স্টাফ রিপোর্টার:
ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে জুয়া ও মাদকের আসর থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায়, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর ভয় দেখিয়ে অর্থ দাবি এবং গ্রেপ্তারের হুমকি দিয়ে কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এ ছাড়া অনৈতিক লেনদেনসংক্রান্ত একটি বিতর্কিত অডিও রেকর্ড ছড়িয়ে পড়ার ঘটনায় স্থানীয়ভাবে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। এসব অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের চিহ্নিতকরণ এবং প্রতিকার চেয়ে ভুক্তভোগী ও সাংবাদিক নির্যাতন প্রতিরোধ সেলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বরাবর লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, গৌরীপুর উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জুয়া ও মাদককেন্দ্রিক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চললেও সেগুলো বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার পরিবর্তে সেখান থেকে নিয়মিত মাসোহারা আদায় করা হচ্ছে। স্থানীয় সূত্র ও একাধিক ভুক্তভোগীর অভিযোগ অনুযায়ী, উপজেলায় অন্তত ১৩টি জুয়ার আসর ও মাদকের আস্তানা থেকে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে ওসি হাবিবুর রহমানের বিরুদ্ধে। পাশাপাশি রাজনৈতিক মামলা ও মামলা-বাণিজ্যকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় থাকার অভিযোগও সামনে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট জুয়ার আসর, মাদককেন্দ্র এবং কথিত অর্থ লেনদেনের বিষয়ে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
স্থানীয় সাংবাদিক আল আমীন ও হীরার অভিযোগ, আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে সাধারণ মানুষকে হয়রানি এবং রাজনৈতিক মামলায় জড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে অর্থ আদায় করা হচ্ছে। তাঁদের দাবি, কোনো ব্যক্তি দাবিকৃত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে তাঁকে বিভিন্ন রাজনৈতিক মামলায় অজ্ঞাতনামা আসামি হিসেবে গ্রেপ্তার দেখানোর হুমকি দেওয়া হয়। এ ধরনের অভিযোগ সত্য হলে তা আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিরপেক্ষতা, নাগরিকের নিরাপত্তা এবং আইনের শাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তবে অভিযোগগুলোর বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এবং প্রামাণ্য নথি যাচাই করা জরুরি।
গৌরীপুরের বাসিন্দা আতিকুল ইসলাম অভিযোগ করে জানান, তিনি কোনো রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত নন। তারপরও রাজনৈতিক মামলায় ফাঁসিয়ে দেওয়ার ভয় দেখিয়ে তাঁর কাছ থেকে চার লাখ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। আতিকুলের ভাষ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি তানভীর আহমেদের মাধ্যমে ওসির কথা বলে ওই অর্থ নেওয়া হয়। তিনি অভিযোগ করেন, তিন মাস বাড়িতে অবস্থান করার পরও তাঁর কাছে নতুন করে টাকা দাবি করা হচ্ছে। এ ঘটনায় তিনি নিজের নিরাপত্তা ও আইনি প্রতিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বলে জানা গেছে। তবে অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যাঁদের নাম এসেছে, তাঁদের বক্তব্য এবং লেনদেনের প্রমাণ স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন সানজিদা শারমিন নামের এক নারী। তাঁর দাবি, স্বামীকে গ্রেপ্তারের ভয় দেখিয়ে কয়েক দফায় ওসির নাম ব্যবহার করে তাঁর কাছ থেকে অর্থ নেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, স্বামীকে আইনি জটিলতায় ফেলার আশঙ্কাকে কাজে লাগিয়ে অর্থ আদায় করা হয়। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য, অর্থ লেনদেনের তথ্য, যোগাযোগের রেকর্ড এবং লিখিত অভিযোগ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। ভুক্তভোগীদের অভিযোগের ভিত্তিতে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনের দাবি উঠেছে।
এদিকে ওসি হাবিবুর রহমানকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে একটি বিতর্কিত অডিও রেকর্ড। প্রতিবেদকের হাতে আসা ওই রেকর্ডে ওসি হিসেবে পরিচিত এক ব্যক্তিকে অপর এক পুলিশ কর্মকর্তার সঙ্গে পদায়ন ও অর্থ লেনদেন নিয়ে কথা বলতে শোনা যায় বলে দাবি করা হয়েছে। কথোপকথনে তাঁকে বলতে শোনা যায়, “অনেক কষ্ট করে টাকা দিয়ে আসছি, টাকাটা তুলব কীভাবে।” অডিওতে শোনা কথোপকথনকে কেন্দ্র করে পদায়ন, অর্থ লেনদেন এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রম নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছে। তবে রেকর্ডটির মূল কণ্ঠস্বর, কথোপকথনের সম্পূর্ণ প্রেক্ষাপট এবং এর সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। ফলে অডিওটির ভিত্তিতে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
অডিওতে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের লেখালেখি এবং সাংবাদিক এইচ টি তোফাজ্জল হোসেনকে গ্রেপ্তারের পর সৃষ্ট পরিস্থিতি নিয়েও আলোচনা রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। কথোপকথনের একটি অংশে থানা পুলিশকে সতর্ক থাকার পরামর্শ দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে বলে জানা যায়। এ ঘটনায় স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সাংবাদিকদের অভিযোগ, কোনো অনিয়ম বা অপরাধের তথ্য প্রকাশের কারণে সংবাদকর্মীদের হয়রানি করা হলে তা স্বাধীন সাংবাদিকতা ও জনস্বার্থে তথ্য প্রকাশের পরিবেশকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে। তবে অডিওটির পূর্ণাঙ্গ রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের পরিচয় এবং কথোপকথনের প্রেক্ষাপট যাচাই ছাড়া এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে ওসি মো. হাবিবুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় দেওয়ার পর তিনি সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন বলে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে যাঁদের নাম অর্থ লেনদেন, মধ্যস্থতা কিংবা অন্য অভিযোগের সঙ্গে এসেছে, তাঁদের বক্তব্যও যাচাই করা জরুরি।
গৌরীপুর সাংবাদিক ঐক্য ফোরামের সাধারণ সম্পাদক এইচ টি তোফাজ্জল হোসেনকে মারধর এবং মাদক দিয়ে ফাঁসানোর অভিযোগকে কেন্দ্র করেও এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা চলছে। ভুক্তভোগীর পরিবারের অভিযোগ, ময়মনসিংহ উত্তর জেলা ছাত্রদলের সহসভাপতি তানভীর আহমেদ, ডৌহাখলা ইউনিয়ন যুবলীগের সভাপতি তোফাজ্জল হোসেন মানিকসহ নয়জন এই ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। পরিবারের দাবি, ঘটনার পর যথাযথ প্রতিকার চাওয়া হলেও অভিযোগের বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। তাঁদের আরও অভিযোগ, ঘটনার ২৩ দিন পার হলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে থানায় মামলা গ্রহণ করেননি ওসি হাবিবুর রহমান। তবে ঘটনার সুনির্দিষ্ট তারিখ, থানায় অভিযোগ দাখিলের নথি, চিকিৎসাসংক্রান্ত কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করে এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ তথ্য নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, ওসির কার্যালয়ে নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এমন কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তির সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠতা ও গোপন সমঝোতা রয়েছে। তাঁদের দাবি, এ ধরনের সম্পর্কের কারণে এলাকায় অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে কথিত সমঝোতা, অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সহযোগিতা কিংবা অর্থ লেনদেনের অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ প্রকাশ্যে না আসা পর্যন্ত বিষয়গুলো অভিযোগ হিসেবেই বিবেচ্য। এসব বিষয়ে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, জুয়া ও মাদককেন্দ্রিক অপরাধ দমন, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং নিরপেক্ষভাবে আইন প্রয়োগ করা পুলিশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। কোনো পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অর্থ আদায়, মিথ্যা মামলায় ফাঁসানোর হুমকি কিংবা অপরাধীদের সঙ্গে যোগসাজশের অভিযোগ উঠলে তা যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করা প্রয়োজন। একইভাবে অভিযোগের কারণে কোনো ব্যক্তিকে আগাম দোষী সাব্যস্ত না করে প্রমাণ, সাক্ষ্য এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া জরুরি।
গৌরীপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে উত্থাপিত এসব অভিযোগের বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (উত্তর) আশরাফুল করিম বলেন, “গৌরীপুর থানার ওসির বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বিষয়টি নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে এবং অভিযোগের সত্যতা মিললে বিধি মোতাবেক কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
জেলা পুলিশের এই বক্তব্যে অভিযোগগুলো তদন্তের আশ্বাস পাওয়া গেলেও তদন্তের ফলাফল এখনো প্রকাশ্যে আসেনি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা, কথিত অর্থ লেনদেনের প্রকৃতি, অডিও রেকর্ডের নির্ভরযোগ্যতা এবং সাংবাদিক এইচ টি তোফাজ্জল হোসেনের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার প্রকৃত চিত্র জানতে নিরপেক্ষ তদন্তের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন অভিযোগকারী ও স্থানীয়রা।
এখন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি উঠেছে, লিখিত অভিযোগগুলো যথাযথভাবে পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় তদন্ত পরিচালনা, অর্থ লেনদেনের অভিযোগের প্রমাণ যাচাই, অডিও রেকর্ডের সত্যতা পরীক্ষা এবং ভুক্তভোগীদের বক্তব্য গ্রহণ করা হোক। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া এবং অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থানও স্পষ্টভাবে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।