আবাসন পরিদপ্তরে ‘আলাদিনের চেরাগ’: উচ্চমান সহকারীর নামে কোটি টাকার সাম্রাজ্য, নেপথ্যে প্রভাবশালী সিন্ডিকেট

এ এম এম আহসান:

সরকারি চাকরিতে একজন উচ্চমান সহকারী—যার বেতন ও সুযোগ-সুবিধা সীমিত—কীভাবে কোটি কোটি টাকার মালিক হতে পারেন? রাজধানীর অভিজাত এলাকায় ফ্ল্যাট, একাধিক গাড়ি, বিপুল স্বর্ণালঙ্কার এবং গ্রামের বাড়িতে বিলাসবহুল ভবন—এই প্রশ্ন এখন ঘুরপাক খাচ্ছে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়াধীন আবাসন পরিদপ্তরে।

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, আবাসন পরিদপ্তরের প্রধান কার্যালয়ে কর্মরত উচ্চমান সহকারী মোঃ রাব্বি আলম দীর্ঘদিন ধরে বাসা বরাদ্দকে কেন্দ্র করে গড়ে তুলেছেন একটি সংঘবদ্ধ দুর্নীতির নেটওয়ার্ক। সাধারণ কর্মচারী হলেও তিনি নিজেকে পরিচয় দিতেন সহকারী পরিচালক হিসেবে—আর সেই ভুয়া পরিচয়ের আড়ালেই চলেছে কোটি টাকার অবৈধ বাণিজ্য।

ভুয়া পরিচয়ে ‘বাসা বরাদ্দ বাণিজ্য’
অনুসন্ধান সূত্র জানায়, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য নির্ধারিত সরকারি বাসা বরাদ্দ প্রক্রিয়াকে পুঁজি করে রাব্বি আলম বছরের পর বছর অর্থ আদায় করে আসছেন। তিনি অফিসের বাইরে নিজেকে ‘সহকারী পরিচালক’ পরিচয় দিয়ে বাসা প্রত্যাশীদের সঙ্গে যোগাযোগ করতেন।

অভিযোগ রয়েছে—সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল নোমানবুলবুল হাসান-এর নাম ভাঙিয়ে একেকটি বাসা বরাদ্দের বিপরীতে ২ থেকে ৩ লাখ টাকা করে আদায় করা হতো। এভাবে গত কয়েক বছরে তিনি ৮ থেকে ১০ কোটি টাকা অবৈধভাবে অর্জন করেছেন। বাসা বরাদ্দ না হলে টাকা ফেরত দেওয়া হতো না—এমন অভিযোগও করেছেন একাধিক ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী।

অস্বাভাবিক সম্পদের পাহাড়
একজন উচ্চমান সহকারীর বৈধ আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই। অনুসন্ধানে দেখা গেছে—

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বারিধারা ও বাসাবোতে নিজস্ব ফ্ল্যাট, মতিঝিল এলাকায় আরেকটি ফ্ল্যাট নির্মাণাধীন, দুটি মাইক্রোবাস, যার আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৬৪ লাখ টাকা, স্ত্রীর নামে প্রায় ৩৫ ভরি স্বর্ণালঙ্কার, গ্রামের বাড়িতে ৪৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিলাসবহুল ভবন।

আয়কর নথি ও সম্পদ বিবরণী পর্যালোচনা করলে এসব সম্পদের উৎস নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন ওঠে।

ডি-টাইপ শাখা ও সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণ
অনুসন্ধানে জানা গেছে, রাব্বি আলম দীর্ঘদিন ধরে আবাসন পরিদপ্তরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ‘ডি-টাইপ’ শাখায় কর্মরত। এই শাখাই মূলত সরকারি বাসা বরাদ্দের কেন্দ্রবিন্দু।

সূত্র দাবি করেছে—সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল নোমান প্রায় এক দশক ধরে একই শাখায় অবস্থান করছেন এবং তার ‘পছন্দের লোকদের’ দিয়েই বাসা বরাদ্দ সংক্রান্ত কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। রাব্বি আলম এই সিন্ডিকেটের মাঠপর্যায়ের অন্যতম প্রধান সংগ্রাহক। অভিযোগ রয়েছে, অঞ্চলের প্রীতি ও ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠতার সুবাদে তিনি বারবার সুবিধাজনক শাখায় পদায়ন পেয়েছেন।

প্রশাসনের নীরবতা ও প্রশ্ন জবাবদিহি
একজন সাধারণ কর্মচারী কীভাবে বছরের পর বছর প্রশাসনের চোখের সামনে এমন দুর্নীতির সাম্রাজ্য গড়ে তুললেন—এ নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে দপ্তরের ভেতরেই। একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছেন, বিষয়টি সবার জানা থাকলেও প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের কারণে কেউ মুখ খুলতে সাহস পাননি।

কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ
ভুক্তভোগী কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সচেতন নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে গৃহায়ন ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব, দুদক এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে জোর দাবি জানানো হয়েছে— রাব্বি আলমের আয়ের উৎস ও সম্পদের পূর্ণাঙ্গ তদন্ত, সংশ্লিষ্ট শাখায় দীর্ঘদিন কর্মরত কর্মকর্তাদের পদায়ন পুনর্বিন্যাস, বাসা বরাদ্দ প্রক্রিয়ায় ডিজিটাল ও স্বচ্ছ ব্যবস্থা নিশ্চিতকরণ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, আবাসন পরিদপ্তরকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হলে ‘আলাদিনের চেরাগ’ পাওয়া এই ধরনের কর্মচারীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *