বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের সরকারি নির্দেশনা, হাইকোর্টের নিষেধাজ্ঞা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ দখলের অভিযোগের মধ্যেও আলোচনায় বরিশাল বাণিজ্য মেলা পরেশ সাগর মাঠ ও কালেক্টরেট স্কুল প্রাঙ্গণে চলমান কার্যক্রম ঘিরে প্রশ্ন, ক্ষোভ ও উদ্বেগ

 

নিজস্ব প্রতিবেদক, বরিশাল:

দেশব্যাপী বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচি বাস্তবায়নে সরকার যখন কঠোর নির্দেশনা জারি করেছে, তখন বরিশাল নগরীর ঐতিহাসিক পরেশ সাগর মাঠ ও বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে আয়োজিত বাণিজ্য মেলাকে ঘিরে নতুন করে জনমনে প্রশ্ন, ক্ষোভ ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সরকারি পরিপত্র, আদালতের নির্দেশনা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, ধর্মীয় অনুভূতি, জনদুর্ভোগ এবং প্রশাসনিক তদারকির প্রশ্ন-সব মিলিয়ে মেলাটি এখন বরিশালের অন্যতম আলোচিত বিষয়ে পরিণত হয়েছে।

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগের সমন্বয়-২ শাখা থেকে জারিকৃত স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০০০.০৫২.৯৯.০০২.২৬.৩৬৯, তারিখ ০১ জুন ২০২৬ (১৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ)-এর পরিপত্রে বলা হয়েছে, বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে দেশের সকল শপিংমল, মার্কেট, দোকানপাট, মেলা, বাণিজ্য মেলা এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখতে হবে। একই সঙ্গে সকল বিলবোর্ডের আলোও সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে, এর আগে স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০০০.০৭১.৩১.০০৫.২৪.২০০, তারিখ ০৫ এপ্রিল ২০২৬-এর মাধ্যমে একই ধরনের নির্দেশনা কার্যকর করা হয়েছিল। পরবর্তীতে পবিত্র ঈদুল আজহা উপলক্ষে স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০০০.০৫২.৯৯.০০২.২৬.৩২৯, তারিখ ১২ মে ২০২৬-এর মাধ্যমে সাময়িকভাবে রাত ১০টা পর্যন্ত ব্যবসা প্রতিষ্ঠান খোলা রাখার অনুমতি দেওয়া হয়। তবে সেই সিদ্ধান্তের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর পুনরায় সন্ধ্যা ৭টার সময়সীমা কার্যকর করা হয়েছে।

সরকারি পরিপত্র অনুযায়ী, এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেশের সকল সিটি কর্পোরেশন, বিভাগীয় কমিশনার ও জেলা প্রশাসনের ওপর ন্যস্ত করা হয়েছে। কিন্তু স্থানীয়দের অভিযোগ, বরিশাল বাণিজ্য মেলার ক্ষেত্রে সেই নির্দেশনার বাস্তব প্রতিফলন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের নির্দেশনার মধ্যেও মেলার কার্যক্রম: স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি নির্দেশনায় সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে মেলা বন্ধ রাখার কথা বলা হলেও বরিশাল বাণিজ্য মেলার বিভিন্ন কার্যক্রম রাত পর্যন্ত চলতে দেখা যায়। মেলার বিভিন্ন স্টল, আলোকসজ্জা, নাগরদোলা এবং বিনোদনমূলক আয়োজন নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

সচেতন নাগরিকদের মতে, যখন বিদ্যুৎ সাশ্রয়ের স্বার্থে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বিপণিবিতানগুলোর জন্য সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে, তখন একই নীতিমালা মেলার ক্ষেত্রেও সমানভাবে বাস্তবায়িত হওয়া উচিত।

‘এক মাঠে মেলা, খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত পাঁচ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী: বরিশাল বাণিজ্য মেলাকে ঘিরে সবচেয়ে বেশি আলোচনা সৃষ্টি হয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মাঠ ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে। গত ১৫ মে জাতীয় দৈনিক সমকাল, দৈনিক স্বাধীন সংবাদ এবং বিভিন্ন অনলাইন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, একটি মাঠকে কেন্দ্র করে আয়োজিত বাণিজ্য মেলার কারণে অন্তত পাঁচটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও সহশিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।

প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়, শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারিত মাঠ দীর্ঘ সময় ধরে বাণিজ্যিক কাজে ব্যবহৃত হওয়ায় নিয়মিত খেলাধুলা, শারীরিক শিক্ষা কার্যক্রম এবং বিভিন্ন শিক্ষা-সাংস্কৃতিক আয়োজন বন্ধ বা সীমিত হয়ে পড়েছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং সচেতন নাগরিকদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়।

