বিএনপি প্রতিশোধের রাজনীতি নয়, সমাধান ও মানবাধিকারের পথে এগোতে চায়: তারেক রহমান

স্বাধীন সংবাদ ডেস্ক: 

বিএনপি প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে সরে এসে সমাধান, পুনর্মিলন ও মানবাধিকারের ভিত্তিতে একটি নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি গড়ে তুলতে চায় বলে জানিয়েছেন দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, “কোনো বাংলাদেশিকেই আর রাষ্ট্রের ভয়ে বাঁচতে হবে না—সে বিরোধী মতের সমর্থক হোক কিংবা সরকারের।” মানবাধিকার দিবস উপলক্ষে বুধবার (১০ ডিসেম্বর) ফেসবুকে দেওয়া দীর্ঘ বিবৃতিতে তিনি এসব কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বাংলাদেশের বর্তমান প্রয়োজন রাজনীতির চেয়েও বড় কিছু—একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ, যেখানে মত প্রকাশের স্বাধীনতা, নিরাপত্তা, মর্যাদা ও মানবাধিকার সবার জন্য নিশ্চিত থাকবে।

তারেক রহমান বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে যে দমন-পীড়ন, সহিংসতা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বাস্তবতার মধ্যে বাংলাদেশ নিমজ্জিত ছিল, তা কারও কাছে গোপন নয়। কেউ সেই অন্ধকারকে তীব্রভাবে অনুভব করেছে, কেউ আবার নীরবে বুকের মধ্যে চেপে রেখেছে। কিন্তু যাদের রাজনৈতিক অবস্থান পূর্ববর্তী সরকারের বিপরীতে ছিল, তাদের জন্য সেই অন্ধকার ছিল প্রতিদিনের বাস্তবতা। মিথ্যা মামলা, রাতের অজানা কড়া নাড়া, গুম, হেফাজতে মৃত্যু, নির্যাতন—সবকিছুর সর্বাধিক শিকার হয়েছে বিএনপির নেতা-কর্মীরা। এমনকি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের সময়ও সবচেয়ে বেশি রক্ত ঝরেছে বিএনপির ঘরেই।

তিনি বলেন, “বিচারবহির্ভূত হত্যা, গুম, হেফাজতে মৃত্যু ও মিথ্যা মামলার ভয়াবহ সময়টি বিএনপির চেয়ে বেশি আর কেউ বহন করেনি।” তবুও তাঁর মতে, অত্যাচারের শিকার শুধু বিএনপি ছিল না। ছাত্র, সাংবাদিক, লেখক, সাধারণ মানুষসহ নানা শ্রেণিপেশার মানুষ সেই ভয়ংকর পরিবেশের শিকার হয়েছে। ন্যূনতম মানবাধিকার—যেমন মর্যাদা, নিরাপত্তা ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা—সবই ছিল হুমকির মুখে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র যেন এক গহ্বরের মধ্যে আটকে পড়েছিল, যেখানে সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার হয়ে উঠেছিল অস্থিরতার বিষয়।

তারেক রহমান অভিযোগ করেন, ২০১৫ সাল থেকে তাঁর নিজের কথা বলার অধিকারও সম্পূর্ণভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। কোনো পত্রিকা, টিভি চ্যানেল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁর বক্তব্য প্রচারের ওপর গোপন নিষেধাজ্ঞা ছিল। “আমি যেন কিছুই বলতে না পারি, এমন এক নীরবতা আমার ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছিল,” বলেন তিনি। তবে সেই চাপিয়ে দেওয়া নীরবতার মধ্যেও তিনি মানুষের ন্যায্য অধিকার, গণতন্ত্র ও সত্যের পক্ষে লড়াই চালিয়ে গেছেন। তাঁর ভাষায়, “সত্যের স্পিরিটকে আদেশ দিয়ে থামানো যায় না; সত্য কখনো নিঃশেষ হয় না।”

বিবৃতিতে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা প্রকাশ করেন। তারেক রহমান বলেন, লম্বা অন্ধকার সময়টাতে দেশনেত্রী খালেদা জিয়া ছিলেন ‘ধৈর্য ও প্রতিরোধের সবচেয়ে বড় প্রতীক’। মিথ্যা মামলা, কারাবাস, এবং রাজনৈতিকভাবে তাঁকে নিঃশেষ করার চেষ্টার মধ্য দিয়ে পুরো দেশের ওপর একটি কর্তৃত্ববাদী শাসনের প্রতিফলন ফুটে উঠেছিল। তবুও খালেদা জিয়া গণতান্ত্রিক আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। তাঁর বিশ্বাস ছিল স্পষ্ট—অধিকার সবার; ভয় দেখিয়ে দেশকে এগোনো সম্ভব নয়।

তারেক রহমান আবেগঘনভাবে উল্লেখ করেন তাঁর পরিবারের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথাও। “আমার মা নিজ হাতে সহ্য করেছেন তাঁর ছেলেকে জেলে নেওয়া, নির্যাতনের মানসিক যন্ত্রণা। আরেক ছেলেকে আমরা চিরতরে হারিয়েছি,” বলেন তিনি। এসব কষ্ট শুধু তাঁদের পরিবারের নয়, বরং বাংলাদেশের হাজারো পরিবারের গল্প। “কঠিন সময় মানুষকে তিক্ত না করে বরং মহান করে—আমার মা সেটাই প্রমাণ করেছেন,” মন্তব্য করেন তিনি। খালেদা জিয়ার কাছ থেকে তিনি শিখেছেন, ন্যায়, নৈতিকতা ও ক্ষমাশীলতার পথই ভবিষ্যৎকে বদলে দিতে পারে।

বিবৃতিতে তিনি বলেন, বিএনপি ভয়াবহ ক্ষতির মধ্য দিয়ে গেছে, কিন্তু কখনো ভেঙে পড়েনি। বরং সত্য, ন্যায়, জবাবদিহি, পুনর্মিলন ও আইনের শাসনের প্রতি আরও দৃঢ় অবস্থান নিয়েছে। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, প্রতিশোধের রাজনীতি বিএনপির পথ নয়। “ঘৃণা দিয়ে দেশকে বদলানো যায় না। প্রয়োজন ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সমাধানের রাজনীতি,” বলেন তারেক। তাঁর মতে, একটি সভ্য রাষ্ট্রে বিরোধী মত কখনো হুমকি নয়—বরং গণতন্ত্রের অপরিহার্য অংশ। বিভিন্ন মত, চিন্তা ও রাজনৈতিক আদর্শ নিয়ে সবাইকে নিয়ে এগিয়ে যাওয়াই একটি আধুনিক রাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য।

তারেক রহমান আশ্বাস দিয়ে বলেন, বিএনপি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে কোনো মানুষকেই রাষ্ট্রের ভয়ে বাঁচতে হবে না। সে সরকারি দলের সমর্থক হোক বা বিরোধী দলের—সবাই সমান নিরাপত্তা, মর্যাদা ও অধিকার পাবে। তিনি বলেন, “আমরা প্রতিশোধের রাজনীতি প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা সমাধানের পথে বিশ্বাসী। আমরা চাই সব মানুষের কণ্ঠস্বর গুরুত্বপূর্ণ হোক, সবার অধিকার সুরক্ষিত হোক।”

তিনি আরও বলেন, অতীতের ভয়াবহ দমন-পীড়নের ইতিহাস যেন আর পুনরাবৃত্তি না ঘটে, সেজন্য রাষ্ট্রকে মানবাধিকারকেন্দ্রিক একটি কাঠামোতে গড়ে তুলতে হবে। আইনের শাসন, জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার ওপর ভিত্তি করে এমন একটি রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মানুষ স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারবে এবং মত প্রকাশের জন্য নিপীড়নের শিকার হবে না। “এটাই হবে নতুন বাংলাদেশের ভিত্তি,” মন্তব্য করেন তিনি।

তারেক রহমানের বিবৃতিতে উঠে আসে বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণে তিনটি মূল লক্ষ্য—মানবাধিকার নিশ্চিতকরণ, ভিন্নমতের প্রতি সহমর্মিতা এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসামুক্ত একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা। তিনি মনে করেন, এই তিনটি লক্ষ্য অর্জন করতে পারলেই দেশ অন্ধকারের গহ্বর থেকে বের হয়ে আলোর পথে হাঁটতে পারবে। তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে মানুষের কণ্ঠ, অধিকার এবং জীবন—সবকিছুরই মূল্য আছে। যেখানে মানবাধিকার আমাদের ভবিষ্যতের কেন্দ্রে থাকবে।”

বিবৃতির শেষাংশে তিনি ঐক্যের আহ্বান জানান। তাঁর ভাষায়, “আজ বাংলাদেশের প্রয়োজন রাজনীতির চেয়েও বড় কিছু—একটি ঐক্যবদ্ধ দেশ। এই দেশ আমরা সবাই মিলে গড়ব। কারও ক্ষত যেন আর কারও জীবনে ফিরে না আসে।”
তারেক রহমান আবারও পুনর্ব্যক্ত করেন যে বিএনপি দেশকে ঘৃণা, প্রতিশোধ ও বিভাজনের রাজনীতি থেকে বের করে আনতে চায়। তিনি বলেন, “দেশ বদলাতে হলে ন্যায়, নৈতিকতা ও ক্ষমার রাজনীতি প্রয়োজন। গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাই হবে আমাদের ভবিষ্যতের ভিত্তি।”

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *