আন্তর্জাতিক ডেস্ক:
ভারতের সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতির একটি মন্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনায় এসেছে নতুন একটি ব্যঙ্গাত্মক রাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম—‘মাছি জনতা পার্টি’ (এমজেপি)। এর আগে বিচারপতির মন্তব্যের সূত্র ধরে আলোচনায় এসেছিল ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) বা তেলাপোকা দল।
প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের ‘মাছি মারতে হাতুড়ি চালানো’ মন্তব্য থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে অনলাইনে আত্মপ্রকাশ করেছে এমজেপি। দলটি মাছিকে প্রতীক হিসেবে বেছে নিয়েছে। নাগরিক অধিকার, গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ এবং কর্তৃপক্ষের কাছে জবাবদিহি চাওয়ার বিষয়গুলোকে সামনে রেখে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজেদের পরিচিতি গড়ে তুলছে সংগঠনটি।
ইনস্টাগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, আরিয়ান নামের এক শিক্ষার্থী দলটির প্রতিষ্ঠাতা। সংগঠনটিকে তরুণদের দ্বারা পরিচালিত, তরুণদের জন্য একটি অরাজনৈতিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। বর্তমানে তারা মুখপাত্র খুঁজছে বলেও জানানো হয়েছে। এমজেপি স্পষ্ট করেছে, কোনো মূলধারার রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তাদের সম্পর্ক নেই।
মাছি জনতা পার্টি কী?
এমজেপি মূলত অনলাইনভিত্তিক একটি ব্যঙ্গাত্মক সংগঠন। এর ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে (@makhijantaparty.ig) তরুণদের একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে নিজেদের তুলে ধরা হয়েছে, যার ঘোষিত লক্ষ্য গণতন্ত্র রক্ষা করা।
ইনস্টাগ্রামের তথ্য অনুযায়ী, অ্যাকাউন্টটি ২০২১ সালের জুনে খোলা হয়েছিল। বর্তমান পরিচিতি পাওয়ার আগে আটবার নাম বা ব্যবহারকারীর নাম পরিবর্তন করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাশাপাশি সংগঠনটির একটি ওয়েবসাইটও রয়েছে। সেখানে অর্থনীতি, উদ্যোক্তা তৈরি এবং কর্মসংস্থানের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অভিযোগনির্ভর রাজনীতির পরিবর্তে বিনিয়োগ, ব্যবসার সম্প্রসারণ, ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির ওপর জোর দেওয়ার কথা বলেছে এমজেপি।
ওয়েবসাইটে সিজেপি ও এমজেপির মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে বলা হয়েছে, সিজেপি যেখানে অভিযোগ ও প্রতিবাদের বিষয়টি সামনে আনে, সেখানে এমজেপি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও উৎপাদনশীলতার ওপর গুরুত্ব দিতে চায়।
প্রধান বিচারপতির মন্তব্য থেকে অনুপ্রেরণা
গত ৯ অক্টোবর প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্তের নেতৃত্বাধীন ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একটি বেঞ্চের পর্যবেক্ষণের পর এমজেপির নামটি আলোচনায় আসে।
১০ অক্টোবর সিজেপির ডাকা একটি প্রতিবাদ কর্মসূচির আগে দিল্লির মেট্রোসহ গণপরিবহনে বিধিনিষেধ আরোপের বিষয়টি নিয়ে শুনানি হয়। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম নিউজ১৮-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, শুনানিতে আদালত প্রশ্ন তোলে, নিরাপত্তার অজুহাতে সবকিছু বন্ধ করে দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা কতটা।
আদালত পর্যবেক্ষণ করে, পুরো ব্যবস্থা অচল না করেও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব। এ সময় ‘মাছি মারতে হাতুড়ি’ ব্যবহারের উপমা তুলে ধরা হয়। এমজেপি এই মন্তব্যকে নিজেদের পরিচিতি তৈরির উপাদান হিসেবে ব্যবহার করে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনটি লেখে, প্রধান বিচারপতি যখন বলেছেন মাছি মারতে হাতুড়ি ব্যবহার করা যায় না, তখন মাছিও বলতে পারে—তারাও কারও চেয়ে কম নয়।
এর আগে প্রধান বিচারপতির আরেকটি মন্তব্যের পর ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ অনলাইনে আলোচনায় আসে। পরবর্তী সময়ে সংগঠনটি জবাবদিহি ও প্রতিবাদসংক্রান্ত কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সিজেপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা
এমজেপি ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এবং নিখিল ভারত ছাত্র সংঘের (এআইএসএ) জাতীয় সভাপতি নেহা বোরার প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছে। প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে আসা নেহা বোরার সাহস ও দৃঢ়তার প্রশংসা করেছে সংগঠনটি।
এমজেপির ভাষ্য, ক্ষমতাসীনদের প্রশ্ন করা এবং তাঁদের কাছে জবাবদিহি চাওয়া গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে সাম্প্রতিক কিছু বিক্ষোভ প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক অনুমতি ছাড়া হয়েছে বলেও তারা স্বীকার করেছে। একই সঙ্গে আইনের সীমার মধ্যে থেকে দায়িত্বশীলভাবে প্রতিবাদের অধিকার চর্চার আহ্বান জানিয়েছে।
দুই সংগঠনের সম্মতির ভিত্তিতে অভিন্ন অবস্থান বা যৌথ কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার জন্য সিজেপির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছে এমজেপি।
গত ১৩ অক্টোবর প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি আরিয়ানের স্বাক্ষরিত এক বিবৃতিতে সিজেপির প্রতি সমর্থন জানানো হয়। যন্তর মন্তরে প্রবেশ করে সিজেপির নেতা আশুতোষ রাঙ্কা ও সৌরভ দাস ভারতীয় পতাকা উত্তোলনের পর তাঁদের আটকের ঘটনার সমালোচনা করা হয় ওই বিবৃতিতে।
বিবৃতিতে বলা হয়, প্রতিবাদকে মানুষের দৃষ্টির আড়ালে সীমাবদ্ধ রাখলে তার প্রভাব কমে যায়। সেখানে আরও বলা হয়, গণতন্ত্রের জন্য সংলাপ প্রয়োজন, দূরত্ব নয়।
ব্যঙ্গের বাইরে অর্থনীতি ও কর্মসংস্থানে গুরুত্ব
সিজেপি যেখানে মূলত রাজপথের আন্দোলন ও জবাবদিহি আদায়ের বিষয়টি সামনে আনে, সেখানে এমজেপি নিজেদের ওয়েবসাইটে অর্থনৈতিক কার্যক্রম ও উদ্যোক্তা তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছে।
মানুষকে ব্যবসা শুরু করতে উৎসাহিত করা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ব্যবহারিক দক্ষতা বৃদ্ধি এবং স্থানীয় ব্যবসার প্রসারে সহায়তা করাকে সংগঠনটির ঘোষিত লক্ষ্য হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবাদভিত্তিক রাজনীতির পাশাপাশি বিনিয়োগ, উৎপাদনশীলতা ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের বিষয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেছে সংগঠনটি।
ব্যঙ্গাত্মক পরিচিতির পাশাপাশি অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে সামনে রেখে নিজেদের আলাদা অবস্থান তৈরির চেষ্টা করছে এমজেপি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও সংগঠনটি নিয়ে ইতিবাচক মন্তব্য দেখা যাচ্ছে। কয়েকজন ব্যবহারকারী তাদের নাম ও উদ্যোগের প্রশংসা করে সমর্থন জানিয়েছেন।