ডেমরায় ভয়ংকর ভূমিদস্যু জুনায়েদের দৌরাত্ম্য: জাল দলিলে হাতিয়ে নিচ্ছে কোটি টাকা

ক্রাইম রিপোর্টার:

রাজধানীর ডেমরা এলাকায় “জুনায়েদ” নামের এক কথিত ভূমিদস্যুর বিরুদ্ধে ভয়াবহ প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সে জাল দলিল ও ভুয়া ওয়ারিশ সনদের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার জমি দখল করছে। এতে সাধারণ মানুষ নিজেদের বৈধ সম্পত্তি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।

তথ্য অনুসন্ধানে জানা গেছে, ডেমরা রাজস্ব সার্কেলসহ আশপাশের বিভিন্ন ভূমি অফিসকে কেন্দ্র করে একটি শক্তিশালী চক্র সক্রিয় রয়েছে। এই চক্রের মাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে জাল দলিল তৈরি, ভুয়া কাগজপত্র সংগ্রহ এবং অবৈধভাবে নামজারি (মিউটেশন) সম্পন্ন করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রকৃত জমির মালিকরা হঠাৎ করেই দেখতে পাচ্ছেন তাদের জমির রেকর্ড পরিবর্তন হয়ে অন্যের নামে চলে গেছে—অনেক ক্ষেত্রে সেখানে মালিক হিসেবে উঠে আসছে জুনায়েদের নাম।

ভুক্তভোগীরা জানান, বিষয়টি বুঝে ওঠার আগেই জমি দখল হয়ে যাচ্ছে এবং পরে আইনি জটিলতায় পড়ে তারা অসহায় হয়ে পড়ছেন। দীর্ঘসূত্রিতা ও প্রভাবশালীদের ছত্রছায়ার কারণে অনেকেই ন্যায়বিচার পাচ্ছেন না। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম ভীতি ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ডেমরা রাজস্ব সার্কেলের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশ ছাড়া এমন জালিয়াতি সম্ভব নয়। মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে তারা জাল কাগজপত্রকে বৈধতা দিয়ে দিচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। এর ফলে এই চক্রের কার্যক্রম দিন দিন আরও বিস্তৃত হয়ে একটি সুসংগঠিত অপরাধ নেটওয়ার্কে রূপ নিয়েছে।

বিশেষ করে যেসব জমির মালিক দেশের বাইরে থাকেন বা দীর্ঘদিন অনুপস্থিত থাকেন, সেই জমিগুলোকে টার্গেট করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। ভুয়া ওয়ারিশ সনদ তৈরি করে এবং জাল নামজারির মাধ্যমে মালিকানা পরিবর্তন করে জমি দখল করা হচ্ছে। এমনকি একটি নির্দিষ্ট নামজারি কেস (নং ১৩৭৬৯/২২-২৩) ভুয়া ওয়ারিশ সনদের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে, যা পরিস্থিতির ভয়াবহতা আরও স্পষ্ট করে।

জানা গেছে, জুনায়েদের গ্রামের বাড়ি দিনাজপুর জেলায় হলেও বর্তমানে সে রাজধানীর গোপীবাগ এলাকায় বসবাস করছে। সেখান থেকেই সে তার পুরো সিন্ডিকেট পরিচালনা করে থাকে। তার নিয়ন্ত্রণে থাকা লোকজন বিভিন্ন ভূমি অফিসে সক্রিয় থেকে জাল কাগজপত্র তৈরি, দালালি এবং প্রভাব খাটানোর কাজ করে থাকে। অল্প সময়ের মধ্যেই সে বিপুল সম্পদের মালিক বনে গেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

এদিকে, এই চক্রের পেছনে প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়া রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। রাজনৈতিক প্রভাব ও ক্ষমতার অপব্যবহার করে তারা প্রশাসনিক বাধা সহজেই অতিক্রম করছে। ফলে ভুক্তভোগীরা অনেক ক্ষেত্রে প্রতিবাদ করার সাহস পাচ্ছেন না। যারা প্রতিবাদ করার চেষ্টা করেছেন, তাদের হুমকি ও ভয়ভীতির মুখে পড়তে হয়েছে বলে জানা গেছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূমিদস্যুতা এখন শহরাঞ্চলে একটি বড় সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমস্যায় পরিণত হয়েছে। জমির মূল্য বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এ ধরনের অপরাধও বেড়েছে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় দ্রুত, কঠোর এবং নিরপেক্ষ পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট সকলের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত পরিচালনা করে দোষীদের আইনের আওতায় আনতে হবে।

তারা আরও বলেন, ভূমি অফিসগুলোর কার্যক্রমে ডিজিটাল নজরদারি, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। এতে ভবিষ্যতে এ ধরনের জালিয়াতি কমানো সম্ভব হবে এবং সাধারণ মানুষ তাদের সম্পত্তির নিরাপত্তা সম্পর্কে আশ্বস্ত হতে পারবেন।

এলাকাবাসী ও ভুক্তভোগীরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তাদের দাবি, দ্রুত তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করতে হবে, অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে এবং ক্ষতিগ্রস্তদের জমি ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে।

তাদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে এই ভূমিদস্যু চক্রের দৌরাত্ম্য আরও বেড়ে যাবে এবং নগরবাসীর নিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জীবনযাপন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *