ন্ধুত্ব থেকে বৈরিতা: নওয়াজ-ইমরানের সম্পর্কের দীর্ঘ রাজনৈতিক অধ্যায়

একসময় তারা ছিলেন বন্ধু। ক্রিকেটের সূত্রে পরিচয়, এরপর ঘনিষ্ঠতা। এমনকি রাজনীতিতে আসার পর একে অপরকে পাশে পাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে যায় সেই সম্পর্ক। একপর্যায়ে পাকিস্তানের রাজনীতিতে তারা হয়ে ওঠেন তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বী।

তারা হলেন পাকিস্তানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরীফ ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান। ক্রিকেট মাঠ থেকে শুরু হওয়া তাদের পরিচয় শেষ পর্যন্ত গড়ায় তীব্র রাজনৈতিক সংঘাতে। তাদের সম্পর্কের উত্থান-পতন পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ একটি অধ্যায়।

ক্রিকেট থেকেই পরিচয়

নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খান দুজনই লাহোরের সচ্ছল পরিবারে বেড়ে ওঠেন। নওয়াজ ছিলেন ব্যবসায়ী পরিবারের সন্তান। অন্যদিকে ইমরান খানের বাবা ছিলেন সিভিল ইঞ্জিনিয়ার। দুজনেরই ক্রিকেটের প্রতি ছিল গভীর আগ্রহ।

ইমরান খান ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের টেস্ট দলে জায়গা পান। অন্যদিকে নওয়াজ শরীফের ক্রিকেট ক্যারিয়ার সীমিত পর্যায়ে থাকলেও তিনি ক্লাব ক্রিকেটের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার প্রতিষ্ঠিত ইত্তেফাক ক্রিকেট ক্লাবে সে সময়ের অনেক নামী ক্রিকেটার খেলতেন।

লাহোর জিমখানা ক্রিকেট ক্লাবেই ইমরান ও নওয়াজের পরিচয় হয়। তখন ইমরান বিশ্বের অন্যতম সেরা ফাস্ট বোলার হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছিলেন। আর নওয়াজ ছিলেন রাজনীতিতে প্রবেশের প্রাথমিক পর্যায়ে।

সাবেক ক্রিকেটার ও সাংবাদিকদের বর্ণনা অনুযায়ী, শুরুতে তাদের সম্পর্ক খুব একটা ঘনিষ্ঠ ছিল না। ইমরানের বাউন্সারে নওয়াজকে প্রায়ই সমস্যায় পড়তে হতো। পরে বিভিন্ন সাক্ষাৎ ও যোগাযোগের মধ্য দিয়ে তাদের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়।

রাজনীতিতে নওয়াজ, ক্রিকেটে ইমরান

১৯৮২ সালে ইমরান খান পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক হন। এর আগে ১৯৮১ সালে পাঞ্জাবের অর্থমন্ত্রী হওয়া নওয়াজ শরীফ ১৯৮৫ সালে প্রদেশটির মুখ্যমন্ত্রী হন। দুজনেরই তৎকালীন সামরিক শাসক জেনারেল জিয়া-উল-হকের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল।

তবে নওয়াজের ক্রিকেটপ্রেম তখনও অটুট ছিল। মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি নিয়মিত জিমখানায় ক্রিকেট খেলতেন। এমনকি আন্তর্জাতিক দলের বিপক্ষে দুটি প্রস্তুতি ম্যাচে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটও খেলেছিলেন।

১৯৮৭ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে একটি প্রস্তুতি ম্যাচে নওয়াজ শরীফের ক্রিকেটপ্রেম নিয়ে মজার একটি ঘটনা ঘটে। পাকিস্তান ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ইমরান খানকে না জানিয়েই নওয়াজকে ওই ম্যাচে পাকিস্তান দলের অধিনায়ক করা হয়। পরে তিনি ওয়েস্ট ইন্ডিজের অধিনায়ক ভিভ রিচার্ডসের সঙ্গে টস করতে মাঠে নামেন এবং ব্যাটিংয়ের জন্যও প্রস্তুত হন।

শেষ পর্যন্ত নওয়াজ শরীফ দুই বলের বেশি টিকতে পারেননি। দ্বিতীয় বলেই তিনি বোল্ড হয়ে যান।

ইমরানের সাফল্যে নওয়াজের ভূমিকা

১৯৮৮ সালে নওয়াজ আবার পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হন এবং ১৯৯০ সালে প্রথমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। একই সময়ে ইমরান খানের ক্রিকেট ক্যারিয়ারও সাফল্যের শীর্ষে ওঠে।

১৯৯২ বিশ্বকাপের আগে ইমরানের দল থেকে জাভেদ মিয়াঁদাদ বাদ পড়ার ঘটনায় নওয়াজ শরীফের ভূমিকা ছিল বলে দাবি করেছেন জ্যেষ্ঠ ক্রীড়া সাংবাদিক কামার আহমেদ। তবে মিয়াঁদাদ নিজে এ বিষয়ে নওয়াজের ভূমিকা নিশ্চিত করতে পারেননি।

তবে ইমরান খানের আরেকটি বড় প্রকল্প শওকত খানম হাসপাতাল নির্মাণে নওয়াজ শরীফের সহযোগিতার বিষয়টি স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। ১৯৯২ বিশ্বকাপের আগেই পাঞ্জাবের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে নওয়াজ হাসপাতালের জন্য জমি পাওয়ার ক্ষেত্রে ইমরানকে সহায়তা করেন। পরে হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানেও নওয়াজ উপস্থিত ছিলেন।

রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব

১৯৯২ বিশ্বকাপ জয়ের পর ইমরান খানকে রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দেওয়ার কথা প্রকাশ্যে জানান নওয়াজ শরীফ। ইমরান তখন জানান, এর আগে তাকে দুবার রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তিনি নিজেকে তখন রাজনীতিবিদ হিসেবে দেখতে পাচ্ছিলেন না।

তবে মাত্র চার বছর পর, ১৯৯৬ সালে তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই) প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকভাবে রাজনীতিতে প্রবেশ করেন ইমরান খান।

রাজনীতিতে আসার আগে নওয়াজ শরীফ আবারও ইমরানকে দলে নেওয়ার চেষ্টা করেন। ইমরানের নিজের ভাষ্য অনুযায়ী, নওয়াজ তাকে প্রথমে দলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ পদ এবং পরে জাতীয় পরিষদের ২০টি আসন নিয়ে জোট করার প্রস্তাব দিয়েছিলেন। এমনকি তাকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী করার প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করেন পি জে মীর।

ইমরান অবশ্য এসব প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন। নিজের আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছেন, নওয়াজ শরীফ ও বেনজির ভুট্টোর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডকে তিনি দুর্নীতিগ্রস্ত মনে করতেন।

সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আবার একসঙ্গে

১৯৯৭ সালের নির্বাচনে ইমরান খান ও তার দল বড় ধরনের পরাজয়ের মুখে পড়ে। অন্যদিকে নওয়াজ শরীফ বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে দ্বিতীয়বার প্রধানমন্ত্রী হন।

কিন্তু ১৯৯৯ সালের ১২ অক্টোবর জেনারেল পারভেজ মুশাররফ সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে নওয়াজ সরকারের পতন ঘটান। নওয়াজ কারাবন্দি হওয়ার পর সৌদি আরবে নির্বাসিত হন। অন্যদিকে প্রথমে মুশাররফকে সমর্থন করলেও পরবর্তী সময়ে ইমরানও তার কাছ থেকে দূরে সরে যান। ২০০৭ সালে মুশাররফের আমলেই ইমরান কারাবন্দি হন।

এরপর লন্ডনে নওয়াজের সঙ্গে ইমরানের সাক্ষাৎ হয়। সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে তারা আবারও একজোট হন। ২০০৭ সালের জুনে তারা পারভেজ মুশাররফের শাসনের বিরুদ্ধে একসঙ্গে কাজ করার ঘোষণা দেন এবং অল পার্টিজ ডেমোক্রেটিক মুভমেন্টে যুক্ত হন।

তবে সেই জোটও বেশিদিন টেকেনি। নির্বাচন বর্জন নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে আবারও তাদের পথ আলাদা হয়ে যায়।

বন্ধুত্ব থেকে তীব্র রাজনৈতিক লড়াই

২০১১ সালে ইমরান খান নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সামনে আসেন। তখনও তার প্রধান রাজনৈতিক আক্রমণের লক্ষ্য ছিল পাকিস্তান পিপলস পার্টি। নওয়াজ শরীফের সঙ্গে তার সম্পর্ক পুরোপুরি বৈরী হয়ে ওঠেনি।

কিন্তু ২০১৩ সালের নির্বাচন সামনে আসার পর পরিস্থিতি বদলে যায়। নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খান বুঝতে পারেন, পাকিস্তানের রাজনীতিতে তাদের লড়াই মূলত একে অপরকে ঘিরেই। এরপর তাদের রাজনৈতিক ভাষা ও অবস্থান ক্রমেই কঠোর হতে থাকে।

২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে নওয়াজ শরীফ দণ্ডিত হয়ে কারাগারে যান। একই নির্বাচনে ইমরান খান প্রথমবার পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হন। যে প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনে একসময় নওয়াজ তাকে রাজনীতিতে আসার প্রস্তাব দিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই বাসভবনের বাসিন্দাই হন ইমরান।

তবে ইমরানের প্রধানমন্ত্রিত্বও পূর্ণ মেয়াদ পায়নি। তিনি তার ক্ষমতাচ্যুতির জন্য রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের পাশাপাশি তৎকালীন সেনাপ্রধান জেনারেল কামার জাভেদ বাজওয়াকেও দায়ী করেন। নওয়াজ শরীফও এর আগে একই প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিলেন।

আবারও কি এক হতে পারেন?

পাকিস্তানের রাজনীতিতে পুরোনো প্রতিদ্বন্দ্বীদের মিত্র হয়ে ওঠার নজির রয়েছে। নওয়াজ শরীফ ও বেনজির ভুট্টোর দীর্ঘ রাজনৈতিক বিরোধের পর ২০০৭ সালে তাদের মধ্যে ‘চার্টার অব ডেমোক্রেসি’ স্বাক্ষরিত হয়েছিল।

তাই প্রশ্ন উঠছে, ভবিষ্যতে নওয়াজ শরীফ ও ইমরান খানও কি আবার কোনো সমঝোতায় যেতে পারেন?

সোহেল ওয়ারাইচ মনে করেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তাদের মধ্যে জোটের সুযোগ নেই। তবে পি জে মীরের ধারণা, কোনো না কোনোভাবে তাদের মধ্যে সমঝোতা হতে পারে এবং এবার তারা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একসঙ্গে অবস্থান নিতে পারেন।

বন্ধুত্ব থেকে রাজনৈতিক জোট, এরপর বিরোধ এবং শেষ পর্যন্ত তীব্র বৈরিতা—ইমরান খান ও নওয়াজ শরীফের সম্পর্ক তাই পাকিস্তানের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক দীর্ঘ ও নাটকীয় অধ্যায়। তাদের সম্পর্কের পরিবর্তনের সঙ্গে দেশটির ক্ষমতার রাজনীতি, সামরিক প্রতিষ্ঠানের ভূমিকা এবং রাজনৈতিক মেরুকরণের পরিবর্তনও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *