মোশারফ হোসেন জসিম পাঠান:
নেত্রকোনার পূর্বধলা উপজেলার সদর ইউনিয়নের নারায়ণডহর গ্রামে একটি পারিবারিক সংঘর্ষের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মামলা দায়েরের পর এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। সংঘর্ষে আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের মামলায় আসামি করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রকৃত হামলাকারীদের আসামি না করে উদ্ধারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে দাবি করেছেন ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা। ঘটনাটি সঠিকভাবে তদন্ত করে প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, নারায়ণডহর গ্রামের শ্রী কমল চন্দ্র দাসের পারিবারিক বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। গত ৭ অক্টোবর ২০২৬, দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে কমল চন্দ্র দাস, তাঁর স্ত্রী নিয়তি রানী দাস ও মেয়ে ঝুমা রানী দাসের মধ্যে কথাকাটাকাটির একপর্যায়ে মারামারির ঘটনা ঘটে বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। এতে কমল চন্দ্র দাস গুরুতর আহত হন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আহত কমল চন্দ্র দাসের চিৎকার শুনে আশপাশের লোকজন দ্রুত ঘটনাস্থলে এগিয়ে আসেন। পরে লিংকন দাস, মো. ইলিয়াস ও শ্যামল দাসসহ কয়েকজন তাঁকে উদ্ধার করে উপজেলা হাসপাতালে নিয়ে যান বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে। তবে ঘটনার সময় ঠিক কী ঘটেছিল, কারা সংঘর্ষে জড়িত ছিলেন এবং কীভাবে কমল চন্দ্র দাস আহত হয়েছেন, তা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
উদ্ধারকারীদের বিরুদ্ধে মামলা, এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, পারিবারিক সংঘর্ষের ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে পরবর্তী সময়ে উদ্ধারকাজে অংশ নেওয়া ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে। তাঁদের দাবি, সংঘর্ষে যাঁরা সরাসরি জড়িত ছিলেন, তাঁদের পরিবর্তে আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া ব্যক্তিদের আসামি করা হয়েছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে গ্রামজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা চলছে বলে জানা গেছে।
গ্রামবাসীর কয়েকজনের ভাষ্য অনুযায়ী, কমল চন্দ্র দাসের পরিবারের সদস্যদের মধ্যে বিরোধের জের ধরেই ঘটনার সূত্রপাত হয়। তাঁদের দাবি, ঘটনার পর আহত ব্যক্তিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত মো. ইলিয়াস ও তাঁর ছোট ভাই রাজন মিয়াকে মামলায় আসামি করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা।
তবে মামলার এজাহারে কী অভিযোগ আনা হয়েছে, ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য কী এবং তদন্তে কী তথ্য পাওয়া গেছে, তা যাচাই করা জরুরি। শুধু স্থানীয়দের বক্তব্যের ভিত্তিতে মামলাটি মিথ্যা বা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একইভাবে, কাউকে আসামি করা হয়েছে বলেই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে—এমনটিও বলা যায় না।
সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের তথ্য সংগ্রহ
ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর ঢাকা থেকে প্রকাশিত একটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকার সাংবাদিক এবং মানবাধিকারকর্মীরা সরেজমিনে তথ্য সংগ্রহ করতে এলাকায় যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এ সময় তাঁরা গ্রাম ও এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বলেন এবং ঘটনার বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য জানতে চান। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা পারিবারিক বিরোধ, সংঘর্ষ এবং পরবর্তী মামলার বিষয়ে তাঁদের অভিযোগ তুলে ধরেন।
স্থানীয়দের দাবি, ঘটনার প্রকৃত চিত্র উদ্ঘাটন করতে হলে সংঘর্ষের সময় উপস্থিত প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, আহত কমল চন্দ্র দাসের চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি, মামলার এজাহার এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা প্রয়োজন। পাশাপাশি, আহত ব্যক্তিকে হাসপাতালে নেওয়ার ঘটনায় কারা উপস্থিত ছিলেন এবং তাঁদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের পক্ষে কী ধরনের প্রমাণ রয়েছে, তা তদন্তের মাধ্যমে নিশ্চিত করা উচিত।
পূর্বধলা থানায় মামলা, নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি
স্থানীয় সূত্রে মামলাটির নম্বর পূর্বধলা থানার ১০ বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে মামলার তারিখ, এজাহারের পূর্ণ বিবরণ এবং আসামিদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। এ কারণে মামলাটির প্রকৃত বিষয়বস্তু জানতে সংশ্লিষ্ট থানার নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় বাসিন্দারা নেত্রকোনা জেলার ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তা, জেলা পুলিশ সুপার এবং স্থানীয় প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। তাঁদের দাবি, ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত দায়ীদের শনাক্ত করতে হবে। একই সঙ্গে, নিরপরাধ কেউ হয়রানির শিকার হয়ে থাকলে তাঁর প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি পারিবারিক বিরোধকে কেন্দ্র করে সংঘর্ষ ও মামলা দায়েরের ঘটনায় কোনো পক্ষের বক্তব্য উপেক্ষা করা উচিত নয়। আহত ব্যক্তি, অভিযুক্ত ব্যক্তি, মামলার বাদী, আসামি এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গ্রহণের পাশাপাশি চিকিৎসাসংক্রান্ত নথি ও অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করা হলে প্রকৃত ঘটনা স্পষ্ট হতে পারে।
এ বিষয়ে নিয়তি রানী দাস, প্রলয় চন্দ্র দাস, মামলার বাদী এবং পূর্বধলা থানা পুলিশের বক্তব্য পাওয়া গেলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে আরও পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। তাঁদের বক্তব্য ও তদন্তের ফলাফল ছাড়া কাউকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়। এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দ্রুত নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে ঘটনার প্রকৃত সত্য উদ্ঘাটন করবে এবং আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।