নিজস্ব প্রতিনিধি:
গাজীপুরের বিভিন্ন খাদ্যগুদামে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে অনিয়ম, তথ্য গোপন ও কৃষক হয়রানির অভিযোগ উঠেছে। এসব বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের (ডিসি ফুড) কার্যালয়ে রাজধানী টেলিভিশনের অনুসন্ধানী দল ‘ক্রাইম অ্যালার্ট’-এর সাংবাদিকেরা হামলা ও হেনস্তার শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ঘটনায় গাজীপুর সদর থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) এবং জেলা প্রশাসক ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অনুসন্ধানী দলের অভিযোগ, গাজীপুরের কালিয়াকৈর, কালীগঞ্জ, কাপাসিয়া ও শ্রীপুর উপজেলার খাদ্যগুদামগুলোতে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। কৃষকদের কাছ থেকে নির্ধারিত দামে ধান কেনার কথা থাকলেও প্রকৃত কৃষকেরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে অনিয়মের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
কালিয়াকৈর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে গিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার দেখা পাননি বলে দাবি করেন সাংবাদিকেরা। তাঁদের ভাষ্য, দীর্ঘ অপেক্ষার পর বিকেল ৪টা ২০ মিনিটে কর্মকর্তা কার্যালয়ে এলেও ধান সংগ্রহের সুনির্দিষ্ট তালিকা বা সন্তোষজনক তথ্য দিতে পারেননি। কালীগঞ্জে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিষয়টি উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের ওপর চাপিয়ে দেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কাপাসিয়ার এলএসডি কর্মকর্তা বদলির অজুহাত দেখিয়ে তথ্য দিতে চাননি বলেও দাবি অনুসন্ধানী দলের।
শ্রীপুর উপজেলায় ধান সংগ্রহের হিসাব নিয়ে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের ভাষ্য অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা প্রথমে ১১ জন কৃষকের কাছ থেকে ৩ হাজার ১০০ টন এবং পরে ৩১ টন ধান সংগ্রহের কথা বলেন। অন্যদিকে, একই দপ্তরের এলএসডি কর্মকর্তা মুঠোফোনে ৩০ থেকে ৩২ টন ধান সংগ্রহের কথা জানান বলে দাবি করা হয়েছে।
অনুসন্ধানী দলের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শ্রীপুর উপজেলায় সরকারি ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ১৭০ টন এবং পুরো গাজীপুর জেলায় লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৫ হাজার ৮৬২ টন। শ্রীপুর ছাড়া জেলার অন্য উপজেলাগুলোর ধান সংগ্রহের হিসাব ও তালিকা চেয়েও তা পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সাংবাদিকদের দাবি, শ্রীপুরে প্রায় চার ঘণ্টা অপেক্ষার পর তাঁদের একটি তালিকা দেওয়া হয়। তালিকায় থাকা কয়েকজন কৃষকের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তাঁরা সরকারের কাছে ধান বিক্রি করেননি বলে জানান। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্লক উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সরকার নির্ধারিত প্রতি মণ ধানের দাম ১ হাজার ৪৩৬ টাকা হলেও কৃষকদের দিনের পর দিন অফিসে এনে হয়রানি করা হয়েছে। পরে তাঁরা বাধ্য হয়ে বাইরে প্রতি মণ ধান ১ হাজার টাকা দরে বিক্রি করেছেন বলে তিনি দাবি করেন। কাগজে-কলমে ভুয়া কৃষকের নাম দেখিয়ে সরকারি বরাদ্দ আত্মসাতের অভিযোগও উঠেছে।
এ বিষয়ে শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জানিয়েছেন, পুরো বিষয়টি খতিয়ে দেখে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
উপজেলাগুলোতে ধান সংগ্রহের তথ্য ও অনিয়মের অভিযোগ নিয়ে বক্তব্য জানতে রাজধানী টেলিভিশনের ‘ক্রাইম অ্যালার্ট’ দলের প্রধান গাজীপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আফজালুল আলমের কার্যালয়ে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সেখানে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের উপস্থিতিতে তাঁর পাশে থাকা সহকারী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক সোহেল ও তাঁর সহযোগীরা সাংবাদিকদের ওপর চড়াও হন।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, একপর্যায়ে তাঁদের জোরপূর্বক কার্যালয়ের একটি কক্ষে আটকে রেখে হেনস্তা করা হয়। তাঁদের পকেট থেকে একটি মুঠোফোন এবং ব্যাগ থেকে আরেকটি আইফোন নিয়ে নেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। ধস্তাধস্তির সময় তাঁদের সঙ্গে থাকা একটি ইনফিনিক্স মুঠোফোনও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সংবাদটি গণমাধ্যমে প্রকাশ বা সম্প্রচার করলে হত্যা করে লাশ গুম করার হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন তাঁরা।
ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীরা নিন্দা ও ক্ষোভ জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গত ১৫ অক্টোবর ২০২৬ তারিখে গাজীপুর সদর থানায় জিডি নং ১৪৮৪ দায়ের করা হয়েছে। একই সঙ্গে ঘটনার তদন্ত ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে জেলা প্রশাসক এবং দুদকে লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগকারীরা সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে অনিয়ম, কৃষক হয়রানি এবং সাংবাদিকদের ওপর হামলার অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, সহকারী জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক এবং সংশ্লিষ্ট অন্য কর্মকর্তাদের বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।