অনলাইন ডেস্ক:
সকাল হলেই একসময় চারপাশ মুখর হয়ে উঠত চড়ুইয়ের কিচিরমিচিরে। জানালার কার্নিশ, বারান্দার রেলিং কিংবা ছাদের কোনো নিরাপদ কোণে দল বেঁধে বসত ছোট্ট পাখিগুলো। কেউ খাবারের সন্ধানে ছোটাছুটি করত, কেউ আবার বাসা তৈরির জন্য খড়কুটো সংগ্রহ করত। তাদের চঞ্চল উপস্থিতিতে বাড়ির আশপাশের পরিবেশও যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠত।
চড়ুই ছিল এমন এক পাখি, যাকে দেখতে আলাদা করে কোথাও যেতে হতো না। ঘরের জানালা খুললেই চোখে পড়ত। উঠানে পড়ে থাকা চালের দানা, ভাতের কণা কিংবা আশপাশের ছোট পোকামাকড় ছিল তাদের খাবারের অন্যতম উৎস। মানুষের এত কাছাকাছি থেকেও চড়ুই নিয়ে তখন বিশেষ করে ভাবতে হতো না। কারণ পাখিটি ছিল আমাদের দৈনন্দিন জীবনেরই স্বাভাবিক অংশ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে সেই পরিচিত দৃশ্য বদলে যাচ্ছে। অনেক জায়গাতেই আগের মতো দেখা যায় না ছোট্ট এই পাখিগুলোকে। কমে যাচ্ছে তাদের আনাগোনা, হারিয়ে যাচ্ছে সেই পরিচিত কিচিরমিচির।
চড়ুই কমে যাওয়ার পেছনে একটি নয়, বরং একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো বাসস্থান সংকুচিত হয়ে যাওয়া। আধুনিক ভবন নির্মাণের ফলে পুরোনো দিনের মতো দেয়ালের ফাঁক, কার্নিশ কিংবা ছাদের নিরাপদ কোণ কমে গেছে। ফলে চড়ুইয়ের বাসা বাঁধার সুযোগও কমছে।
এর পাশাপাশি রয়েছে খাদ্যের সংকট। শহরে গাছপালা ও সবুজ জায়গা কমে গেলে পোকামাকড়সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক খাদ্যের উৎসও কমে যেতে পারে। কৃষি ও বাগানে কীটনাশকের ব্যবহারও পাখির খাদ্যশৃঙ্খলে প্রভাব ফেলতে পারে।
নগরায়ণ ও দূষণও পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে। অতিরিক্ত শব্দ, বায়ুদূষণ, যানবাহনের চাপ এবং নিয়মিত নির্মাণকাজ শহরের পরিবেশকে বদলে দিচ্ছে। এসব পরিবর্তনের প্রভাব শুধু মানুষের ওপর নয়, শহরের পাখি ও অন্যান্য প্রাণীর ওপরও পড়ে।
চড়ুইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার প্রসঙ্গ উঠলেই অনেক সময় মোবাইল ফোনের টাওয়ার থেকে নির্গত তড়িৎচৌম্বকীয় বিকিরণের কথা বলা হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও এ নিয়ে নানা ধরনের দাবি দেখা যায়। তবে চড়ুই কমে যাওয়ার একমাত্র কারণ হিসেবে মোবাইল টাওয়ারকে দায়ী করার পক্ষে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নেই।
বরং গবেষণা ও পরিবেশবিদদের আলোচনায় বাসস্থান হারানো, খাদ্যের প্রাপ্যতা কমে যাওয়া, নগরায়ণ এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের মতো একাধিক বিষয় গুরুত্ব পেয়েছে। তাই চড়ুইয়ের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টিকে কোনো একটি কারণ দিয়ে ব্যাখ্যা করা ঠিক নয়।
একটি ছোট পাখির সংখ্যা কমে যাওয়াকে হয়তো বড় কোনো পরিবর্তন মনে নাও হতে পারে। কিন্তু প্রকৃতির প্রতিটি প্রাণীই একটি নির্দিষ্ট পরিবেশব্যবস্থার অংশ। পাখি, পোকামাকড় ও গাছপালার মধ্যে রয়েছে পারস্পরিক সম্পর্ক।
চড়ুইয়ের মতো শহরঘেঁষা পাখির উপস্থিতি তাই শুধু সৌন্দর্য কিংবা শৈশবের স্মৃতির বিষয় নয়; এটি একটি শহরের জীববৈচিত্র্যেরও অংশ। কোনো এলাকায় পাখি ও অন্যান্য ছোট প্রাণীর জন্য উপযোগী পরিবেশ কমে গেলে তা ওই এলাকার সামগ্রিক পরিবেশগত পরিবর্তনের একটি ইঙ্গিতও হতে পারে।
চড়ুইয়ের জন্য কিছু করতে খুব বড় আয়োজনের প্রয়োজন নেই। বাড়ির বারান্দা, ছাদ কিংবা জানালার পাশে পরিষ্কার পানির পাত্র রাখা যেতে পারে। নিরাপদ জায়গায় কিছু দানা রাখা যায়। সুযোগ থাকলে ছোট পাখির জন্য বাসা বানানোর বাক্সও রাখা যেতে পারে।
তবে পানি ও খাবারের পাত্র নিয়মিত পরিষ্কার রাখতে হবে। এমন জায়গা বেছে নেওয়া ভালো, যেখানে পাখি সহজে আসতে পারে এবং শিকারি প্রাণীর ঝুঁকি তুলনামূলক কম থাকে।
এর পাশাপাশি শহরে সবুজ জায়গা বাড়ানো, গাছ লাগানো এবং বাড়ির আশপাশে পাখির জন্য নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করাও গুরুত্বপূর্ণ।
শহর বদলাবে, নতুন ভবন উঠবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই পরিবর্তনের মধ্যেও চড়ুইয়ের জন্য কি একটু জায়গা রাখা যায় না?
হয়তো কোনো এক সকালে আপনার জানালার কার্নিশে এসে বসবে একটি চড়ুই। কয়েক মুহূর্তের জন্য আবারও শোনা যাবে সেই পরিচিত কিচিরমিচির। ছোট্ট সেই পাখিটি হয়তো মনে করিয়ে দেবে—শহর যতই বদলাক, প্রকৃতির জন্য একটু জায়গা রাখলে তারাও ফিরে আসতে পারে।
নইলে এমন একদিনও আসতে পারে, যখন চড়ুইয়ের কিচিরমিচির আর সকালের পরিচিত শব্দ থাকবে না। থেকে যাবে শুধু পুরোনো দিনের গল্প—‘একসময় আমাদের জানালার পাশেও চড়ুই আসত।’