কুমিল্লার মাটির গন্ধ বুকে নিয়ে রাজধানীর বুকে আলো জ্বালাল “কুমিল্লা ডিভিশনাল ক্লাব”

মোঃ আনজার শাহ :-

 

মেঘনার কলতান, গোমতীর স্নিগ্ধ স্পর্শ আর লালমাই পাহাড়ের বুকে যে সভ্যতা শত শত বছর ধরে নিজেকে গড়ে তুলেছে  সেই কুমিল্লার মানুষ এবার রাজধানীর কংক্রিটের জঙ্গলে খুঁজে নিল তাদের শিকড়ের ঠিকানা। ইট-পাথরের ব্যস্ত নগরী ঢাকায় জন্ম নিল এক নতুন স্বপ্নের প্রতিষ্ঠান “কুমিল্লা ডিভিশনাল ক্লাব”।

সোমবার (২৭ এপ্রিল ২০২৬) সন্ধ্যার আলো-আঁধারিতে রাজধানীর হোটেল সোনারগাঁওয়ের জমকালো পরিবেশে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করল এই ক্লাব। কুমিল্লা, চাঁদপুর ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাটি থেকে উঠে আসা কবি, শিক্ষক, প্রকৌশলী, সমাজসেবী নানা পেশার, নানা বয়সের মানুষ সেদিন এক ছাদের নিচে মিলিত হলেন এক অভিন্ন টানে। সেই টানের নাম  শিকড়ের প্রতি ভালোবাসা, ঐতিহ্যের প্রতি দায়বদ্ধতা।

 

★তামিজীর কণ্ঠে উচ্চারিত হলো স্বপ্নের ভাষা:-

অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বিশিষ্ট কবি, সমাজবিজ্ঞানী ও শিকড়সন্ধানী মু. নজরুল ইসলাম তামিজী। তাঁর কণ্ঠে সেদিন কেবল বক্তৃতা ছিল না  ছিল একটি জাতির আত্মার কথা। তিনি বলেন,

“কুমিল্লা ডিভিশনাল ক্লাব কেবল একটি সংগঠন নয় এটি হবে ঐতিহ্য, সংস্কৃতি ও সামাজিক বন্ধনের একটি শক্তিশালী প্ল্যাটফর্ম, যেখানে কুমিল্লা অঞ্চলের মানুষ তাদের শিকড়, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধকে লালন ও বিকশিত করতে পারবেন।”

এই কথামালা যেন উপস্থিত সকলের হৃদয়ে শিহরণ জাগিয়ে দিল। দীর্ঘদিন রাজধানীতে বাস করে যে মানুষগুলো নিজের জেলার মানুষের সঙ্গে একটু পরিচিত আলাপের জন্য আকুল থাকতেন, তাঁরা যেন সেই মুহূর্তে খুঁজে পেলেন তাঁদের হারিয়ে যাওয়া গ্রামের উঠোন।

★২১ সদস্যের আহ্বায়ক কমিটি গঠন:-

অনুষ্ঠানে সর্বসম্মতিক্রমে ২১ সদস্যবিশিষ্ট একটি শক্তিশালী আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়। আহ্বায়কের দায়িত্ব অর্পণ করা হয় মু. নজরুল ইসলাম তামিজীকে এবং সদস্যসচিব হিসেবে মনোনীত হন ড. ফোরকান উদ্দীন।

যুগ্ম আহ্বায়ক পদে দায়িত্ব পান হাজী মো. জিয়াউদ্দিন, কবি মু. আবু তাহের, প্রকৌশলী মো. রাহাদ উজ্জামান ও ড. আবদুল আলীম।

কমিটির অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে রয়েছেন অধ্যক্ষ সালাউদ্দিন ভূইয়া, প্রকৌশলী মো. জসিম উদ্দিন, আলহাজ্ব মো. বিল্লাল হোসেন, অধ্যাপক নায়লা ইসলাম, মাহমুদুল হক মজুমদার, কামরুজ্জামান জনি, প্রকৌশলী সফিউল আযম, মোহাম্মদ নাজমুল হাসান, কবি বাপ্পী সাহা, কবি তাহেরা খাতুন ও মিজানুর রহমান মিজান প্রমুখ। সমন্বয়কারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন কবি রলি আক্তার, কবি আর মুজিব ও কবি সাইফ সাদী।

 

★ঐতিহ্যের সেতু, তারুণ্যের হাতিয়ার:-

অনুষ্ঠানে বক্তারা আবেগমথিত কণ্ঠে বলেন, প্রবাসে থেকেও যে মানুষ নিজের মাটিকে ভুলে যায় না, সেই মানুষের মিলনকেন্দ্র হয়ে উঠবে এই ক্লাব। কুমিল্লা বিভাগের মানুষের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতা, সাংস্কৃতিক বিকাশ ও সামাজিক উন্নয়নে ক্লাবটি যুগান্তকারী ভূমিকা রাখবে বলে তাঁরা দৃঢ় আশাবাদ ব্যক্ত করেন। বিশেষভাবে উঠে আসে তরুণ প্রজন্মের কথা — যারা শহরের ঝলমলে আলোয় বড় হতে হতে হয়তো ভুলতে বসেছে তাদের পূর্বপুরুষের কৃষ্টি ও কালচার। এই ক্লাব সেই প্রজন্মকে তাদের শিকড়ের সঙ্গে পুনরায় সংযুক্ত করবে বলে বক্তারা প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

 

সন্ধ্যার মিষ্টি আলো যখন ধীরে ধীরে রাতের আঁধারে মিশে যাচ্ছিল, তখনো হোটেল সোনারগাঁওয়ের হলঘরে বিরাজ করছিল এক উষ্ণ সৌহার্দ্যের আভা। উপস্থিত অতিথিরা নবগঠিত ক্লাবের উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কামনা করে একে অপরকে আলিঙ্গন করলেন। মেঘনার ওপার থেকে আসা সেই মানুষগুলো সেদিন বুঝিয়ে দিলেন  শিকড় থেকে বিচ্ছিন্ন হলে মানুষ বাঁচে, কিন্তু শিকড়ের সঙ্গে থাকলে মানুষ মহীরুহ হয়ে ওঠে।