ঢাকা ওয়াসা ও ড্রিঙ্কওয়েলের চুক্তি নবায়ন ঘিরে প্রশ্ন, ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

স্বচ্ছতা ও উন্মুক্ত দরপত্রের (ওটিএম) নিয়ম অনুসরণ না করে ঢাকা ওয়াসার ‘ওয়াটার এটিএম’ বুথ পরিচালনায় পুনরায় বিতর্কিত মার্কিনভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ড্রিঙ্কওয়েল (উইস্ট বাংলাদেশ লিমিটেড)-এর সঙ্গে চুক্তি নবায়নের তোড়জোড় চলছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত প্রায় ৯ বছর ধরে কোনো উল্লেখযোগ্য মূলধন বিনিয়োগ ছাড়াই ঢাকা ওয়াসার অবকাঠামো ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটি ব্যবসা পরিচালনা করছে এবং বিক্রিত পানির অর্থের বড় অংশ নিয়ে যাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি, প্রকল্পের শুরু থেকে ঢাকা ওয়াসার বিনিয়োগ, অবকাঠামো ব্যবহারের সুযোগ এবং রাজস্ব কাঠামো বিবেচনায় নিলে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে বিদ্যমান চুক্তির কারণে সংস্থাটির আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৩০০ কোটি টাকা। যদিও এই ক্ষতির হিসাব ও অভিযোগের বিষয়ে ঢাকা ওয়াসা ও ড্রিঙ্কওয়েলের সংশ্লিষ্ট পক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

বিনা পুঁজিতে ব্যবসার অভিযোগ

নগরবাসীকে স্বল্পমূল্যে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে ঢাকা ওয়াসা ও ড্রিঙ্কওয়েলের মধ্যে পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) মডেলে ‘ওয়াটার এটিএম’ প্রকল্প চালু করা হয়। প্রকল্পের আওতায় নগরীর বিভিন্ন এলাকায় ওয়াটার এটিএম বুথ স্থাপন করা হয়।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের চুক্তি সম্পাদনের ক্ষেত্রে সরকারি ক্রয়বিধি ও সংশ্লিষ্ট আইন যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। উন্মুক্ত দরপত্রের পরিবর্তে বিশেষ প্রক্রিয়ায় প্রতিষ্ঠানটিকে কাজ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। ফলে শুরু থেকেই প্রকল্পটির স্বচ্ছতা ও আর্থিক কাঠামো নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

প্রকল্প সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, ২৯৪টি বুথের সিভিল অবকাঠামো নির্মাণে ঢাকা ওয়াসা প্রায় ১৫০ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। অন্যদিকে ড্রিঙ্কওয়েলকে বড় ধরনের মূলধন বিনিয়োগ করতে হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। ফলে অবকাঠামো নির্মাণের পুরো আর্থিক দায় ওয়াসার ওপর থাকলেও পানি বিক্রির আয় থেকে ড্রিঙ্কওয়েল উল্লেখযোগ্য অংশ পেয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।

এ ছাড়া ঢাকা ওয়াসা ভবনে ড্রিঙ্কওয়েলের অফিস ব্যবহারের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বাজারদরের তুলনায় বিনামূল্যে বা কম খরচে অফিস সুবিধা ব্যবহারের কারণে গত ৯ বছরে ওয়াসা প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়েছে।

সব মিলিয়ে অবকাঠামোগত ব্যয়, অফিস সুবিধা থেকে সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতি এবং প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো বিবেচনায় নিয়ে সংশ্লিষ্টরা প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ক্ষতির অভিযোগ তুলেছেন। তবে এই হিসাবের স্বাধীন যাচাই প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পের রাজস্ব নিয়েও প্রশ্ন

ঢাকা ওয়াসার অভ্যন্তরীণ একটি প্রতিবেদনে প্রকল্পটি প্রত্যাশিত লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী রাজস্ব আদায় করতে পারেনি বলে উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে পরিচালিত হলেও প্রকল্পটি কাঙ্ক্ষিত আর্থিক সুফল দিতে না পারায় এর বর্তমান কাঠামো নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগকারীদের প্রশ্ন, সরকারি অর্থে অবকাঠামো তৈরি করে একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে দীর্ঘ সময় ধরে তা ব্যবহার করার সুযোগ দেওয়া হলে রাষ্ট্র বা ঢাকা ওয়াসা প্রকৃত অর্থে কতটা লাভবান হয়েছে—তা স্বচ্ছভাবে প্রকাশ করা প্রয়োজন।

রাজনৈতিক যোগাযোগের অভিযোগ

ড্রিঙ্কওয়েলের ব্যবসায়িক কার্যক্রমের সঙ্গে তৎকালীন ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক মহলের ঘনিষ্ঠতার অভিযোগও রয়েছে। অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটির কো-ফাউন্ডার ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মিনহাজ চৌধুরী, যিনি আমেরিকান ও দ্বৈত নাগরিক হিসেবে পরিচিত, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয় এবং ঢাকা ওয়াসার সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) তাকসিম এ. খানের ছেলের ঘনিষ্ঠ ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ ছাড়া ড্রিঙ্কওয়েলের পরিচালক ইমতিয়াজ মোহাম্মদ মোহসিনের আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগও করা হয়েছে।

অভিযোগ রয়েছে, সাবেক এমডি তাকসিম এ. খানও পরোক্ষভাবে এই ব্যবসায়িক ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্ভরযোগ্য নথিপত্র বা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য এই প্রতিবেদকের হাতে পাওয়া যায়নি।

রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ

২০২৪ সালের আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর চুক্তি ও ক্রয়প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়। ঢাকা ওয়াসার নতুন চুক্তির ক্ষেত্রেও উন্মুক্ত ও প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র অনুসরণের নীতিগত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তবে সেই সিদ্ধান্তের পরও ড্রিঙ্কওয়েলের সঙ্গে নতুন করে পাঁচ বছরের জন্য চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

প্রস্তাবিত নতুন মডেল নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একটি অংশ। তাঁদের অভিযোগ, নতুন বুথ নির্মাণের শতভাগ ব্যয়ও ঢাকা ওয়াসাকে বহন করতে হবে। অর্থাৎ অবকাঠামো নির্মাণে রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যয় হলেও ড্রিঙ্কওয়েল আগের মতোই মূলধন বিনিয়োগ ছাড়াই বুথ পরিচালনা করে মুনাফা করার সুযোগ পাবে।

এতে সরকারি প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ঝুঁকি বাড়বে এবং বেসরকারি প্রতিষ্ঠানটি তুলনামূলকভাবে ঝুঁকিমুক্ত ব্যবসার সুযোগ পাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

কর্মচারীদের বেতন-বোনাস নিয়েও অভিযোগ

অন্যদিকে, ড্রিঙ্কওয়েলের কর্মচারীদের নিয়মিত বেতন-বোনাস পরিশোধ না করার অভিযোগও পাওয়া গেছে। পাওনা পরিশোধের দাবিতে ঈদের আগে প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারীরা ঢাকা ওয়াসা ভবনের সামনে মানববন্ধন কর্মসূচি পালন করেছেন বলেও জানা গেছে।

কর্মচারীদের বেতন-বোনাস পরিশোধে অনিয়মের অভিযোগ সত্য হলে একটি সরকারি অবকাঠামো ব্যবহার করে পরিচালিত প্রকল্পে শ্রমিকদের অধিকার ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়েও প্রশ্ন ওঠে।

ওয়াসার অভ্যন্তরে মতবিরোধ

দরপত্র ছাড়া একই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন করে চুক্তি নবায়নের উদ্যোগকে কেন্দ্র করে ঢাকা ওয়াসার অভ্যন্তরে মতবিরোধ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ। কর্মকর্তাদের একটি অংশ উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়ায় নতুন করে প্রতিষ্ঠান নির্বাচন করার পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওয়াসার এক কর্মকর্তা বলেন, “প্রকল্পটি শুরু থেকেই একটি বিশেষ সুরক্ষার বলয়ের মধ্যে ছিল। নিয়ম-কানুন না মেনে নির্দিষ্ট একটি পক্ষকে সুবিধা দেওয়াই ছিল মূল উদ্দেশ্য।”

তবে ওই কর্মকর্তার বক্তব্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

জবাব মেলেনি ড্রিঙ্কওয়েল কর্তৃপক্ষের

ড্রিঙ্কওয়েলের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ, চুক্তি নবায়নের উদ্যোগ, প্রকল্পের আর্থিক কাঠামো, ওয়াসার অবকাঠামো ব্যবহারের সুবিধা এবং কর্মচারীদের বেতন-বোনাস সংক্রান্ত বিষয়ে বক্তব্য জানতে প্রতিষ্ঠানটির সিইও মিনহাজ চৌধুরীর ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তবে নম্বরটি বন্ধ পাওয়া যায়।

ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্যও তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি।

সংশ্লিষ্টদের মতে, প্রকল্পটি নিয়ে ওঠা অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে স্বাধীন অডিট, চুক্তির সব নথি প্রকাশ এবং গত ৯ বছরের আয়-ব্যয়ের পূর্ণাঙ্গ হিসাব পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নতুন করে চুক্তি নবায়নের আগে উন্মুক্ত দরপত্রের মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক প্রক্রিয়া নিশ্চিত করা হলে প্রকল্পের আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়বে বলে মনে করছেন তাঁরা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *