মোঃ মনির হোসেন:
দীর্ঘ আট বছর ধরে প্রশাসনিক জটিলতা, ভূমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং নানা দাপ্তরিক বাধার কারণে থমকে থাকা চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ স্থাপন প্রকল্পে অবশেষে দৃশ্যমান অগ্রগতি শুরু হয়েছে। প্রকল্প এলাকায় সাইনবোর্ড স্থাপন এবং অবকাঠামো উন্নয়ন কাজের প্রথম ধাপ উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে বহু প্রতীক্ষিত এই স্বাস্থ্য ও শিক্ষা প্রকল্প বাস্তবায়নের নতুন অধ্যায়ের সূচনা হয়েছে।
রোববার (১২ জুলাই) সকালে চাঁদপুর সদর উপজেলার বাগাদী ইউনিয়নের ইসলামপুর গাছতলা এলাকায় আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের উদ্বোধন করেন চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। অনুষ্ঠানে স্থানীয় প্রশাসন, স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তা, জনপ্রতিনিধি, চিকিৎসক ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ উপস্থিত ছিলেন।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক বলেন, নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই তিনি চাঁদপুরে একটি আধুনিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ প্রতিষ্ঠার বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করে আসছেন। তিনি জানান, প্রকল্পটির অগ্রগতি নিশ্চিত করতে সরকারের উচ্চপর্যায়ে একাধিকবার আলোচনা করা হয়েছে এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়ার সরকারি নীতির অংশ হিসেবে প্রকল্পটি দ্রুত অনুমোদনের পথ সুগম হয়েছে।
তিনি বলেন, “চাঁদপুরবাসীর দীর্ঘদিনের স্বপ্ন ছিল একটি পূর্ণাঙ্গ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে আমরা এখন অনেক দূর এগিয়েছি। প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শুধু চাঁদপুর নয়, আশপাশের জেলাগুলোর মানুষও উন্নত চিকিৎসাসেবা পাবেন। এতে রাজধানী ঢাকার হাসপাতালগুলোর ওপর রোগীর চাপও উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।”
জমি অধিগ্রহণ নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগ দূর করতে সংসদ সদস্য বলেন, প্রকল্পের জন্য যাদের জমি অধিগ্রহণ করা হবে তারা সরকারি আইন অনুযায়ী শতভাগ ন্যায্য ক্ষতিপূরণ পাবেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান, ক্ষতিপূরণ পেতে কোনো দালাল বা মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন নেই। কেউ বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করলে কিংবা কোনো ধরনের জটিলতা সৃষ্টি হলে সরাসরি জেলা প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ করার আহ্বান জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন প্রকল্প পরিচালক ও চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের উপাধ্যক্ষ ডা. মো. হারুন-অর-রশিদ। তিনি জানান, ইসলামপুর গাছতলা মৌজায় প্রায় ৩০ দশমিক ২ একর জমি অধিগ্রহণের প্রক্রিয়া বর্তমানে চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। প্রয়োজনীয় দাপ্তরিক কার্যক্রম অনেক দূর এগিয়েছে এবং বর্তমানে জমির মালিকদের কাগজপত্র যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে।
তিনি বলেন, “সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী তিন মাসের মধ্যেই জমির মালিকদের ক্ষতিপূরণের অর্থ বিতরণ শুরু করা সম্ভব হবে। ক্ষতিপূরণ কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে হাসপাতাল ভবন, মেডিকেল কলেজ, নার্সিং কলেজ, ছাত্র-ছাত্রীদের আবাসন, প্রশাসনিক ভবনসহ প্রয়োজনীয় সব অবকাঠামো নির্মাণকাজ শুরু হবে।”
সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে আটকে থাকা এ প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে চাঁদপুরের স্বাস্থ্যসেবায় এক নতুন দিগন্তের সূচনা হবে। বর্তমানে জটিল রোগের চিকিৎসার জন্য জেলার মানুষকে ঢাকা, কুমিল্লা কিংবা অন্য বড় শহরের হাসপাতালের ওপর নির্ভর করতে হয়। আধুনিক চিকিৎসা সুবিধাসম্পন্ন এই মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল চালু হলে স্থানীয় পর্যায়েই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা, উন্নত পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
একই সঙ্গে নার্সিং কলেজ চালু হলে দক্ষ নার্স তৈরির সুযোগ সৃষ্টি হবে এবং স্থানীয় শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার নতুন ক্ষেত্র উন্মুক্ত হবে। ফলে স্বাস্থ্যখাতের জনবল সংকট নিরসনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে এই প্রতিষ্ঠান।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক একেএম সলিম উল্যা সেলিম, চাঁদপুর মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. সাহেলা নাজনীন, সিভিল সার্জন ডা. মোহাম্মদ নুর আলম দ্বীন, ড্যাব চাঁদপুর জেলা সভাপতি ডা. মোবারক হোসেন চৌধুরী, চাঁদপুর সরকারি জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. একেএম মাহবুবুর রহমান, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী নাসিম আহমেদ টিটো, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এসএমএন জামিউল হিকমা এবং চাঁদপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি সোহেল রুশদী।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ড্যাব চাঁদপুর জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক ডা. সৈয়দ আহমেদ কাজল।
দীর্ঘ আট বছরের অপেক্ষার পর প্রকল্পটির দৃশ্যমান অগ্রগতি চাঁদপুরবাসীর মধ্যে নতুন আশার সঞ্চার করেছে। এখন দ্রুত ভূমি অধিগ্রহণ, ক্ষতিপূরণ বিতরণ এবং নির্মাণকাজ শুরু হলে বহুদিনের প্রত্যাশিত চাঁদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও নার্সিং কলেজ বাস্তবে রূপ নেবে বলে সংশ্লিষ্টদের আশা।