নিজস্ব প্রতিবেদক:
দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোর দিনেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দামে বড় ধরনের পতন হয়েছে। সোমবার (২১ সেপ্টেম্বর) থেকে বাংলাদেশে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়ানো হয়েছে। একই দিনে বিশ্ববাজারে ব্রেন্ট ও ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম কমে এক সপ্তাহেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছে।
জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের পুনর্নির্ধারিত দামের তালিকা অনুযায়ী, নতুন দামে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৬০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে ডিজেল ছিল ১১৫ টাকা, কেরোসিন ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা এবং পেট্রোল ১৪০ টাকা। অর্থাৎ প্রতিটি পেট্রোলিয়াম পণ্যের দামই এক ধাপে ২০ টাকা করে বেড়েছে। নতুন দাম ২১ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা থেকে কার্যকর হয়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও পরিবহন বা ফ্রেইট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য সমন্বয় করা হয়েছে।
জ্বালানি তেলের দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজারের মূল্য, আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়সহ বিভিন্ন বিষয় বিবেচনায় নেওয়া হয়। সরকারের নতুন সিদ্ধান্তের ফলে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) যে আর্থিক চাপের মধ্যে রয়েছে, তা কমানোর লক্ষ্যও রয়েছে বলে সরকারি ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে।
বাংলাদেশে নতুন দাম কার্যকর হওয়ার দিনেই আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম কমেছে। সোমবার সকালে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ২ দশমিক ১৬ ডলার বা ২ দশমিক ০৮ শতাংশ কমে ১০১ দশমিক ৭১ ডলারে নেমে আসে। একই সময়ে ডব্লিউটিআইয়ের দাম কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ দশমিক ১৫ ডলারে দাঁড়ায়।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ব্রেন্টের দাম ১০ সেপ্টেম্বরের পর সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমেছিল। বাজারে দাম কমার পেছনে ইরান যুদ্ধ ঘিরে কূটনৈতিক অগ্রগতির সম্ভাবনা এবং সৌদি আরবের তেল রপ্তানি আংশিকভাবে পুনরুদ্ধারের বিষয়টি প্রভাব ফেলেছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা কমাতে কূটনৈতিক উদ্যোগের সম্ভাবনা তৈরি হওয়ায় বাজারে সরবরাহ নিয়ে আশঙ্কা কিছুটা কমেছে। একই সঙ্গে সৌদি আরবের তেল সরবরাহ ও রপ্তানি পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি বাজারে স্বস্তি তৈরি করেছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে যে ঝুঁকি-প্রিমিয়াম তেলের দামে যুক্ত হয়েছিল, তার একটি অংশ কমে এসেছে।
ফলে ২১ সেপ্টেম্বরের বাজারচিত্রে বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামের ক্ষেত্রে বিপরীতমুখী পরিস্থিতি দেখা গেছে। দেশের ভোক্তারা যেখানে নতুন করে বাড়তি দামে জ্বালানি কিনছেন, একই সময়ে আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম নিম্নমুখী হয়েছে।
তবে আন্তর্জাতিক বাজারে এক দিনের দরপতন মানেই বাংলাদেশের বাজারে তাৎক্ষণিকভাবে জ্বালানি তেলের দাম কমে যাবে—এমন সরাসরি সম্পর্ক নেই। কারণ আমদানি ব্যয়, পরিবহন ব্যয়, মুদ্রার বিনিময় হার, কর-শুল্ক এবং মূল্য নির্ধারণের কাঠামোসহ বিভিন্ন বিষয় স্থানীয় বাজারের দামে প্রভাব ফেলে।
জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচের ওপরও প্রভাব পড়তে পারে। বিশেষ করে ডিজেলের দাম বাড়ায় পণ্যবাহী যানবাহন, গণপরিবহন ও বিভিন্ন পরিবহনসেবার ব্যয় বাড়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব ধীরে ধীরে পণ্য পরিবহন ব্যয় এবং বিভিন্ন সেবা খাতেও পড়তে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে।
ডিজেলের নতুন দাম প্রতি লিটারে ১৩৫ টাকা হওয়ায় আগের তুলনায় ভোক্তাদের প্রতি লিটারে ২০ টাকা বেশি ব্যয় করতে হবে। একইভাবে পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন ব্যবহারকারীদেরও সমপরিমাণ বাড়তি অর্থ গুনতে হবে।
সরকারের নতুন মূল্যতালিকা অনুযায়ী, ডিজেল ১৩৫ টাকা, কেরোসিন ১৫৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৬৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
অন্যদিকে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম পরবর্তী সময়ে কোন দিকে যায়, সেটি নির্ভর করবে মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, সরবরাহ পরিস্থিতি, সৌদি আরবের রপ্তানি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান কূটনৈতিক তৎপরতার অগ্রগতির ওপর। সোমবারের দরপতন আপাতত বাজারে সরবরাহ নিয়ে উদ্বেগ কিছুটা কমার ইঙ্গিত দিলেও পরিস্থিতি দ্রুত পরিবর্তিত হতে পারে।