্যক্তি ও সংগঠন গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে এই কিংবদন্তি শিল্পীকে স্মরণ করছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *