মোঃআনজার শাহ
মাদকমুক্ত বরুড়া গড়ার প্রত্যয়ে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। তাঁর আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে কুমিল্লার বরুড়া থানার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে একটি নতুন পিকআপ ভ্যান। গত ২৮ আগস্ট ২০২৬ এই যানবাহনটি থানার জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।
এর আগে গত ২ এপ্রিল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন এমপির কাছে বরুড়া থানার জন্য দুটি পিকআপ ভ্যান বরাদ্দের আবেদন করেছিলেন মন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন। আবেদনে তিনি বরুড়া থানার বিস্তীর্ণ এলাকার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, জনসংখ্যা, সড়ক নেটওয়ার্ক এবং পুলিশের বিদ্যমান যানবাহন-সংকটের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেন।
বিশাল জনপদ, সীমিত যানবাহন:
প্রায় ২৪২ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বরুড়া থানা এলাকায় বসবাস করেন প্রায় সাড়ে চার লাখ মানুষ। ১৫টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত এই জনপদে রয়েছে ৩৪৫টি গ্রাম। এত বিশাল এলাকার মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশের নিয়মিত টহল, অপরাধ দমন, মাদকবিরোধী অভিযান এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর প্রয়োজন হয় প্রতিনিয়ত।
কিন্তু এত বড় জনপদের বিপরীতে থানার যানবাহনের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। মন্ত্রীর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী বরুড়া থানার বহরে বর্তমানে রয়েছে মাত্র পাঁচটি ডাবল কেবিন পিকআপ। অন্যদিকে উপজেলা শহরের পাশাপাশি ৩৪৫টি গ্রামের মধ্য দিয়ে বিস্তৃত প্রায় ১ হাজার ৫৫৮ কিলোমিটার সড়ক নেটওয়ার্কে পুলিশকে দায়িত্ব পালন করতে হয়।
নতুন গাড়িতে বাড়বে টহলের গতি:
এই বাস্তবতায় নতুন পিকআপ ভ্যানটি বরুড়া থানার আইনশৃঙ্খলা কার্যক্রমে নতুন গতি আনবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে প্রত্যন্ত ও দুর্গম এলাকায় নিয়মিত টহল, মাদকবিরোধী অভিযান এবং জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত পুলিশি সহায়তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে যানবাহনটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, বরুড়ায় মাদকের বিস্তার তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত যেভাবে ছড়িয়ে পড়ছে, তা নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম আরও জোরদার করা প্রয়োজন। শুধু অভিযান পরিচালনা করলেই হবে না, অভিযানের জন্য প্রয়োজন দ্রুতগতির চলাচল ও পর্যাপ্ত লজিস্টিক সহায়তা।
তিনি বলেন, “মাদকের ছড়াছড়ি বরুড়া থেকে নির্মূল করতে হলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা বাড়াতেই হবে। থানায় যে সংখ্যক গাড়ি রয়েছে, তা দিয়ে এত বড় এলাকার নিয়মিত টহল ও প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করা যথেষ্ট নয়।”
দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাই মূল চাবিকাঠি:
মন্ত্রীর মতে, একটি থানার কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা অনেকাংশে নির্ভর করে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর সক্ষমতার ওপর। কোথাও অপরাধ সংঘটিত হলে কিংবা কোনো জরুরি পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে পুলিশের দ্রুত উপস্থিতি যেমন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে, তেমনি অপরাধীদের মধ্যেও আইনের উপস্থিতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দেয়।
বরুড়ার মতো বিস্তীর্ণ গ্রামীণ জনপদে এই সক্ষমতার গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ প্রত্যন্ত কোনো গ্রামের মানুষ বিপদে পড়লে থানার দূরত্ব এবং যানবাহনের সংকট যেন পুলিশের সহায়তা পাওয়ার পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায় এই বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা:
স্থানীয় পর্যায়ের মানুষের প্রত্যাশা, নতুন পিকআপ ভ্যানটি বরুড়া থানার নিয়মিত টহল কার্যক্রমকে আরও গতিশীল করবে। পাশাপাশি মাদকবিরোধী অভিযান, অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং জরুরি সেবায় পুলিশের দ্রুত সাড়া দেওয়ার সক্ষমতাও বাড়বে।
সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, একটি নতুন গাড়ি বাহ্যিকভাবে হয়তো ছোট একটি সংযোজন মনে হতে পারে। কিন্তু বিস্তীর্ণ একটি জনপদের নিরাপত্তার প্রশ্নে এর গুরুত্ব অনেক গভীর। পুলিশের একটি অতিরিক্ত টহল গাড়ি মানে আরও বেশি এলাকায় পুলিশের উপস্থিতি, আরও দ্রুত সাড়া এবং সংকটের মুহূর্তে মানুষের পাশে দাঁড়ানোর বাড়তি সক্ষমতা।
এখন প্রত্যাশা একটাই বরাদ্দ পাওয়া পিকআপ ভ্যানটি যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থেকে বরুড়ার মানুষের নিরাপত্তায় বাস্তব ভূমিকা রাখে। মাদক ও অপরাধের বিরুদ্ধে পুলিশের তৎপরতা আরও জোরদার হোক, আর প্রত্যন্ত গ্রামের মানুষও যেন প্রয়োজনের মুহূর্তে দ্রুত পুলিশি সহায়তা পান।
বরুড়ার আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার এই উদ্যোগ তাই স্থানীয় মানুষের কাছে শুধু একটি গাড়ি পাওয়ার খবর নয়; বরং নিরাপদ জনপদ গড়ার পথে একটি নতুন প্রত্যাশার দরজা খুলে দেওয়ার মতোই গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।