কামরুল ইসলাম:
কক্সবাজারের টেকনাফ–কক্সবাজার মহাসড়কে দিনদুপুরে সিনেমার দৃশ্যকেও হার মানানো এক দুঃসাহসিক ডাকাতির ঘটনা ঘটেছে। সড়কে গাছ ফেলে ব্যারিকেড সৃষ্টি করে যাত্রীবাহী বাস থামিয়ে বিকাশের এক সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভকে ছুরিকাঘাত এবং অপরজনকে অস্ত্রের মুখে জিম্মি করে ৫৭ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে গেছে সংঘবদ্ধ ডাকাতচক্র। এ ঘটনায় একজন গুরুতর আহত হয়েছেন এবং আরেকজন মারধরের শিকার হয়েছেন।
রোববার (২ আগস্ট) দুপুর প্রায় ২টার দিকে টেকনাফ স্থলবন্দরসংলগ্ন ১৪ নম্বর সেতু (দমদমিয়া ব্রিজ) এলাকায় এ ডাকাতির ঘটনা ঘটে। আহত বিকাশ প্রতিনিধি মো. আল আরমান (২৬) টেকনাফ পৌরসভার জালিয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাকে প্রথমে টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলেও অবস্থার অবনতি হলে বিকেলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়। অপর আহত প্রতিনিধি একরাম হোসেনকে টেকনাফ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
প্রত্যক্ষদর্শী বাসযাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজারগামী পালকি পরিবহনের একটি বাসে প্রায় ৩০ জন যাত্রী ছিলেন। বাসটি দমদমিয়া ব্রিজ এলাকায় পৌঁছালে ১৫ থেকে ২০ জনের একটি সশস্ত্র ডাকাত দল আগে থেকেই সড়কে গাছ ফেলে ব্যারিকেড তৈরি করে অপেক্ষা করছিল। ডাকাতরা কয়েক রাউন্ড ফাঁকা গুলি ছুড়ে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং বাসটি থামাতে বাধ্য করে।
এরপর পাঁচ থেকে ছয়জন মুখোশধারী ডাকাত বাসে উঠে সরাসরি বিকাশের দুই সেলস রিপ্রেজেন্টেটিভকে খুঁজতে থাকে। তাদের শনাক্ত করার পর মো. আল আরমানকে এলোপাতাড়ি ছুরিকাঘাত করা হয়। একই সঙ্গে অপর প্রতিনিধি একরাম হোসেনের মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে তাকে মারধর করা হয়। পরে তাদের কাছে থাকা টাকার দুটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে দ্রুত ঘটনাস্থল ত্যাগ করে ডাকাতরা।
জানা গেছে, আল আরমানের কাছে ২২ লাখ টাকা এবং একরাম হোসেনের কাছে ৩৫ লাখ টাকা ছিল। মোট ৫৭ লাখ টাকা লুট করে নিয়ে যায় ডাকাতরা। ডাকাতরা চলে যাওয়ার পর বাসটি কিছু দূরে অবস্থিত দমদমিয়া বিজিবি চেকপোস্টে গিয়ে বিষয়টি জানায়। খবর পেয়ে বিজিবি, পুলিশ ও কোস্টগার্ড সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে অভিযান শুরু করেন।
বাসচালক ফয়েজুল করিম জানান, ডাকাতরা শুধু গাছ ফেলে রাস্তা অবরোধ করেনি, গাছের গুঁড়িতে লম্বা লোহার পেরেকও লাগিয়ে রেখেছিল, যাতে কোনোভাবেই বাসটি এগিয়ে যেতে না পারে। এছাড়া কয়েকজন মুখোশধারী যুবক বাসের সামনে আগ্নেয়াস্ত্র তাক করে রাখায় যাত্রী ও চালক কেউই কোনো প্রতিরোধের সাহস পাননি।
টেকনাফের বিকাশ এজেন্ট ও ব্যবসায়ী আবদুল করিম জানান, রোববার সকালে তিনি টেকনাফের সীমান্ত ব্যাংক থেকে গ্রাহকদের লেনদেনের জন্য ১ কোটি ৪০ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। এর মধ্যে ৫৭ লাখ টাকা বিকাশের দুই প্রতিনিধির মাধ্যমে হ্নীলা, লেদা ও হোয়াইক্যং এলাকার বিভিন্ন গ্রাহকের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু পথিমধ্যেই সংঘবদ্ধ ডাকাতরা সেই টাকা লুট করে নেয়।
তিনি আরও বলেন, “এটি পরিকল্পিত হামলা। ডাকাতরা আগে থেকেই জানত বাসে বিকাশের টাকা বহন করা হচ্ছে। তারা সরাসরি আমাদের প্রতিনিধিদের লক্ষ্য করে হামলা চালিয়েছে।”
ঘটনার পর পুরো টেকনাফ এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। দিনদুপুরে ব্যস্ততম সড়কে এমন দুঃসাহসিক ডাকাতির ঘটনায় স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহন শ্রমিক ও সাধারণ মানুষের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে। তারা অবিলম্বে জড়িতদের গ্রেপ্তার, লুট হওয়া টাকা উদ্ধার এবং মহাসড়কে নিরাপত্তা জোরদারের দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে টেকনাফ মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম বলেন, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। সংশ্লিষ্ট বাসটি জব্দ করা হয়েছে এবং ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে। ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে পুলিশ, বিজিবি এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যৌথভাবে অভিযান চালাচ্ছে। একই সঙ্গে লুট হওয়া অর্থ উদ্ধারের সর্বোচ্চ চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে টেকনাফ–কক্সবাজার সড়কে ছিনতাই ও ডাকাতির ঘটনা বৃদ্ধি পেলেও কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি। তাদের দাবি, এই মহাসড়কে নিয়মিত টহল, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় স্থায়ী নিরাপত্তা চৌকি এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।