আমির হোসেন:
ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার ৯ নম্বর দপদপিয়া ইউনিয়নের ভরতকাঠি ও পশ্চিম বীর নারায়ণ এলাকায় খয়রাবাদ নদীর ভাঙন রোধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছেন স্থানীয়রা। নদীতীর সংরক্ষণ, বেড়িবাঁধ ও সড়ক নির্মাণ এবং ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবিতে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।
রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) দুপুর সাড়ে ১২টায় ঝালকাঠি জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে দপদপিয়া ইউনিয়ন খয়রাবাদ নদীভাঙন প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটির উদ্যোগে কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়। এতে স্কুলশিক্ষার্থীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েক শতাধিক মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধন শেষে বিক্ষোভ মিছিলটি শহরের প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের সামনে এসে শেষ হয়। পরে জেলা প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
মানববন্ধনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল (বাসদ) বরিশাল জেলা শাখার সমন্বয়ক ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, নদীভাঙন দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের জন্য দীর্ঘদিনের এক বিভীষিকা। একবার নদীতে ঘরবাড়ি হারালে মানুষ নতুন করে ঘর তুলেও স্থায়ী নিরাপত্তা পায় না। ভাঙনের শিকার মানুষকে বিভিন্ন জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়।
নদীভাঙনকবলিত মানুষের পুনর্বাসন ও ক্ষতিপূরণে কার্যকর উদ্যোগ না থাকার অভিযোগ করে তিনি বলেন, জলবায়ু তহবিলের অর্থের সুফল নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছাচ্ছে না। পাশাপাশি নদীভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় গবেষণা ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনারও ঘাটতি রয়েছে।
এ সময় ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, “আমরা জানুয়ারি মাস, ডিসেম্বর মাস থেকে শুনছি এখানে বেড়িবাঁধ হবে, এখানে রাস্তা হবে। কবে হবে? আর কয়টা বর্ষার সিজনে কয়শ লোকের ঘরবাড়ি ভাঙলে পরে আপনারা রাস্তা করবেন, বেড়িবাঁধ করবেন—এই প্রশ্ন তো এলাকার মানুষ করতে চায়।”
নদীভাঙনের কারণে শিক্ষার্থীদের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, সড়ক ভেঙে যাওয়ায় ছোট ছোট শিশুরা ঠিকভাবে স্কুলে যেতে পারছে না। পানিতে ভিজে গেলে পোশাক পরিবর্তনের জন্য তাদের অতিরিক্ত পোশাক সঙ্গে রাখতে হয়। সড়কের বেহাল অবস্থায় জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে। এমনকি কবরস্থানও নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে।
এর আগে উপজেলা প্রশাসনের কাছে দাবি জানানো হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা হয়নি উল্লেখ করে ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, জেলা প্রশাসকের কাছে দাবি জানানোর পরও কাজ না হলে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ বৃহত্তর আন্দোলনে গেলে সেটির দায় তাঁদের ওপর চাপানো যাবে না। এমন আন্দোলনের যৌক্তিক ভিত্তি ও ন্যায্যতা থাকবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের প্রতি দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে ডা. মনীষা চক্রবর্তী বলেন, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্তদের পুনর্বাসনের পাশাপাশি মানুষকে ভাঙনের হাত থেকে রক্ষায় বেড়িবাঁধ ও রাস্তাঘাট নির্মাণ করতে হবে। তিনি বলেন, “আমাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে আমাদের রাস্তাঘাট নির্মাণ করুন। আমাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে আমাদের বাড়িঘর রক্ষা করুন। আমাদের ট্যাক্সের টাকা দিয়ে আমাদেরকে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করুন।”
খয়রাবাদ নদীভাঙন প্রতিরোধের আন্দোলনে বাসদের সমর্থন অব্যাহত থাকবে জানিয়ে তিনি বলেন, “এই খয়রাবাদ নদীভাঙন আন্দোলন যতদিন চলবে, সেই আন্দোলনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদের পক্ষ থেকে আমরা এই আন্দোলনের সঙ্গে আছি।”
ভুক্তভোগীদের দাবি, প্রায় ১০০ বছর ধরে খয়রাবাদ নদীর ভাঙনে এলাকার মানুষের বসতভিটা, পৈতৃক সম্পত্তি ও পূর্বপুরুষদের কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। বর্তমানে ২০০টির বেশি পরিবার ও অন্তত এক হাজার মানুষ বসতভিটা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, নদী থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের কারণে ভাঙনের তীব্রতা আরও বেড়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, প্রায় এক কিলোমিটার নদীতীর জরুরি ভিত্তিতে সংরক্ষণ করা প্রয়োজন। তাঁরা নদীতীরে প্রতিরোধ ব্যবস্থা, স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক সংস্কার এবং ভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের দাবি জানান।
এর আগে গত ৭ জুন নলছিটি উপজেলা প্রশাসনের কাছে একই দাবিতে মানববন্ধন করে স্মারকলিপি দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রায় তিন মাসেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে দাবি করেন ভুক্তভোগীরা।
কর্মসূচিতে দপদপিয়া ইউনিয়ন খয়রাবাদ নদীভাঙন প্রতিরোধ সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক মো. রুহুল আমিন হাওলাদার, যুগ্ম আহ্বায়ক মো. ফরিদ হাওলাদার, সদস্যসচিব মো. রমজান আকন হৃদয়, যুগ্ম সদস্যসচিব মো. রুবেল হাওলাদারসহ স্থানীয়রা বক্তব্য দেন।
বক্তারা দ্রুত নদীভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা, নদীতীর সংরক্ষণ, বেড়িবাঁধ ও সড়ক নির্মাণ এবং ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসনের জোর দাবি জানান।