একাধিক পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পরও থামেনি দুর্নীতির অভিযোগ, দনিয়া ভূমি কর্মকর্তা সঞ্জীব সেনকে ঘিরে ক্ষোভ

স্টাফ রিপোর্টার:

ঢাকার মতিঝিল রাজস্ব সার্কেলের আওতাধীন দনিয়া ভূমি অফিসের ইউনিয়ন ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা সঞ্জীব সেনকে ঘিরে অনিয়ম, সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি এবং সরকারি ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হলেও অভিযোগগুলোর কোনো দৃশ্যমান সমাধান হয়নি বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। তাঁদের ভাষ্য, সংবাদ প্রকাশ ও সমালোচনার পরও ভূমি অফিসে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেনি। ফলে ভূমিসেবা নিতে আসা মানুষের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

অভিযোগকারীদের দাবি, নামজারি, জমির রেকর্ড সংশোধন, খতিয়ান ও পর্চা উত্তোলনসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা নিতে গিয়ে তাঁদের নানা ধরনের জটিলতার মুখোমুখি হতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে ফাইল প্রক্রিয়াকরণে অস্বাভাবিক বিলম্ব, বারবার কাগজপত্রের ত্রুটি দেখানো এবং কাজ দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য অতিরিক্ত অর্থ দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। তাঁদের অভিযোগ, নির্ধারিত সরকারি ফির বাইরে অর্থ দিতে রাজি না হলে কোনো কোনো আবেদন দীর্ঘদিন আটকে থাকে। অন্যদিকে, অর্থের বিনিময়ে দ্রুত কাজ করে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে একটি দালালচক্র সেবাপ্রার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সঙ্গে সঞ্জীব সেনের সরাসরি সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না, তা এখনো স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।

নামজারি বা মিউটেশন প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগকারীরা বিশেষভাবে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের দাবি, সরকার নির্ধারিত ফি পরিশোধের পরও কিছু ক্ষেত্রে অতিরিক্ত অর্থ চাওয়া হয়। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে ফাইলের ত্রুটি দেখিয়ে প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এতে নির্ধারিত সময়ে জমির মালিকানা-সংক্রান্ত কাজ সম্পন্ন করতে না পেরে অনেক আবেদনকারী আর্থিক ও মানসিক চাপে পড়ছেন। জমিজমার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে জমি বিক্রি, হস্তান্তর, উত্তরাধিকার সূত্রে মালিকানা প্রতিষ্ঠা এবং অন্যান্য আইনগত কাজে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। ফলে অভিযোগগুলোর যথাযথ তদন্ত এবং সেবাপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এদিকে জমির খতিয়ান, রেকর্ড সংশোধন ও মালিকানা-সংক্রান্ত নথি নিয়ে গুরুতর অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কিছু ক্ষেত্রে প্রকৃত মালিকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে এবং রেকর্ডে অসংগতি নিয়ে প্রশ্ন উঠছে। কোথাও নথিতে ভুল থাকলে তার সংশোধন, কোথাও মালিকানা-সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তি—এসব বিষয়ে সাধারণ মানুষকে দীর্ঘ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে জমির রেকর্ড পরিবর্তন, জাল দলিল তৈরি কিংবা অন্যের নামে খতিয়ান প্রস্তুতের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট নথি, সংশ্লিষ্ট ভূমি রেকর্ড এবং দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিদের ভূমিকা যাচাই করা অপরিহার্য। প্রমাণ ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত বলে চূড়ান্তভাবে দায়ী করা সমীচীন নয়।

ভূমি জরিপ, নকশা ও পর্চা উত্তোলনের ক্ষেত্রেও সেবাপ্রার্থীদের ভোগান্তির অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, প্রয়োজনীয় নথি সংগ্রহ কিংবা আবেদন নিষ্পত্তি করতে গিয়ে তাঁদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। কখনো কারিগরি সমস্যার কথা বলা হয়, আবার কখনো ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায় না বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব পরিস্থিতিতে আবেদনকারীরা কাজের অগ্রগতি জানতে বারবার অফিসে যাতায়াত করতে বাধ্য হন। এতে তাঁদের সময় ও অর্থ দুটোই ব্যয় হয়। অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করে সেবার নির্ধারিত সময়সীমা, আবেদন নিষ্পত্তির হার এবং অভিযোগ ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত পরিস্থিতি স্পষ্ট হতে পারে।

খাস জমি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন কয়েকজন অভিযোগকারী। তাঁদের দাবি, প্রকৃত ভূমিহীন ও অসহায় মানুষের পরিবর্তে প্রভাবশালী বা আর্থিকভাবে সচ্ছল ব্যক্তিরা সুবিধা পাচ্ছেন কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। সরকারি খাস জমি বন্দোবস্তের ক্ষেত্রে নির্ধারিত নীতিমালা, আবেদনকারীর যোগ্যতা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যথাযথভাবে যাচাই করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে তার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্দিষ্ট নথি ও প্রমাণ যাচাই ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয়।

জানা যায়, আবু জাফর নামের এক সাবেক কর্মচারীর চাকরির মেয়াদ অনেক আগেই শেষ হয়েছে। তবে অভিযোগ উঠেছে, অবসর গ্রহণের পরও তিনি নিয়মিত দনিয়া ভূমি অফিসে এসে ভূমি উপ-সহকারী কর্মকর্তা সঞ্জীব সেনের পাশের চেয়ারে বসেন। প্রশ্ন উঠেছে, চাকরির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও কীভাবে তিনি সরকারি অফিসে বসে দাপ্তরিক কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন? অভিযোগকারীদের দাবি, ওই অফিসে তাঁর উপস্থিতিকে কেন্দ্র করে ঘুষ লেনদেনের কার্যক্রম চলছে। একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি কীভাবে সরকারি অফিসে বসে এ ধরনের কর্মকাণ্ড পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছেন, তা খতিয়ে দেখতে সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।

সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ঘিরে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরও কেন অভিযোগগুলোর কার্যকর নিষ্পত্তি হচ্ছে না। অভিযোগকারীদের বক্তব্য, সংবাদ প্রকাশের পরও যদি একই ধরনের ভোগান্তি চলতে থাকে, তাহলে সাধারণ মানুষ প্রতিকার পাওয়ার বিষয়ে আস্থা হারাতে পারে। তাঁদের মতে, শুধু সংবাদ প্রকাশ বা মৌখিক আশ্বাস যথেষ্ট নয়; অভিযোগের প্রকৃতি অনুযায়ী প্রশাসনিক তদন্ত, নথি যাচাই, সেবাপ্রার্থীদের বক্তব্য গ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তবে পূর্বে প্রকাশিত সংবাদগুলোর কপি, সংশ্লিষ্ট দপ্তরের বক্তব্য এবং তদন্তের কোনো নথি পর্যালোচনা না করে অভিযোগের পুনরাবৃত্তি বা তার সত্যতা সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়া সম্ভব নয়।

ভূমি অফিসে সেবাপ্রার্থীদের হয়রানি বন্ধ করতে হলে অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি ফি-এর তালিকা দৃশ্যমান স্থানে টাঙানো, প্রতিটি আবেদনের রসিদ প্রদান, ফাইলের অগ্রগতি সম্পর্কে আবেদনকারীকে অবহিত করা এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা জোরদার করা যেতে পারে। পাশাপাশি দালালদের মাধ্যমে অবৈধ লেনদেনের অভিযোগ থাকলে তা তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগাম দোষী সাব্যস্ত না করে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য গ্রহণ এবং নিরপেক্ষ তদন্ত নিশ্চিত করাও জরুরি।

সচেতন নাগরিকদের প্রত্যাশা, দনিয়া ভূমি অফিসকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করবে। একাধিক পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পরও যদি অভিযোগের সুরাহা না হয়ে থাকে, তাহলে বিষয়টি খতিয়ে দেখে কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জনসমক্ষে স্পষ্ট করা দরকার। সঞ্জীব সেনের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই, দায়িত্ব নির্ধারণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের ভূমিসেবা পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করা সম্ভব। ভূমি প্রশাসনের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও নিরপেক্ষ তদন্তের বিকল্প নেই।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *