কাওসার আহমেদ পনির:
বিগত সরকারের দীর্ঘ শাসনামল এবং রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপটকে পুঁজি করে ঢাকা ওয়াসার (DWASA) জোন-৩-এর বিতর্কিত রাজস্ব পরিদর্শক (প্রাক্তন মিটার রিডার) হারুন অর রশিদ (রানা) যেন ‘আলাদীনের চেরাগ’ হাতে পেয়েছেন। তৎকালীন সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের প্রভাবশালী নেতা, মন্ত্রী, বিশেষ করে নানক ও অন্যান্য প্রভাবশালী গ্রুপ এবং ওয়াসার ঊর্ধ্বতন মহলের ঘনিষ্ঠ আশীর্বাদপুষ্ট পরিচয় খাটিয়ে তিনি দুর্নীতির এক মহোৎসবে মেতেছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মাত্র ৩৫ হাজার টাকা স্কেলের একজন তৃতীয় শ্রেণির সাধারণ কর্মচারী হয়েও তিনি গড়ে তুলেছেন শতকোটি টাকার এক বিশাল ও অভেদ্য সম্পদের পাহাড়—এমন অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমান সরকার যখন দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা ঘোষণা করেছে, তখন এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তার আর পার পাওয়ার সুযোগ থাকছে না বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। জানা গেছে, সরকারের কঠোর সাঁড়াশি অভিযানের মুখে নিজেকে বাঁচাতে রাতারাতি ভোল পাল্টানোর খেলায় নেমেছেন হারুন। অতীত অপরাধ ঢাকতে ও আইনি শাস্তি থেকে বাঁচতে তিনি এখন নিজেকে বিএনপিপন্থী প্রমাণ করার জোর চেষ্টা চালাচ্ছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় তার এই পর্বতসম দুর্নীতির খবর প্রকাশিত হওয়ার পরও তিনি কীভাবে এখনো বহাল তবিয়তে আছেন, তা নিয়ে জনমনে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি ওয়াসার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারাও এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত এবং তাকে আড়াল করার চেষ্টা করছেন?
সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগ অনুযায়ী, বিগত সরকারের রাজনৈতিক প্রটোকল ব্যবহার করার কারণে হারুনের দুর্নীতির বিরুদ্ধে কথা বলার সাহস পায়নি কেউ। অভিযোগ রয়েছে, তিনি মূলত তিনটি অভিনব উপায়ে ঢাকা ওয়াসাকে ফোকলা করে এই অনৈতিক সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছেন। প্রথমত, আন্ডার বিলিং ও মিটার টেম্পারিংয়ের মাধ্যমে গ্রাহকদের পানির প্রকৃত ব্যবহার গোপন করে বিল কম দেখানো এবং মিটারে বিশেষ কারসাজির মাধ্যমে রিডিং কমিয়ে রাখার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এর বিনিময়ে নিয়মিত মোটা অঙ্কের মাসোহারা আদায় করা হতো বলেও অভিযোগ রয়েছে, যা সরাসরি সরকারের রাজস্বে বিশাল ধস নামিয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
দ্বিতীয়ত, ঢাকা ওয়াসার কোনো প্রকার অনুমোদন ছাড়াই শত শত বাণিজ্যিক ভবন ও বহুতল আবাসিক ভবনে অবৈধ পানির মেইন লাইনের সংযোগ দিয়ে এককালীন বিপুল অঙ্কের ঘুষ গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে হারুনের বিরুদ্ধে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে এই অবৈধ সংযোগ বাণিজ্যের মাধ্যমে তিনি বিপুল অর্থ হাতিয়ে নিয়েছেন। কোন এলাকায় কতগুলো অবৈধ সংযোগ দেওয়া হয়েছে এবং এসব সংযোগের মাধ্যমে ওয়াসা কত টাকা রাজস্ব হারিয়েছে, তা তদন্ত করলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
তৃতীয়ত, ‘ডুপলি’ নিয়োগের মাধ্যমে বহিরাগত সিন্ডিকেট পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুযায়ী, নিজে দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন না করে সম্পূর্ণ বেআইনিভাবে নিজস্ব খরচে ব্যক্তিগত বেতনভুক্ত কয়েকজন বহিরাগত লোক দিয়ে ফিল্ড পর্যায়ের মিটার রিডিং ও বিলিংয়ের কাজ করাতেন তিনি। এর ফলে তার নিজস্ব দুর্নীতির সিন্ডিকেটটি পর্দার আড়ালে থেকে নির্বিঘ্নে সচল থাকত বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
আইনি জটিলতা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের চোখ এড়াতে হারুন অর রশিদ অত্যন্ত চতুরতার সঙ্গে তার অধিকাংশ সম্পদ নিজের নামে না রেখে স্ত্রী, সন্তান এবং অতি ঘনিষ্ঠ আত্মীয়-স্বজনদের নামে ক্রয় করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজধানী ঢাকায় তার একাধিক বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে। এর মধ্যে টিক্কাপাড়া, ৭/এ/১৫, মোহাম্মদপুর এলাকায় একটি বহুতল আধুনিক আবাসিক ভবন, ঢাকা উদ্যানের ৩ নম্বর রোডে চারতলা বিশিষ্ট একটি বিলাসবহুল ভবন, নূরজাহান রোড, মোহাম্মদপুরে দুইতলা বিশিষ্ট একটি বাণিজ্যিক ও আবাসিক বাড়ি এবং চান মিয়া হাউজিং, মোহাম্মদপুরে একটি বড় আবাসিক বাড়ি ও বিশাল জায়গা রয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
রাজধানীর পাশাপাশি ঢাকার বাইরেও তার বিপুল সম্পদের অভিযোগ রয়েছে। গাজীপুর ও ময়মনসিংহে তার একাধিক টিনশেড ও পাকা বাড়ি রয়েছে বলে দাবি করেছেন অভিযোগকারীরা। এছাড়া বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে কয়েক একর জায়গাজুড়ে বিশাল মুরগির খামার বা পোল্ট্রি ফার্ম গড়ে তোলার অভিযোগও রয়েছে। বিভিন্ন বাজার এলাকায় ক্ষমতার দাপটে অবৈধ দখলের মাধ্যমে বেশ কিছু দোকানপাট তৈরিরও অভিযোগ উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
ময়মনসিংহ জেলার পাগলা থানার মাখল গ্রামে হারুনের একটি প্রাসাদসম বিলাসবহুল বাড়ি রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের কাছে বাড়িটি দীর্ঘদিন ধরে কৌতূহলের বিষয় বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, একজন সাধারণ সরকারি কর্মচারীর বৈধ আয় দিয়ে এমন বিপুল সম্পদ অর্জন সম্ভব কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, রাজনৈতিক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে হারুন অর রশিদ কেবল দুর্নীতির টাকাই কামাননি, বরং নিজের এলাকায় এক প্রকার ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছিলেন। গ্রামের অসহায় ও দরিদ্র মানুষদের ভয়ভীতি দেখিয়ে এবং প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তিনি বহু জমি জবরদখল করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। তার এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে কোনো ভুক্তভোগী মুখ খুললেই প্রশাসনকে ব্যবহার করে বিভিন্ন মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি ও সামাজিকভাবে হেনস্তা করা হতো বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
হারুন ও তার পরিবারের সদস্যদের নামে দেশের বিভিন্ন তফসিলি ব্যাংক ও পোস্ট অফিসে কোটি কোটি টাকার স্থায়ী আমানত বা এফডিআর এবং সঞ্চয়পত্র রয়েছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া একজন তৃতীয় শ্রেণির কর্মচারী হওয়া সত্ত্বেও তার পরিবার ব্যবহার করছে একাধিক দামি গাড়ি এবং তাদের হেফাজতে রয়েছে প্রায় ১০০ ভরি স্বর্ণালঙ্কার—এমন অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, তার বৈধ বেতন কাঠামোর সঙ্গে এসব সম্পদ ও বিলাসবহুল জীবনযাপনের বড় ধরনের অসামঞ্জস্য রয়েছে।
হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে এর আগেও একাধিকবার সুনির্দিষ্ট দুর্নীতির অভিযোগ জমা পড়েছিল বলে দাবি করেছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে রহস্যজনকভাবে দেশের শীর্ষ দুর্নীতি বিরোধী সংস্থা দুর্নীতি দমন কমিশন বা দুদক বিগত সরকারের আমলে দুই দফায়, ২০১৬ এবং ২০২০ সালে তাকে ‘ক্লিন চিট’ বা দায়মুক্তি দেয় বলে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব এবং দুর্নীতির টাকার জোরে কীভাবে দুদক তাকে বারবার পার করে দিল, তা নিয়ে ওয়াসার সাধারণ কর্মচারী এবং তার নিজ এলাকার বাসিন্দাদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, তার বিরুদ্ধে যদি আগে থেকেই বিভিন্ন ধরনের দুর্নীতির অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে সেসব অভিযোগের প্রকৃত তদন্ত কতটা নিরপেক্ষভাবে করা হয়েছিল? ২০১৬ ও ২০২০ সালে কী ধরনের অভিযোগ উঠেছিল, কী কী নথি যাচাই করা হয়েছিল এবং কোন প্রক্রিয়ায় তাকে দায়মুক্তি দেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় পুনরায় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।
বিগত সরকারের আমলে যারা এভাবে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটে কোটিপতি হয়েছেন, বর্তমান বৈষম্যবিরোধী ও দুর্নীতিবিরোধী সরকারের সময়ে তাদের আর পার পাওয়ার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন অভিযোগকারীরা। তারা এই অনিয়মকারী কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক দোসরকে অবিলম্বে আইনের আওতায় এনে তার অবৈধভাবে অর্জিত সমস্ত সম্পদ সরকারি কোষাগারে বাজেয়াপ্ত করার জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে দুর্নীতির অভিযোগের সত্যতা যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিও উঠেছে।
অভিযোগকারীদের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে, দুর্নীতিগ্রস্ত এই রাজস্ব পরিদর্শককে দ্রুত চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার বা বাধ্যতামূলক অবসর দিয়ে ওয়াসাকে কলঙ্কমুক্ত করা। পাশাপাশি হারুন অর রশিদের আয়ের প্রকৃত উৎস খতিয়ে দেখতে অবিলম্বে একটি উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ বিচার বিভাগীয় বা বিশেষ তদন্ত কমিটি গঠনেরও দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া নিজেকে বাঁচাতে তার রাজনৈতিক পরিচয় পরিবর্তনের চতুরতা রুখে দিয়ে তার এবং তার পরিবারের সদস্যদের নামে-বেনামে থাকা জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সমস্ত সম্পদের হিসাব প্রকাশের দাবি জানানো হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, এসব সম্পদের বৈধতা যাচাই করে অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদ আইন অনুযায়ী রাষ্ট্রীয় কোষাগারে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।
বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে হারুনের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রকাশের পরও কেন তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, এর পেছনে ওয়াসার কোন কোন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জড়িত এবং অতীতে তাকে দুই দফায় রহস্যজনকভাবে দায়মুক্তি দেওয়ার পেছনে কোনো লবিং বা প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির প্রভাব ছিল কি না, তাও খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন সাধারণ মিটার রিডার থেকে রাজস্ব পরিদর্শক হয়ে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক বনে যাওয়ার এই উত্থান শুধু একজন ব্যক্তির কথিত দুর্নীতির ঘটনা নয়, বরং এটি একটি বড় ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক দুর্নীতির চিত্রও তুলে ধরতে পারে। যদি অভিযোগগুলো সত্য হয়ে থাকে, তাহলে দীর্ঘদিন ধরে ওয়াসার অভ্যন্তরে কীভাবে এসব অনিয়ম চলেছে এবং কারা তাকে সহযোগিতা করেছে, তা তদন্তের মাধ্যমে বের করা জরুরি।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হারুন অর রশিদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে তার সম্পদের হিসাব, আয়কর নথি, ব্যাংক হিসাব, জমি ও বাড়ির দলিল, গাড়ির মালিকানা, ওয়াসার মিটার রিডিং ও বিলিং সংক্রান্ত নথি এবং পূর্বের তদন্ত প্রতিবেদন যাচাই করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঢাকা ওয়াসা ও দুর্নীতি দমন কমিশনের বক্তব্যও গুরুত্বপূর্ণ।
অভিযোগকারীরা বলছেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে বর্তমান সরকারের ঘোষিত কঠোর অবস্থানের বাস্তব প্রতিফলন ঘটাতে হলে হারুন অর রশিদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দ্রুত ও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা এবং অবৈধ সম্পদ জব্দের দাবি জানিয়েছেন তারা। অন্যদিকে অভিযোগগুলো ভিত্তিহীন হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়া জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় নয়, তার বৈধ আয় ও সম্পদের প্রকৃত হিসাবই হওয়া উচিত তদন্তের মূল ভিত্তি। তাই একজন সাধারণ মিটার রিডার কীভাবে বিপুল সম্পদের মালিক হলেন, তার সম্পদের উৎস কী, ওয়াসার রাজস্বে কোনো ক্ষতি হয়েছে কি না এবং তার সঙ্গে কোনো কর্মকর্তা বা প্রভাবশালী মহলের যোগসূত্র ছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর বের করতে একটি পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এখন সময়ের দাবি।