মো: ইসলাম উদ্দিন তালুকদার :
জীবনযুদ্ধে কখনো মানুষ দারিদ্র্যের কাছে হার মেনে যায়, আবার কখনো ভালোবাসা আর মমতার কাছে হার মানে দারিদ্র্যও। শেরপুরের ৮০ বছর বয়সী সাজু শেখ ও তাঁর স্ত্রী নূরজাহানের জীবন যেন সেই ভালোবাসারই এক করুণ উদাহরণ। দীর্ঘ প্রায় ৭০ বছরের দাম্পত্য জীবনে অভাব-অনটন, বার্ধক্য, শারীরিক অক্ষমতা ও নানা রোগব্যাধি তাঁদের ভালোবাসাকে একটুও ম্লান করতে পারেনি।
শেরপুর সদর উপজেলার খুনুয়া চরপাড়া গ্রামের এই বৃদ্ধ দম্পতির সংসার চলে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে। প্রায় ৭০ বছর আগে সাজু শেখ ও নূরজাহানের বিয়ে হয়। বিয়ের পর থেকেই তাঁরা সাজু শেখের পৈতৃক ভিটায় বসবাস করে আসছেন। জীবিকার তাগিদে একসময় কাঁচামালের ব্যবসা করতেন সাজু শেখ। সীমিত আয় হলেও তখন দুজনের সংসারে ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না।
দীর্ঘ দাম্পত্য জীবনে তাঁদের ঘরে জন্ম নেয় তিন ছেলে ও তিন মেয়ে। তিন মেয়েরই অনেক আগেই বিয়ে হয়ে গেছে। তাঁদের কেউ কেউ কালে-ভদ্রে বাবার খোঁজ নেন। তিন ছেলের মধ্যে একজন করোনার সময় নিখোঁজ হয়ে গেলেও মাঝে-মধ্যে খোঁজখবর রাখেন। আরেক ছেলে ঢাকায় রিকশা চালান। তিনিও বছরে দু-একবার বাড়িতে আসেন।
শেরপুরে বসবাসকারী আরেক ছেলে নূর ইসলাম দিনমজুরি ও ঠেলাগাড়ি চালিয়ে বৃদ্ধ মা-বাবার সাধ্যমতো ভরণপোষণ ও খোঁজখবর রাখেন। কিন্তু দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে তাঁর নিজের সংসারই চলে টানাটানির মধ্যে। এর মধ্যে কয়েক বছর আগে তাঁর স্ত্রী চিকিৎসার অভাবে ক্যানসারে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। ফলে মা-বাবার প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও ভরণপোষণের দায়িত্বও ঠিকমতো পালন করা তাঁর পক্ষে কঠিন হয়ে পড়েছে।
প্রায় পাঁচ বছর আগে পা পিছলে পড়ে কোমরের হাড় ভেঙে যায় নূরজাহানের। এরপর থেকেই তিনি শয্যাশায়ী। অর্থের অভাবে তাঁর প্রয়োজনীয় চিকিৎসা করাতে পারছেন না স্বামী সাজু শেখ। অসহায় হয়ে পড়েছেন তাঁর ছেলে নূর ইসলামও।
এরই মধ্যে গত ৯ সেপ্টেম্বর হৃদয়বিদারক এক দৃশ্যের অবতারণা হয়। ঘরের দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে অসুস্থ স্ত্রী নূরজাহানকে কোলে তুলে নেন বৃদ্ধ সাজু শেখ। স্ত্রীকে বাঁচাতে চিকিৎসা ও খাবারের জন্য তাঁর কণ্ঠে ফুটে ওঠে অসহায় আকুতি।
কান্নাবিজড়িত কণ্ঠে তিনি বলতে থাকেন, ‘আল্লাহ আমাকে খাবার দাও, আমার স্ত্রীকে নিয়ে খুব কষ্টে আছি।
বৃদ্ধ স্বামীর এমন আকুতি আর অসুস্থ স্ত্রীকে কোলে নেওয়ার দৃশ্য স্থানীয় এক ব্যক্তি ভিডিও করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে প্রকাশ করেন। ভিডিওটি প্রকাশের পরপরই তা ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায় ৮০ বছর বয়সী এই বৃদ্ধ দম্পতির অসহায়ত্ব ও ভালোবাসার গল্প।
অভাব তাঁদের নিত্যসঙ্গী, চিকিৎসা যেন বিলাসিতা। তবুও দীর্ঘ ৭০ বছরের সংসারে একজন আরেকজনকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে সাজু শেখের একমাত্র চাওয়া—নিজে না খেয়ে থাকলেও অসুস্থ স্ত্রী নূরজাহানের পাশে থাকতে চান, তাঁকে একটু চিকিৎসা ও খাবার দিতে চান।
দারিদ্র্য তাঁদের জীবনকে কঠিন করে তুলেছে, কিন্তু একে অপরের প্রতি ভালোবাসাকে হারাতে পারেনি। বরং বয়সের ভারে নুয়ে পড়া এই দম্পতির ভালোবাসার কাছে যেন হার মেনেছে দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব আর বার্ধক্য।