শিক্ষাবিদদের মতে, একটি মাঠ কেবল খেলার স্থান নয়; এটি শিক্ষার্থীদের শারীরিক ও মানসিক বিকাশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ফলে দীর্ঘ সময় ধরে মাঠ দখল করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক বিকাশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

হাইকোর্টের: গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পর বিষয়টি নিয়ে জনস্বার্থে রিট দায়ের করা হলে রিট পিটিশন নং-৬২৫৯/২০২৬ এর শুনানি শেষে গত ১৮ মে ২০২৬ বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মোঃ আশিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ গুরুত্বপূর্ণ আদেশ দেন। আদালত রুল নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বরিশাল কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রাঙ্গণে কোনো ধরনের বাণিজ্য মেলা আয়োজন না করার নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে মেলা পরিপত্র-২০২৪ এর ধারা ৫(ছ) উল্লেখ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে এ ধরনের আয়োজনকে বিধিবহির্ভূত বলে পর্যবেক্ষণ দেন।

পরেশ সাগর মাঠ ঘিরে ধর্মীয় ও সামাজিক আবেগ : পরেশ সাগর মাঠ বরিশালের একটি ঐতিহাসিক ও পরিচিত স্থান। স্থানীয়দের ভাষ্যমতে, মরহুম মাওলানা দেলোয়ার হোসেন সাঈদী বহু বছর এই মাঠে পবিত্র কুরআনের তাফসির মাহফিল করেছেন। ফলে মাঠটিকে ঘিরে ধর্মপ্রাণ মানুষের আবেগ ও অনুভূতি জড়িত রয়েছে।

স্থানীয়দের একাংশের অভিযোগ, এই ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় গুরুত্বসম্পন্ন স্থানে বাণিজ্যিক মেলা আয়োজন এবং কিছু বিনোদনমূলক কার্যক্রম সাধারণ মানুষের অনুভূতিতে আঘাত হানছে। যদিও এ বিষয়ে ভিন্নমতও রয়েছে, তবুও বিষয়টি নগরজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।

সাংস্কৃতিক আয়োজন: স্থানীয় বাসিন্দা, অভিভাবক ও ধর্মপ্রাণ মানুষের একাংশের অভিযোগ, মেলায় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও নৃত্যানুষ্ঠান পরিচালিত হয়েছে, যা নিয়ে সামাজিক ও ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে আপত্তি রয়েছে। তাদের দাবি, কিছু অনুষ্ঠান স্থানীয় মূল্যবোধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে আয়োজক কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই এবং প্রয়োজনীয় তদন্তের দাবি উঠেছে। জনদুর্ভোগ ও শব্দদূষণের অভিযোগ: মেলাকে ঘিরে জনদুর্ভোগের অভিযোগও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের দাবি, মেলা চলাকালে আশপাশের এলাকায় যানজট, অতিরিক্ত জনসমাগম এবং শব্দদূষণ বৃদ্ধি পেয়েছে। সন্ধ্যার পর দর্শনার্থীদের চাপ বাড়লে স্থানীয় সড়কগুলোতে যান চলাচল ব্যাহত হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন: সরকারি পরিপত্র বাস্তবায়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। একদিকে সরকারের স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০০০.০৫২.৯৯.০০২.২৬.৩৬৯, অন্যদিকে রিট পিটিশন নং-৬২৫৯/২০২৬-এ হাইকোর্টের নির্দেশনা-উভয় বিষয় সামনে আসার পরও কেন বিতর্কের অবসান ঘটছে না, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। আইনজীবীদের মতে, আদালতের নির্দেশনা এবং সরকারি পরিপত্র উভয়ই বাস্তবায়ন করা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্ব। আদালতের আদেশ অমান্যের অভিযোগ প্রমাণিত হলে তা আদালত অবমাননার প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারে। একইভাবে সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে ব্যর্থতা প্রশাসনিক জবাবদিহিতার বিষয় হয়ে উঠতে পারে।

জনস্বার্থ, শিক্ষা ও আইনের শাসনের প্রশ্ন: সচেতন মহলের মতে, বিষয়টি এখন আর কেবল একটি বাণিজ্য মেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এটি আইনের শাসন, আদালতের নির্দেশনা বাস্তবায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ সংরক্ষণ, ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি সম্মান, বিদ্যুৎ সাশ্রয় কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পর্কিত একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত হয়েছে। তাদের দাবি, স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০০০.০৫২.৯৯.০০২.২৬.৩৬৯, স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০০০.০৭১.৩১.০০৫.২৪.২০০, স্মারক নং: ২৭.০০.০০০০.০০০.০৫২.৯৯.০০২.২৬.৩২৯ এবং রিট পিটিশন নং-৬২৫৯/২০২৬ অনুযায়ী দ্রুত, স্বচ্ছ ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক, যাতে শিক্ষার্থীদের স্বার্থ, জনস্বার্থ এবং আইনের শাসন সমুন্নত থাকে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *