নিজস্ব প্রতিবেদক::
পরিদর্শককে ‘ম্যানেজ’ করে নির্মাণকাজ চালানোর অভিযোগ, রাজউক বলছে—‘বিষয়টি দেখছি’
রাজধানীর পুরান ঢাকার ব্যস্ততম এলাকা নয়াবাজারের জিন্দাবাদ এলাকায় রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণবিধি যথাযথভাবে অনুসরণ না করে একটি বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। ভবনটির নির্মাণকাজ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একই সঙ্গে রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তদারকি নিয়েও উঠেছে প্রশ্ন।অভিযোগের সূত্র ধরে সরেজমিনে জানা যায়, রাজধানীর নয়াবাজার থেকে বাবুবাজার ব্রিজের দিকে যাওয়ার পথে হাতের বাম পাশে ৩০ জিন্দাবাদ প্রথম লেন, চৌধুরী মার্কেট, নয়াবাজার, ঢাকা-১০০০ এলাকায় ভবনটির নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকের অনুমোদন, নকশা এবং প্রযোজ্য নির্মাণবিধি যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, তা নিয়ে তাদের মধ্যে সন্দেহ রয়েছে।স্থানীয় বাসিন্দাদের কয়েকজনের দাবি, ঘনবসতিপূর্ণ এই এলাকায় একটি বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে রাজউকের নিয়মিত তদারকি ও পরিদর্শন থাকার কথা। কিন্তু ভবনটির নির্মাণকাজ চললেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর নজরদারি চোখে পড়ছে না বলে অভিযোগ তাদের।স্থানীয়দের মধ্যে আরও অভিযোগ রয়েছে, রাজউকের সংশ্লিষ্ট এক পরিদর্শককে ‘ম্যানেজ’ করেই ভবনটির নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে। তবে ‘ম্যানেজ’ করার এই অভিযোগের পক্ষে কোনো অর্থ লেনদেনের প্রত্যক্ষ প্রমাণ এখনো পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।অভিযোগের বিষয়ে রাজউক জোন-৭-এর পরিদর্শক মুরাদ-এর বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি অভিযোগটি অস্বীকার করেন। ভবনটির নির্মাণকাজ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়টা আমি দেখি নাই, দেখব।”তার বক্তব্য থেকে বোঝা যায়, ভবনটির নির্মাণকাজ তিনি সরেজমিনে যাচাই করে দেখবেন এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি পরবর্তীতে নির্ধারণ করবেন।ভবনটির অনুমোদন, নকশা ও নির্মাণসংক্রান্ত বিষয় জানতে রাজউক জোন-৭-এর অথরাইজার ইলিয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি দেখতেছি।”তবে ভবনটির অনুমোদিত নকশা রয়েছে কি না, নির্মাণকাজ অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী হচ্ছে কি না কিংবা কোনো ধরনের বিধিবহির্ভূত নির্মাণ হচ্ছে কি না—এ বিষয়ে তিনি বিস্তারিত তথ্য দেননি।অন্যদিকে, স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ, ভবন মালিকের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজউক কর্মকর্তাদের যোগাযোগ রয়েছে এবং তাদের ‘ম্যানেজ’ করেই নির্মাণকাজ এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
তবে এ অভিযোগও এখনো স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা কোনো ধরনের অনিয়ম বা অবৈধ সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।রাজধানীর পুরান ঢাকার মতো ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় অপরিকল্পিত বা বিধিবহির্ভূত ভবন নির্মাণ নগর ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি জননিরাপত্তার জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে সরু রাস্তা ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে ভবনের সেটব্যাক, রাস্তার প্রস্থ, ভবনের উচ্চতা, অনুমোদিত নকশা, ভূমি ব্যবহার, অগ্নিনিরাপত্তা এবং কাঠামোগত নিরাপত্তা যথাযথভাবে অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ।নয়াবাজারের ৩০ জিন্দাবাদ প্রথম লেনের নির্মাণাধীন ভবনটিতে এসব বিধিবিধান যথাযথভাবে মানা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন।একই সঙ্গে ভবনটির রাজউকের অনুমোদিত নকশা ও নির্মাণ অনুমোদন রয়েছে কি না, থাকলে বাস্তবে নির্মাণকাজ সেই অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী হচ্ছে কি না—তা সরেজমিন পরিদর্শনের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে, কোনো ভবনের কাগজপত্রে অনুমোদন থাকা এবং বাস্তবে অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী নির্মাণ হওয়া এক বিষয় নয়। অনেক ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত তলা, বাড়তি অংশ বা নির্ধারিত জায়গা দখল করে নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। তাই শুধু কাগজপত্র যাচাই নয়, অনুমোদিত নকশার সঙ্গে বাস্তব নির্মাণের মিল রয়েছে কি না, সেটিও পরীক্ষা করা জরুরি।
নয়াবাজারের জিন্দাবাদ এলাকার এই ভবনের ক্ষেত্রেও রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে অনুমোদিত নকশা, নির্মাণ অনুমোদন ও বাস্তব নির্মাণকাজের মধ্যে কোনো অসঙ্গতি রয়েছে কি না, তা যাচাই করলে অভিযোগের প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে।ভবন নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগের পাশাপাশি রাজউকের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ‘ম্যানেজ’ করার যে অভিযোগ উঠেছে, সেটিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা দরকার। কারণ অভিযোগটি সত্য হলে তা শুধু একটি ভবনের নির্মাণ অনিয়মের বিষয় নয়; বরং নগর উন্নয়ন ও ভবন নির্মাণের নিয়ন্ত্রক সংস্থার তদারকি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করবে।তবে কোনো কর্মকর্তা বা ভবন মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। সংশ্লিষ্ট নথিপত্র, অনুমোদিত নকশা, নির্মাণ অনুমতি এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করেই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব।নয়াবাজারের ৩০ জিন্দাবাদ প্রথম লেনের নির্মাণাধীন ভবন নিয়ে স্থানীয়দের অভিযোগের পর এখন রাজউকের কার্যকর পদক্ষেপের অপেক্ষায় এলাকাবাসী। ভবনটির অনুমোদন ও নির্মাণবিধি যাচাই করে অনিয়ম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।একই সঙ্গে ভবনটি নির্মাণে কোনো বিধিবহির্ভূত কার্যক্রম হয়ে থাকলে তা বন্ধ করা এবং রাজউকের কোনো কর্মকর্তা অনিয়মে জড়িত থাকার প্রমাণ পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধেও যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে।এখন দেখার বিষয়, রাজউক জোন-৭-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা সরেজমিনে পরিদর্শন করে ভবনটির নির্মাণসংক্রান্ত অভিযোগ কতটা সত্যতা পান এবং কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে কর্তৃপক্ষ কী ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করে। পাশাপাশি ‘ম্যানেজ’ করার অভিযোগেরও কোনো সত্যতা রয়েছে কি না, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হওয়ার অপেক্ষায় রয়েছে।