কামরুল ইসলাম:
চট্টগ্রাম মহানগরীর বন্দরটিলা স্টিল মিল এলাকায় প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও ছাড়পত্র ছাড়া বেকারি পরিচালনা এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্যপণ্য তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এলাকাটিতে গড়ে ওঠা আইডিয়াল বেকারিসহ বিভিন্ন বেকারির কার্যক্রম নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, এসব প্রতিষ্ঠানে খাদ্য উৎপাদনের মৌলিক স্বাস্থ্যবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ করা হচ্ছে না। ফলে এসব বেকারিতে তৈরি কেক, পাউরুটি, বিস্কুট, চানাচুরসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মান ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, বন্দরটিলা স্টিল মিল ও র্যাব-৭ এলাকার আশপাশে অবস্থিত কিছু বেকারিতে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন, সনদ ও ছাড়পত্রের ঘাটতি রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানে উৎপাদিত খাদ্যপণ্য চট্টগ্রাম মহানগরীর বিভিন্ন বাজার, মুদি দোকান ও চায়ের দোকানে সরবরাহ করা হচ্ছে। অথচ খাদ্যপণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে পরিচ্ছন্নতা, নিরাপদ উপকরণ ব্যবহার এবং শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিশ্চিত করা জরুরি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এ ধরনের কার্যক্রম চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর পদক্ষেপ দৃশ্যমান নয়। ফলে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণ বন্ধ হচ্ছে না। এতে সাধারণ ভোক্তাদের স্বাস্থ্যঝুঁকি বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
প্রয়োজনীয় সনদ ও ছাড়পত্র নিয়ে প্রশ্ন
পরিবেশবিষয়ক বিধি-ব্যবস্থার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আবুল কালাম জানান, ওই এলাকায় যেসব বেকারি রয়েছে, সেগুলোর প্রয়োজনীয় সরকারি কাগজপত্র নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁর দাবি, অনেক প্রতিষ্ঠানের বিএসটিআই সনদ, ট্রেডমার্ক-সংক্রান্ত কাগজপত্র, পরিবেশগত ছাড়পত্র, মেডিকেল সনদসহ প্রয়োজনীয় অন্যান্য অনুমোদন নেই।
তবে সংশ্লিষ্ট বেকারিগুলোর প্রকৃত অনুমোদন ও সনদের অবস্থা যাচাই করতে সরকারি নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন। খাদ্যপণ্য উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য আইন এবং বিধিমালা অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া জরুরি।
বাজারে অবাধে বিক্রি হচ্ছে বেকারির পণ্য
স্থানীয়দের ভাষ্য, দীর্ঘদিন ধরে এসব বেকারিতে খাদ্যপণ্য উৎপাদন করে বাজারজাত করা হচ্ছে। উপজেলার বিভিন্ন মুদি দোকান, চায়ের দোকান এবং হাটবাজারে এসব পণ্য বিক্রি হতে দেখা যায়। তাঁদের অভিযোগ, পরিচিত ব্র্যান্ডের পণ্যের তুলনায় এসব পণ্যে লাভ বেশি হওয়ায় কিছু দোকানি এগুলো বিক্রিতে আগ্রহী।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে খাদ্যপণ্য তৈরিতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে। পাশাপাশি খাবারে ভেজাল রং ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে। তবে এসব উপকরণ ব্যবহারের বিষয়টি পরীক্ষাগারে নমুনা পরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, অনেক খাদ্যপণ্যের মোড়কে উৎপাদনের তারিখ, মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখ এবং মূল্যসংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে উল্লেখ থাকে না। ফলে পণ্যটির উৎপাদন ও মেয়াদ সম্পর্কে ভোক্তারা প্রয়োজনীয় তথ্য থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। এ পরিস্থিতিতে নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করা এবং ভোক্তাদের অধিকার রক্ষায় নিয়মিত নজরদারির দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
সরেজমিনে দেখা গেছে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে উৎপাদন কার্যক্রম
সরেজমিনে বেকারিটি ঘুরে দেখা যায়, সেখানে কেক, বিস্কুট, পাউরুটি ও চানাচুর তৈরির কাজ করছেন শ্রমিকেরা। তাঁদের কয়েকজনকে হাতে গ্লাভস ছাড়া ময়দা মাখানো ও প্রস্তুত করার কাজে অংশ নিতে দেখা যায়। কেউ কেউ খালি গায়ে কাজ করছিলেন। শ্রমিকদের শরীর ঘামে ভেজা অবস্থায় খাদ্য তৈরির কাজ করতে দেখা যায়।
ময়দা প্রস্তুতের সময় শ্রমিকদের মুখ ও কপাল থেকে ঘাম ময়দার মধ্যে পড়ার আশঙ্কা দেখা যায়। এ ছাড়া একজন শ্রমিককে এক হাতে ধূমপান এবং অন্য হাতে কাজ করতে দেখা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। খোলা পরিবেশে উৎপাদন কার্যক্রম চলায় ধুলাবালিও খাদ্যপণ্যের সংস্পর্শে আসতে পারে।
খাদ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে শ্রমিকদের ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতা, পরিষ্কার পোশাক, প্রয়োজন অনুযায়ী গ্লাভস ব্যবহার এবং উৎপাদনস্থল পরিষ্কার রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব বিষয়ে অবহেলা থাকলে খাদ্যদূষণের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। তাই বেকারিটির উৎপাদনব্যবস্থা, পরিচ্ছন্নতা এবং খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নিয়ম মানা হচ্ছে কি না, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
অভিযোগ রয়েছে, উৎপাদন খরচ কমাতে নিম্নমানের উপকরণ ব্যবহার করা হয়। এসব কারখানায় তৈরি খাদ্যপণ্য পরে আকর্ষণীয় মোড়কে বাজারে সরবরাহ করা হচ্ছে। ফলে পণ্যের বাহ্যিক মোড়ক দেখে ভোক্তাদের পক্ষে ভেতরের খাদ্যের মান ও নিরাপত্তা সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া কঠিন।
মালিকের বক্তব্য পাওয়া যায়নি, কাগজপত্র দেখাতে পারেননি ম্যানেজার
বন্দরটিলা স্টিল মিল এলাকায় অবস্থিত আইডিয়াল বেকারির পরিচালক ইকবালের সঙ্গে কথা বলার জন্য তাঁর মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
তবে বেকারিটির ম্যানেজার দাবি করেন, তাঁদের প্রতিষ্ঠানের প্রয়োজনীয় সব কাগজপত্র রয়েছে। কিন্তু এসব কাগজপত্র দেখতে চাইলে তিনি তা দেখাতে পারেননি। পরে তিনি জানান, বেকারিটির মূল মালিক একজন সরকারি কর্মকর্তা এবং তিনি সাংবাদিক বা প্রশাসনকে ভয় করেন না বলে দাবি করেন।
ম্যানেজারের বক্তব্যের সত্যতা যাচাই এবং বেকারিটির প্রকৃত মালিকানা, অনুমোদন ও পরিচালনাসংক্রান্ত তথ্য নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পরীক্ষা করা প্রয়োজন। এ বিষয়ে বেকারি কর্তৃপক্ষের পূর্ণাঙ্গ বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা যেতে পারে।
বেকারিটির এক ব্যক্তি জানান, তাঁদের কাছে শুধু খাদ্য লাইসেন্স রয়েছে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর জুন মাসে অফিস থেকে লোক এসে লাইসেন্স দিয়ে যান। তবে কোন দপ্তর থেকে লাইসেন্স দেওয়া হয় এবং এর সঙ্গে অন্য কোনো অনুমোদন বা ছাড়পত্র রয়েছে কি না, তা তিনি বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেননি।
শ্রমিকদের বক্তব্যে উঠে এসেছে স্বাস্থ্যবিধি মানার সীমাবদ্ধতা
বেকারিটির এক শ্রমিক বলেন, “সারাদিন আমাদের এই কাজের ওপরেই থাকতে হয়। এ জন্য হ্যান্ড গ্লাভস পরা হয় না। তবে আমাদের হ্যান্ড গ্লাভস আছে। আর এত নিয়মনীতি মেনে কাজ করা যায় না। নিয়ম ধরলে বাংলাদেশের ৯৯ শতাংশ প্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাবে।”
শ্রমিকের এই বক্তব্য থেকে কর্মপরিবেশ ও স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণের বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তবে কর্মীদের জন্য গ্লাভসসহ প্রয়োজনীয় সুরক্ষাসামগ্রী সরবরাহ করা হয় কি না এবং সেগুলো নিয়মিত ব্যবহার নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা কর্তৃপক্ষের তদন্তে যাচাই করা প্রয়োজন।
খাদ্য উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানে শ্রমিকদের প্রশিক্ষণ, পরিচ্ছন্নতা এবং স্বাস্থ্যবিধি সম্পর্কে সচেতনতা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে মালিকপক্ষের দায়িত্ব হলো নিরাপদ খাদ্য উৎপাদনের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করা এবং প্রযোজ্য আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করা।
অভিযান পরিচালনা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য
উপজেলা স্যানিটারি ইন্সপেক্টর ও নিরাপদ খাদ্য পরিদর্শক এবং দৈনিক স্বাধীন সংবাদ ও দৈনিক বাংলাদেশ পত্রিকার চট্টগ্রাম বিভাগের বিভাগীয় প্রধান কামরুল বলেন, “ম্যাজিস্ট্রেটরা সময় দিতে পারেন না। আমি পুলিশের সহযোগিতা চাইলে আইন অনুযায়ী তারা দিতে বাধ্য। তবে অনেক সময় তারাও নানা কাজের জন্য ফোর্স দিতে পারে না। এ জন্যই অবৈধ বেকারির বিরুদ্ধে ঢালাওভাবে অভিযান বা নিউজ করা সম্ভব হয় না।”
তাঁর বক্তব্যে অভিযান পরিচালনার ক্ষেত্রে জনবল ও প্রশাসনিক সহযোগিতা পাওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে বেকারিগুলোর অনুমোদন যাচাই, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং অনিয়ম পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপরই বর্তায়।
স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ
সচেতন মহলের মতে, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে তৈরি খাবার গ্রহণের ফলে খাদ্যবাহিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে। খাবারে অননুমোদিত রং বা ক্ষতিকর রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহার করা হলে তা জনস্বাস্থ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি নির্ধারণের জন্য অবশ্য ব্যবহৃত উপাদান ও খাদ্যপণ্যের পরীক্ষার ফল গুরুত্বপূর্ণ।
বিশেষ করে শিশুদের খাদ্যনিরাপত্তার বিষয়টি অত্যন্ত সংবেদনশীল। বেকারির পণ্য শিশু থেকে শুরু করে বিভিন্ন বয়সের মানুষ নিয়মিত খেয়ে থাকেন। তাই এসব পণ্যের উৎপাদনপ্রক্রিয়া, উপকরণের মান, সংরক্ষণব্যবস্থা এবং মোড়কে প্রয়োজনীয় তথ্যের উপস্থিতি নিশ্চিত করা জরুরি।
নিয়মিত তদারকি ও কার্যকর পদক্ষেপের দাবি
স্থানীয়দের অভিযোগ, মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ব্যবস্থা থাকলেও আইডিয়াল বেকারিতে অভিযান পরিচালনা করতে তাঁরা দেখেননি। এ কারণে বেকারিটির অনুমোদন, উৎপাদনব্যবস্থা এবং খাদ্য নিরাপত্তা-সংক্রান্ত বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করার দাবি উঠেছে।
সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে স্থানীয়দের প্রত্যাশা, বন্দরটিলা স্টিল মিল এলাকায় পরিচালিত বেকারিগুলোর লাইসেন্স ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র যাচাই করা হোক। পাশাপাশি উৎপাদনস্থলের পরিচ্ছন্নতা, শ্রমিকদের স্বাস্থ্যবিধি, খাদ্যপণ্যের উপকরণ এবং মোড়কে উৎপাদন ও মেয়াদোত্তীর্ণের তারিখসহ প্রয়োজনীয় তথ্য উল্লেখ করা হচ্ছে কি না, তা পরীক্ষা করা হোক।
অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। একই সঙ্গে নিয়মিত তদারকি ও জনসচেতনতা বৃদ্ধির মাধ্যমে ভোক্তাদের জন্য নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন সচেতন মহল।