জোরারগঞ্জ থানার আশপাশে মাদকের বিস্তার, সেকেন্ড অফিসারের বিরুদ্ধে আঁতাতের অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:


মিরসরাই উপজেলা-এর জোরারগঞ্জ থানা এলাকাজুড়ে মাদক বাণিজ্য বিস্তারের অভিযোগ ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, থানা সংলগ্ন বিভিন্ন পয়েন্ট—বিশেষ করে বারইয়ারহাট বাসস্ট্যান্ড ও বাম্পার রেলওয়ে স্টেশন এলাকায়—দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে মাদক কেনাবেচা চলছে। এ নিয়ে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বারইয়ারহাট বাসস্ট্যান্ডের আশপাশে আজিম নামে এক ব্যক্তি নিয়মিতভাবে মাদক সরবরাহ করে আসছে বলে অভিযোগ রয়েছে। একইভাবে বাম্পার রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন এলাকায় মিজান নামে আরেকজনের নেতৃত্বে একটি চক্র সক্রিয় বলে জানান একাধিক বাসিন্দা। এলাকাবাসীর ভাষ্য, সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব স্থানে সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আনাগোনা বাড়ে এবং গোপনে ইয়াবা, গাঁজা ও অন্যান্য নেশাজাতীয় দ্রব্য লেনদেন হয়।

একজন স্থানীয় ব্যবসায়ী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রতিদিনই অচেনা লোকজন আসে, কয়েক মিনিট অবস্থান করে চলে যায়। আমরা বুঝতে পারি এখানে মাদক লেনদেন হচ্ছে, কিন্তু ভয়ে কেউ মুখ খোলে না।” আরেক অভিভাবক বলেন, “আমাদের সন্তানদের নিয়ে আমরা শঙ্কিত। এত সহজে মাদক পাওয়া গেলে তরুণরা বিপথে যাবে—এটাই স্বাভাবিক।”

এদিকে আরও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে থানার সেকেন্ড অফিসার লিটনের বিরুদ্ধে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, কিছু মাদক ব্যবসায়ীর সঙ্গে তার গোপন যোগাযোগ রয়েছে এবং তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ার পেছনে আঁতাত থাকতে পারে। যদিও এ অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ উপস্থাপন করতে পারেননি অভিযোগকারীরা।

অভিযোগ প্রসঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সেকেন্ড অফিসার লিটন বলেন, “আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। মাদকবিরোধী অভিযানে আমরা নিয়মিত কাজ করছি। কোনো নির্দিষ্ট তথ্য পেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” তিনি আরও দাবি করেন, “থানা এলাকায় মাদক নির্মূলে পুলিশ আন্তরিক। ব্যক্তিগত স্বার্থে কেউ অপপ্রচার চালালে তা তদন্ত করে দেখা হবে।”

স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, মাদক সমস্যা এখন সামাজিক মহামারির রূপ নিয়েছে। কিশোর-তরুণদের একটি অংশ দ্রুত অর্থ উপার্জনের আশায় মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে। অপরদিকে সহজলভ্যতার কারণে অনেকেই নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে। এতে পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, চুরি-ছিনতাইসহ নানা অপরাধ বাড়ছে।

একজন কলেজশিক্ষক বলেন, “মাদক শুধু ব্যক্তিকে নয়, পুরো সমাজকে ধ্বংস করে। একজন শিক্ষার্থী নেশায় জড়ালে তার ভবিষ্যৎ অন্ধকার হয়ে যায়। তাই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, অভিভাবক ও স্থানীয় নেতৃত্বকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”

এলাকাবাসীর অভিযোগ, মাঝে মধ্যে অভিযান পরিচালিত হলেও তা নিয়মিত বা টেকসই নয়। ফলে কয়েকদিন পরিস্থিতি শান্ত থাকলেও পরে আবার আগের মতো হয়ে যায়। তাদের দাবি, মাদক বিক্রির নির্দিষ্ট স্পটগুলো চিহ্নিত করে স্থায়ী নজরদারি বসাতে হবে এবং জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।

সামাজিক বিশ্লেষকদের মতে, মাদক ব্যবসা একটি লাভজনক অবৈধ বাণিজ্য। নগদ অর্থের প্রবাহ দ্রুত হওয়ায় অনেকে ঝুঁকি জেনেও এতে জড়িয়ে পড়ে। যদি কঠোরভাবে দমন না করা হয়, তবে এ চক্র আরও বিস্তৃত হতে পারে। “মাদক বন্ধ হলে অনেকের অবৈধ আয় বন্ধ হয়ে যাবে—এই কারণেই কিছু স্বার্থান্বেষী মহল বিষয়টি চুপচাপ থাকতে দিতে চায়,” বলেন এক সমাজকর্মী।

এ বিষয়ে বাংলাদেশ পুলিশ-এর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন স্থানীয়রা। তারা চান, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগগুলো খতিয়ে দেখা হোক এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। একই সঙ্গে তারা মাদকবিরোধী বিশেষ টাস্কফোর্স গঠন ও নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনার দাবি জানান।

সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা—থানার আশপাশে মাদক বাণিজ্যের অভিযোগ দ্রুত তদন্ত করে সত্য উদঘাটন করা হবে। যদি কোনো পুলিশ সদস্যের গাফিলতি বা সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়, তবে তার বিরুদ্ধেও আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া উচিত বলে মনে করেন তারা।

জোরারগঞ্জের বাসিন্দাদের ভাষায়, “মাদক বন্ধ না হলে যুব সমাজ ধ্বংস হবে। এখনই কঠোর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।”

সবশেষে, এলাকাবাসীর দাবি—মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগই পারে আস্থা ফিরিয়ে আনতে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ অভিযোগগুলো কতটা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করে এবং দৃশ্যমান পদক্ষেপ নেয়।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *