ছোবানিয়া এতিমখানার উন্নয়নকাজে অনিয়মের অভিযোগ

মোঃ শামীম হোসেন সিকদার:

বান্দরবান পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের ঐতিহ্যবাহী ছোবানিয়া হাফেজিয়া এতিমখানার উন্নয়নকাজে ব্যাপক অনিয়ম ও নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ডের অর্থায়নে প্রায় ৯৬ লাখ ৮৬ হাজার ৩৮০ টাকা ব্যয়ে বাউন্ডারি ওয়াল ও একতলা ভবন নির্মাণের এ প্রকল্প ঘিরে স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

প্রকল্পটির নির্মাণকাজের দায়িত্বে রয়েছেন ঠিকাদার মোঃ মাহফুজ চৌধুরী। স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকল্পের নির্ধারিত নকশা, কারিগরি নির্দেশনা ও চুক্তির শর্ত যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই কাজ চালিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে সরকারি অর্থের অপচয় ও আত্মসাতের আশঙ্কা করছেন তারা। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কারিগরি তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন সচেতন মহল।

সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্মাণকাজের বিভিন্ন ধাপে নির্ধারিত মান ও পরিমাণ অনুসরণ করা হচ্ছে না বলে অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে বাউন্ডারি ওয়ালের বীম, রিং, বেইস প্রস্তুত, সলিং, বালু ও সিমেন্টের মিশ্রণসহ বিভিন্ন কাজে অনিয়মের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও এতিমখানা সংশ্লিষ্টরা।

একজন স্থানীয় অভিভাবক অভিযোগ করে বলেন, বীমের প্রস্থ নির্ধারিত থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তা অনেক কম দেওয়া হচ্ছে। একইভাবে রিং নির্দিষ্ট দূরত্বে দেওয়ার কথা থাকলেও বেশি ফাঁকা রেখে রিং বাঁধানো হচ্ছে। তার দাবি, এভাবে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলে ভবিষ্যতে দেয়ালটির স্থায়িত্ব নিয়ে বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, ধর্মীয় ও এতিম শিশুদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নকাজে কোনো ধরনের ছাড় দেওয়া উচিত নয়। সরকারি অর্থে নির্মিত স্থাপনা যেন দীর্ঘস্থায়ী ও নিরাপদ হয়, সে বিষয়টি নিশ্চিত করা জরুরি।

এলাকার আরেক প্রবীণ বাসিন্দার অভিযোগ, নির্মাণকাজের ভিত্তি তৈরির ক্ষেত্রেও যথাযথ নিয়ম মানা হচ্ছে না। তার ভাষ্য অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় সলিং ও বেইস প্রস্তুত না করেই সরাসরি মাটির ওপর নির্মাণকাজ চালানো হচ্ছে। কোথাও নির্ধারিত পুরুত্বের তুলনায় কম বালু ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও তিনি দাবি করেন।

এ ছাড়া সিমেন্ট ও বালুর মিশ্রণের অনুপাত নিয়েও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, প্রকল্পের কারিগরি নির্দেশনা অনুযায়ী যে অনুপাতে সিমেন্ট-বালু ব্যবহারের কথা, বাস্তবে তার চেয়ে অনেক কম সিমেন্ট ব্যবহার করা হচ্ছে। ফলে নির্মাণকাজের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় এক তরুণ সামাজিক কর্মী বলেন, বাউন্ডারি ওয়াল নির্মাণের সীমানায় থাকা পুরনো গাছ কাটার পরও মাটির নিচে থাকা শিকড় যথাযথভাবে অপসারণ করা হয়নি। তার আশঙ্কা, ভবিষ্যতে এসব শিকড় পচে মাটিতে ফাঁকা জায়গা তৈরি হলে দেয়ালের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যেতে পারে। তাই কাজের প্রতিটি ধাপ প্রকৌশলীদের উপস্থিতিতে পরীক্ষা করে নেওয়ার দাবি জানান তিনি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, নির্মাণকাজে ব্যবহৃত উপকরণের মান, পরিমাণ ও কাজের পদ্ধতি নিয়মিতভাবে পরীক্ষা করা হলে এ ধরনের অনিয়মের সুযোগ থাকার কথা নয়। এ কারণে প্রকল্পটির তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও কর্মকর্তাদের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন তারা।

তাদের দাবি, প্রকল্পের কাজ যথাযথভাবে তদারকি করা হচ্ছে কি না, নির্মাণসামগ্রীর গুণগত মান পরীক্ষা করা হয়েছে কি না এবং ঠিকাদার চুক্তির শর্ত অনুযায়ী কাজ করছেন কি না—এসব বিষয় তদন্ত করা প্রয়োজন।

অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার মোঃ মাহফুজ চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

অন্যদিকে, সংশ্লিষ্ট তদারকি কর্মকর্তাদের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। ফলে স্থানীয়দের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য ও প্রকল্পের কারিগরি নথিপত্র যাচাই করা জরুরি হয়ে পড়েছে।

এলাকাবাসী বলছেন, এটি শুধু একটি সাধারণ নির্মাণ প্রকল্প নয়; এখানে এতিম শিশুদের আবাসন ও একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত নিরাপত্তার বিষয় জড়িত। নিম্নমানের নির্মাণকাজ হলে ভবিষ্যতে স্থাপনাটি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়তে পারে এবং এতে সরকারি অর্থ ব্যয়ের উদ্দেশ্যও ব্যাহত হবে।

এ কারণে তারা দ্রুত প্রকল্পটির নির্মাণকাজের গুণগত মান পরীক্ষা, নকশা ও প্রাক্কলনের সঙ্গে বাস্তব কাজের মিল যাচাই এবং প্রয়োজন হলে নিরপেক্ষ কারিগরি তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের আরও দাবি, তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত সন্দেহজনক বা নিম্নমানের কাজ বন্ধ রেখে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীদের মাধ্যমে প্রকল্পের প্রতিটি ধাপ পরীক্ষা করা হোক। পাশাপাশি সরকারি অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড, জেলা প্রশাসন এবং দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগের পাশাপাশি প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র জানতে সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী, ঠিকাদার ও প্রকল্প কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়া এবং নির্মাণকাজের নকশা, প্রাক্কলন ও কার্যাদেশ পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া এবং কাজের মান নিশ্চিত করে প্রকল্পটি সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছেন ছোবানিয়া হাফেজিয়া এতিমখানা সংশ্লিষ্টরা ও স্থানীয় বাসিন্দারা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *