নিজস্ব প্রতিবেদক:
বিএনপি সরকার ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের পথেই হাঁটছে বলে অভিযোগ করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। তাঁর দাবি, রাষ্ট্রের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে পরিবর্তনের প্রত্যাশা পূরণে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণ না করে সরকার নিজেই রাজনৈতিক সংঘাতের পথ তৈরি করছে।
রোববার (১৮ অক্টোবর) দুপুরে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে আয়োজিত এক মুক্ত আলোচনায় তিনি এসব কথা বলেন। ‘জুলাই সনদের প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার এক বছর সালতামামি’ শীর্ষক এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।
শফিকুর রহমান বলেন, ক্ষমতায় আসার পর গত সাত মাসে বিএনপি সরকার রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। বিরোধী দল দেশের উন্নয়নে সরকারকে সহযোগিতা করতে চেয়েছিল। কিন্তু সরকার সেই সহযোগিতা নিতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই এখন থেকে সরকারকে নয়, দেশের ১৮ কোটি মানুষকে সহযোগিতা করবে বিরোধী দল।
তিনি বলেন, বিএনপি পরিবর্তিত হলেও জামায়াত নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করবে না। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন এবং গণভোটের রায় আদায় না হওয়া পর্যন্ত তাঁরা তাঁদের দাবি থেকে সরে আসবেন না।
বিএনপির বিরুদ্ধে অতীত ভুলে যাওয়ার অভিযোগ তুলে জামায়াত আমির বলেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুপুর পর্যন্ত বিএনপি তাদের মতোই একটি রাজনৈতিক দল ছিল। এরপর দলটি রাতারাতি নিজেদের অতীত ভুলে গেছে। কিছু বিষয়ে মতপার্থক্য থাকলেও গণভোটের প্রশ্নে আগে তাদের মধ্যে ভিন্নমত ছিল না বলে দাবি করেন তিনি।
শফিকুর রহমান বলেন, জামায়াত চেয়েছিল জাতীয় নির্বাচনের আগে গণভোট অনুষ্ঠিত হোক, যাতে গণভোটের বিষয়টি অনিশ্চয়তায় না পড়ে। কিন্তু বিএনপি তাতে রাজি হয়নি। বরং একই দিনে নির্বাচন ও গণভোট আয়োজনের জন্য চাপ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সংসদ সদস্যদের শপথ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, নির্বাচন কমিশন একজন সংসদ সদস্যকে দুটি শপথ নেওয়ার কথা জানিয়েছিল। কিন্তু বিএনপির সংসদ সদস্যরা সংসদ সদস্য হিসেবে শপথ নিলেও সংসদ পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ নেননি বলে তাঁর অভিযোগ। এ ঘটনাকে জাতির সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতার ধারাবাহিকতা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধী দলকে আন্দোলনের পথে ঠেলে দেওয়ার জন্য বিএনপিকে দায়ী করে জামায়াত আমির বলেন, সরকার গণভোটের রায় যথাযথভাবে মূল্যায়ন করলে বিরোধী দলকে সংসদের বাইরে আন্দোলনে যেতে হতো না। নির্বাচনে জয়লাভ করে পাঁচ বছর সরকার পরিচালনার দায়িত্ব পাওয়ার যুক্তি দেখিয়ে গণভোটের রায় উপেক্ষা করা উচিত নয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারি ও বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের বরাদ্দের বিষয়ে বৈষম্যের অভিযোগ তুলে শফিকুর রহমান বলেন, সরকারি দলের ২০৮টি আসনের সংসদ সদস্যদের বিশেষ বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। অথচ বিরোধী দলের একজন সংসদ সদস্যকেও বরাদ্দ দেওয়া হয়নি বলে তিনি দাবি করেন।
তিনি বলেন, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে পুরোনো রাজনৈতিক সংস্কৃতির অবসান ঘটবে এবং নতুন ধারার রাজনীতি শুরু হবে—এমন প্রত্যাশা ছিল জনগণের। কিন্তু দেশকে আবারও আগের পরিস্থিতির দিকে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এমনকি মহিষের ওপরও কর আরোপ করা হয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
বিরোধী দলের ভূমিকা তুলে ধরে জামায়াত আমির বলেন, নানা অভিযোগ ও প্রতিকূলতার মধ্যেও জনগণ তাঁদের বিরোধী দলের আসনে বসিয়েছে। বিরোধী দলের ৮৯ জন সংসদ সদস্য দেশের ১৮ কোটি মানুষের পক্ষে দায়িত্ব পালন করবেন। তাঁদের নানা ধরনের লোভ-লালসা দেখানো হলেও তাঁরা তা প্রত্যাখ্যান করেছেন বলে জানান তিনি।
শফিকুর রহমান আরও বলেন, বিরোধী দল হিমালয়ের মতো অটল থেকে তাদের লক্ষ্য অর্জনে এগিয়ে যাবে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান তাঁদের জন্য শিক্ষা ও অনুপ্রেরণা। নব্য ফ্যাসিবাদের পতন ঘটবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
সরকারের ব্যর্থতা কামনা করেননি উল্লেখ করে জামায়াত আমির বলেন, তাঁরা সরকারের সফলতা চেয়েছিলেন, কারণ সরকারের সফলতা মানেই দেশের সফলতা। এত দিন সরকারকে সহযোগিতা করার কথা বললেও এখন থেকে দেশের ১৮ কোটি মানুষের পাশে থাকার ঘোষণা দেন তিনি। তাঁর অভিযোগ, বিরোধী দলের সহযোগিতা গ্রহণের যোগ্যতা বর্তমান সরকারের নেই।
বক্তব্যের শেষ পর্যায়ে তিনি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও গণভোটের রায় আদায়ের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেন।