জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক:
গুমের মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচার নিশ্চিত করতে শক্তিশালী আইন ও স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা গড়ে তোলার দাবি জানিয়েছেন বিশিষ্টজনরা। একই সঙ্গে গুম অধ্যাদেশ বাতিল করে নতুন আইন প্রণয়নের সরকারি উদ্যোগ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তারা বলেছেন, প্রস্তাবিত আইন যেন কোনোভাবেই গুমের সঙ্গে জড়িতদের দায়মুক্তির সুযোগ তৈরি না করে।
শনিবার (২৯ আগস্ট) জাতীয় প্রেস ক্লাবের তোফাজ্জল হোসাইন মানিক মিয়া হলে এবি পার্টির উদ্যোগে আয়োজিত এক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে এবি পার্টির সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান প্রফেসর ডা. ওহাব মিনার বলেন, ৫ আগস্ট ডিফেন্স ফোর্স জনগণের পক্ষে না দাঁড়ালে বাংলাদেশে গণহত্যার ভয়াবহতা আরও বড় আকার ধারণ করতে পারত। গুমের শিকার ব্যক্তিদের দুঃসহ স্মৃতি এবং তাদের পরিবারের দীর্ঘদিনের যন্ত্রণা অত্যন্ত বেদনাদায়ক উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশকে আর গুমের সংস্কৃতিতে ফিরে যেতে দেওয়া হবে না।
গণ-অভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষা ও চেতনার আলোকে দেশ পরিচালনার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।
স্বাগত বক্তব্যে এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ বলেন, বাংলাদেশে গুমের ইতিহাস দীর্ঘ। বিভিন্ন সময়ে মানুষ গুমের শিকার হয়েছে। শহীদ বুদ্ধিজীবী ও চলচ্চিত্র নির্মাতা জহির রায়হানের নিখোঁজ হওয়ার প্রসঙ্গ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘আমরা এখনো জহির রায়হানকে পাইনি।’
প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নতুন আইনে কিছু নতুন বিষয় যুক্ত হলেও এটি অনেকাংশে ২০০৯ সালের আইনের মতো মনে হচ্ছে। গুমসহ রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মাধ্যমে সংঘটিত অপরাধের নিরপেক্ষ তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করতে স্বাধীন পুলিশ তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানান তিনি।
বিএনপির মিডিয়া সেলের আহ্বায়ক ডা. মওদুদ হোসেন আলমগীর পাভেল বলেন, গুমের সংস্কৃতির অবসান চান তারা। দুর্বল পুলিশি ব্যবস্থা দিয়ে গুমের মতো গুরুতর অপরাধের কার্যকর তদন্ত ও বিচার সম্ভব নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এফএসডিএসের চেয়ারম্যান ফজলে এলাহী আকবর গুমের ঘটনা তদন্তে বর্তমান সরকারের কমিটি গঠনের উদ্যোগকে স্বাগত জানান। তবে শুধু কমিটি গঠন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না উল্লেখ করে তিনি কার্যকর ও শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন ইস্যুতে গঠিত কমিটির ব্যর্থতার নজির রয়েছে। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক শাহাব এনাম খান রোহিঙ্গা সংকট নিয়েও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ সংঘাতের কারণে অতীতের বিভিন্ন উদ্যোগ কাঙ্ক্ষিত ফল দেয়নি। রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফেরত পাঠানো না গেলে ভবিষ্যতে নতুন করে পুশইনের আশঙ্কা রয়েছে।
তিনি রাখাইনে নিরাপদ ও টেকসই পরিবেশ তৈরির ওপর গুরুত্বারোপ করেন। পাশাপাশি রোহিঙ্গা ক্যাম্পে মাদক ও জুয়া নিয়ন্ত্রণে রাজনৈতিক দলগুলোর দায়িত্বের কথাও তুলে ধরেন।
বিএনপির সংসদ সদস্য হুম্মাম কাদের চৌধুরী বলেন, প্রস্তাবিত গুমবিরোধী আইন নিয়ে বিভিন্ন ধরনের গুজব ছড়ানো হয়েছে। আইন প্রণয়নের আগে ব্যাপক গবেষণা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, যার বিরুদ্ধে গুমের অভিযোগ উঠবে, সেই বাহিনীকে দিয়ে তদন্ত করা হবে না। গুমের নির্দেশদাতারাও যাতে বিচারের আওতায় আসেন, আইন প্রণয়নের সময় বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
নিজের গুমের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে ব্যারিস্টার যোবায়ের আহমেদ ভূইয়া বলেন, গুম শুধু একজন ব্যক্তিকে নিখোঁজ করে না; এর প্রভাব পুরো পরিবারের ওপর পড়ে। একটি পরিবারকে দীর্ঘদিন আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা ও মানসিক যন্ত্রণার মধ্যে থাকতে হয়।
সেমিনারে বক্তারা গুমের সংস্কৃতির স্থায়ী অবসান, ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং গুমের নির্দেশদাতা ও সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।
সেমিনারে আরও উপস্থিত ছিলেন এবি পার্টির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আবদুল্লাহ আল মামুন রানা, আমিনুল ইসলাম এফসিএ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক আব্দুল হালিম খোকন, মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক সেলিম খান ও ইঞ্জিনিয়ার শাহেদ আলম।