ছেঁড়া-ফাঁড়া নোটে অতিষ্ঠ সাধারণ মানুষ, বাড়ছে রোগব্যাধির ঝুঁকি, টাকার একাংশ পোড়ে মাদকের আগুনে এই সমস্যার সমাধান কোথায়?

মোঃ ইসলাম উদ্দিন তালিকদার :
বাজারে এখন ভালো খুচরা টাকা খুঁজে পাওয়া যেন ভাগ্যের ব্যাপার। হাতে হাতে ঘুরছে ছেঁড়া, ময়লাযুক্ত, আগুনে পোড়া ও দুর্গন্ধযুক্ত নোট। কোথাও কোনা ছেঁড়া, কোথাও মাঝখান ফাটা, আবার অনেক টাকার একাংশ আগুনে ঝলসে গেছে। এসব টাকা নিয়ে প্রতিদিন সাধারণ মানুষকে পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে। দোকানদার, রিকশাচালক, শ্রমিক, পথের ফেরিওয়ালা থেকে শুরু করে সব শ্রেণি-পেশার মানুষ এখন যেন ‘অচল’ টাকার যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ।
উপজেলার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের সামনে ছোট্ট একটি পান-সিগারেটের দোকান চালান লিটল ফকির। ভোর থেকে রাত পর্যন্ত ক্রেতাদের সঙ্গে লেনদেন করতে গিয়ে প্রতিনিয়ত তাকে ঝগড়া-বিবাদে জড়াতে হয়। কারণ, প্রায় সব খুচরা টাকাই ছেঁড়া বা ময়লাযুক্ত।
ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন,
“সব খুচরা টেহাই ছিঁড়া-ফাঁড়া। কোনা-কানায় আগুনে পুড়া। হারাদিন ৩০/৪০ জন কাস্টমারের লগে এই টেহা লইয়া কাইজ্জা করতে হয়। মিজাজ কেমনে ভালো থাকব?”
শুধু লিটল ফকির নন, একই দুর্ভোগের কথা বললেন মহির খারুয়া গ্রামের রিকশাচালক মনির উদ্দিনও। প্রতিদিন যাত্রীদের কাছ থেকে ছেঁড়া নোট নিতে নিতে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছেন তিনি।
তিনি বলেন,
“যাত্রীরা ভাড়া দেয় ছিঁড়া-ফাঁড়া টেহা। আবার ভাংতি ফেরত দেওনের সময় আমিও বাধ্য হইয়া ওই টেহাই দেই। বাজারে ভালো খুচরা টেহা নাই বললেই চলে।”
স্থানীয় বাজার ঘুরে দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি সংকট ১০, ২০ ও ৫০ টাকার নোটে। নতুন নোটের অনেকগুলোর কোণা আগুনে পোড়া। ব্যবসায়ীরা বলছেন, এসব টাকা নিতে কেউ চায় না। ফলে একজন আরেকজনের হাতে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। এতে প্রায়ই সৃষ্টি হয় তর্ক-বিতর্ক ও অপ্রীতিকর পরিস্থিতি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, মাদকসেবীদের একটি অংশ নতুন খুচরা টাকার ওপর মাদক রেখে আগুন ব্যবহার করে সেবন করে। এ কারণেই বাজারে প্রচলিত অনেক নতুন নোটের একাংশ পুড়ে যায়। পরে সেই নোটই আবার সাধারণ মানুষের হাতে হাতে ঘুরতে থাকে।
তবে সমস্যার এখানেই শেষ নয়। ছেঁড়া-ফাঁড়া ও ময়লাযুক্ত এসব টাকা এখন জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকি হয়ে উঠেছে। দিনের পর দিন অসংখ্য মানুষের হাতে ঘুরতে থাকা নোটে জমছে ময়লা, জীবাণু ও ব্যাকটেরিয়া। বিশেষজ্ঞদের মতে, অপরিষ্কার টাকার মাধ্যমে সহজেই ছড়াতে পারে বিভিন্ন সংক্রামক রোগ।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মোহাম্মদ জামাল উদ্দিন বলেন,
“ময়লাযুক্ত ও ছেঁড়া টাকার মাধ্যমে স্ক্যাবিস, একজিমা, অ্যালার্জিসহ বিভিন্ন চর্মরোগ ছড়াতে পারে। এছাড়া ডায়রিয়া, আমাশয় ও পেটের নানা রোগের ঝুঁকিও বাড়ে।”
তিনি আরও জানান, টাকা ব্যবহারের পর হাত পরিষ্কার না করলে জীবাণু সহজেই খাদ্যের সঙ্গে শরীরে প্রবেশ করতে পারে। বিশেষ করে শিশু ও বয়স্কদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি।
অন্যদিকে ব্যাংকগুলোও অনেক সময় এসব ছেঁড়া ও পোড়া টাকা নিতে অনীহা দেখায় বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়ে বাজারেই সেই টাকা চালিয়ে দেন। এতে সমস্যার কোনো সমাধান হচ্ছে না, বরং দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে।
সরকারি একটি ব্যাংকের এক শাখা ব্যবস্থাপক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,
“প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতিবছর ছেঁড়া ও ময়লাযুক্ত নোট বাংলাদেশ ব্যাংকের মাধ্যমে বাজার থেকে প্রত্যাহার করে নতুন নোট ছাড়ার কথা। কিন্তু কয়েক বছর ধরে পর্যাপ্ত নতুন টাকা বাজারে আসছে না। ফলে পুরোনো নোটই ঘুরেফিরে মানুষের হাতে থাকছে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, ঈদ বা বিশেষ উৎসব ছাড়া নতুন নোট এখন আর চোখেই পড়ে না। বাজারে যেসব টাকা রয়েছে তার বড় একটি অংশই ব্যবহারের অনুপযোগী। অথচ সাধারণ মানুষ বাধ্য হয়েই সেসব টাকা গ্রহণ করছে।
সচেতন মহলের দাবি, দ্রুত বাজার থেকে ছেঁড়া-ফাঁড়া ও ময়লাযুক্ত টাকা প্রত্যাহার করে পর্যাপ্ত নতুন নোট ছাড়তে হবে। পাশাপাশি ব্যাংকগুলোকে সহজ শর্তে পুরোনো টাকা বদলের ব্যবস্থা করতে হবে। না হলে অর্থের সঙ্গে জীবাণুও ছড়িয়ে পড়বে মানুষের ঘরে ঘরে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *