ঘোড়াঘাট (দিনাজপুর) প্রতিনিধি:
দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার করতোয়া নদীর ভয়াবহ ভাঙনে সরকারের নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ নদীতীরবর্তী শতাধিক বসতবাড়ি, ফসলি জমি ও গ্রামীণ সড়ক বিলীন হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় ভাঙন আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে। এতে নদীপাড়ের শত শত মানুষ চরম আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের আশঙ্কা, যেকোনো মুহূর্তে নদীগর্ভে হারিয়ে যেতে পারে বহু বছরের গড়ে তোলা বসতভিটা ও শেষ সম্বল।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) সরেজমিনে উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দপুর নাপিতপাড়া এলাকার আশ্রয়ণ প্রকল্প ও সংলগ্ন নদীতীর ঘুরে দেখা যায়, করতোয়া নদীর ভাঙন আশ্রয়ণ প্রকল্পের একেবারে কাছাকাছি পৌঁছে গেছে। নদীতীরে বড় বড় ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিদিনই নদী গ্রাস করছে বসতভিটা, আবাদি জমি ও মানুষের জীবিকার উৎস। ফলে ঘর হারানোর শঙ্কায় নির্ঘুম রাত কাটছে আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা ও নদীপাড়ের পরিবারগুলোর।
স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক দিনের টানা বৃষ্টিতে করতোয়া নদীর পানি বাড়ার পর থেকেই ভাঙন ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইতোমধ্যে আশ্রয়ণ প্রকল্পের কয়েকটি ঘর ঝুঁকির মুখে পড়েছে। একই সঙ্গে নদীতীরবর্তী স্থায়ী বাসিন্দাদের বাড়িঘর ও ফসলি জমিও নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। প্রতিদিন কমছে আবাদি জমির পরিমাণ, হারিয়ে যাচ্ছে বহু বছরের গড়ে ওঠা বসতি।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা গোলাপি বেগম বলেন, “অনেক কষ্টের পর সরকার আমাদের থাকার জন্য এই ঘর দিয়েছে। এখন সেই ঘরটিই হারানোর ভয় করছি। রাতে ঘুমাতে পারি না। কখন নদী সবকিছু নিয়ে যায়, সেই আতঙ্কে থাকি। আমাদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।”
স্থানীয় বাসিন্দা নুর ইসলাম বলেন, “শুধু আশ্রয়ণ প্রকল্প নয়, আমাদের বসতবাড়ি ও আবাদি জমিও নদী গিলে খাচ্ছে। ছোট ছোট সন্তান নিয়ে কোথায় যাব, কীভাবে বাঁচব—সেই দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে।”
আরেক বাসিন্দা সুরাইয়া বেগম বলেন, “বৃষ্টি শুরু হলেই বুক ধড়ফড় করে। নদীর পাড়ে বড় বড় ফাটল দেখা দিয়েছে। কখন যে ঘর নদীতে চলে যায়, সেই ভয় সবসময় তাড়া করে বেড়ায়।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে করতোয়া নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকলেও স্থায়ী প্রতিরোধে কার্যকর কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। প্রতি বর্ষায় নদীর আগ্রাসনে নতুন নতুন এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরের পাশাপাশি আশপাশের শতাধিক বসতবাড়ি, বিস্তীর্ণ আবাদি জমি, গ্রামীণ সড়ক ও যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মক হুমকির মুখে পড়বে।
কুলানন্দপুর গ্রামের শহীদ আইয়ুব আলী স্মৃতি সংসদ ও পাঠাগারের সভাপতি মোহাম্মদ মোর্শেদ আলম বলেন, “করতোয়ার অব্যাহত ভাঙন এখন শুধু মাটি নয়, মানুষের স্বপ্ন, নিরাপত্তা ও ভবিষ্যতের নিশ্চয়তাও কেড়ে নিচ্ছে। দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ না নিলে সরকারের নির্মিত আশ্রয়ণ প্রকল্প নদীগর্ভে বিলীন হবে। পাশাপাশি বহু পরিবার ঠিকানাহীন হয়ে পড়বে।”
এ অবস্থায় স্থানীয়রা জরুরি ভিত্তিতে নদীতীর সংরক্ষণ, টেকসই ভাঙন প্রতিরোধ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং ঝুঁকিতে থাকা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দাসহ ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর নিরাপদ পুনর্বাসনের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবানা তানজিন বলেন, “আশ্রয়ণ প্রকল্পের বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে অবহিত করা হয়েছে এবং একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে। খুব দ্রুত ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি নদীভাঙন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।”