আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনির মৃত্যুর চার মাসেরও বেশি সময় পর শুরু হয়েছে তার রাষ্ট্রীয় দাফন কার্যক্রম। ইসলামী রীতিতে সাধারণত মৃত্যুর পর দ্রুত দাফন সম্পন্ন করা হলেও খামেনির ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ঘটেছে। কেন এত দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করা হলো—তা নিয়ে নানা প্রশ্নের জবাব দিয়েছে ইরান।
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তেহরানে নিজ বাসভবনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলায় ৮৬ বছর বয়সে নিহত হন আলি খামেনি। এরপর থেকেই দেশজুড়ে যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং নিরাপত্তাজনিত সংকটের কারণে তার দাফন কার্যক্রম স্থগিত রাখা হয়।
শুক্রবার (৩ জুলাই) থেকে ইরান ও ইরাকের অন্তত পাঁচটি শহরে সাত দিনব্যাপী রাষ্ট্রীয় শোকানুষ্ঠান শুরু হয়েছে। এ উপলক্ষে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধি, ধর্মীয় নেতা ও লাখো মানুষের উপস্থিতির আশা করছে তেহরান।
ইরানের সরকারি কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, চলমান সংঘাতের কারণে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব না হওয়ায় এতদিন দাফন আয়োজন করা যায়নি। সম্প্রতি যুদ্ধবিরতির একটি প্রাথমিক সমঝোতা কার্যকর হওয়ার পরই রাষ্ট্রীয়ভাবে দাফনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত ছবিতে দেখা গেছে, জাতীয় পতাকায় মোড়ানো খামেনির কফিন তেহরানের গ্র্যান্ড মোসাল্লায় নেওয়া হয়েছে। সেখানে তিন দিন সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ রাখা হবে। এরপর ইরাকের নজফ ও কারবালায় শোকযাত্রা শেষে আগামী ৯ জুলাই জন্মস্থান মাশহাদের ইমাম রেজার (আ.) মাজার প্রাঙ্গণে তাকে দাফন করা হবে।
কেন বিলম্ব হলো?
খামেনির মৃত্যুর পরপরই দাফনের পরিকল্পনা থাকলেও যুদ্ধ পরিস্থিতি দ্রুত জটিল হয়ে ওঠে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে সংঘাত চলাকালে নিরাপত্তা ঝুঁকি, বিদেশি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এবং বিশাল জনসমাগমের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে দাফন কার্যক্রম পিছিয়ে দেওয়া হয়।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভি জানিয়েছে, খামেনির মরদেহ সাময়িকভাবে দাফন করা হয়েছিল—এমন গুঞ্জন থাকলেও ইরানের কর্মকর্তারা তা নিশ্চিত করেননি। তাদের দাবি, ধর্মীয় বিধান অনুসরণ করেই মরদেহ বিশেষ শীতল সংরক্ষণাগারে রাখা হয়েছিল।
সন্ত্রাসবাদবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ড. মোহাম্মদ ওমর ফক্স নিউজ ডিজিটালকে বলেন, ইসলামে রাসায়নিক এমবামিং (Embalming) নিষিদ্ধ হওয়ায় খামেনির মরদেহ সম্ভবত হিমায়িত শীতল সংরক্ষণাগারে রাখা হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, শিয়া ইসলামী আইন বিশেষ পরিস্থিতিতে দাফনে বিলম্ব এবং শীতলীকরণের মাধ্যমে মরদেহ সংরক্ষণের অনুমতি দেয়। ইরানের ফরেনসিক মর্গগুলোতে প্রয়োজন হলে কয়েক মাস পর্যন্ত মরদেহ সংরক্ষণ করা হয়। ফলে চার মাস সংরক্ষণ করা অস্বাভাবিক নয়।
শুধু দাফন নয়, রাজনৈতিক বার্তাও
বিশ্লেষকদের মতে, খামেনির রাষ্ট্রীয় দাফন শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ইরানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য রাজনৈতিকভাবেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
কোম শহরের জুমার নামাজের ইমাম আয়াতুল্লাহ মোহাম্মদ সাইদি বলেছেন, খামেনির জানাজায় বিপুল জনসমাগম ইসলামী প্রজাতন্ত্রের প্রতি জনগণের সমর্থনের প্রতীক হবে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় ইরানের প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাঘের গালিবাফ দেশবাসীর প্রতি জানাজায় অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আপনাদের উপস্থিতি ইরানের ইতিহাসে একটি গৌরবময় অধ্যায় রচনা করবে এবং বিশ্বের কাছে জাতির দৃঢ় অবস্থানের বার্তা পৌঁছে দেবে।”
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ানও সব রাজনৈতিক মত, ধর্ম ও জাতিগোষ্ঠীর মানুষকে শেষ শ্রদ্ধা অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। তার ভাষায়, “এই উপস্থিতি বিশ্বের কাছে প্রমাণ করবে যে, ইরানি জাতি স্বাধীনতা ও জাতীয় মর্যাদা রক্ষায় ঐক্যবদ্ধ।”
বর্তমান পরিস্থিতিতে খামেনির দাফনকে ইরানের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রীয় শেষকৃত্যের একটি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সূত্র: এনডিটিভি