মধুপুরে মাদক ব্যবসায় কোটিপতি ভূমিহীন হেলাল, উঠতি বয়সী যুবকদের নিয়ে উদ্বেগ

কে, এম, তৈয়ব আলী-হীরা:

টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার ৬ নম্বর মির্জাবাড়ী ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের পালবাড়ী গ্রামে মাদকের বিস্তার নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মাদক ব্যবসার কারণে এলাকার উঠতি বয়সী একদল যুবক মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ছে। এতে পরিবার ও সামাজিক জীবনে নানা ধরনের সংকট তৈরি হচ্ছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

ঐতিহ্যবাহী পালবাড়ী গ্রামটি ঘিরে রয়েছে চিরচেনা আঁকা-বাঁকা বংশাই নদী। নদীবেষ্টিত কৃষিনির্ভর এই গ্রামের সাধারণ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করে আসছেন। স্থানীয়দের অনেকেই সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করে তুলেছেন। তাদের কেউ দেশে, আবার কেউ বিদেশে বিভিন্ন ক্ষেত্রে অবদান রাখছেন।

তবে বর্তমানে মাদকের বিস্তারকে কেন্দ্র করে এলাকার সামাজিক পরিবেশ নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, সমাজের বিভিন্ন স্তরে মাদকের প্রভাব পড়ছে। বিশেষ করে উঠতি বয়সী যুবকদের একটি অংশ মাদকের নেশায় জড়িয়ে পড়ায় অভিভাবকেরা দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকায় কিশোর গ্যাংয়ের মতো দলও গড়ে উঠছে। তাদের উৎপাতে অনেক অভিভাবক নিরুপায় হয়ে পড়েছেন। প্রাণনাশের ভয়ে অনেকে প্রতিবাদ করতেও সাহস পান না বলে অভিযোগ রয়েছে।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে জানা যায়, শহিদুল্যা কামারের একমাত্র ছেলে সোহেল (৪২) এবং তমছের আলীর ছেলে মিলন (৩৬) সহ প্রায় ৩০ জন উঠতি বয়সী যুবক মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মাদকের টাকা জোগাড় করতে তারা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে খারাপ আচরণ করছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, মাদকাসক্ত সোহেল গত কয়েক দিনে গাছ বিক্রির ১৬ হাজার টাকা বাবা-মায়ের কাছ থেকে নিয়ে গেছেন। এ সময় তিনি বাবা-মাকে প্রাণনাশের ভয় দেখিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তাদের দাবি, মাত্র দুই দিনের মধ্যেই ওই টাকা শেষ করে ফেলেন সোহেল।

স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব মাদক বিক্রির সঙ্গে জড়িত রয়েছেন মৃত নাইয়ূব আলীর ছেলে হেলাল (৫৫)। স্থানীয়দের কেউ কেউ তাকে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হিসেবে উল্লেখ করে ‘মাদক সম্রাট’ বলেও দাবি করছেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

স্থানীয়দের দেওয়া তথ্যে আরও জানা যায়, যমুনার ভাঙনে চরম অসহায় অবস্থায় নাইয়ূব আলী দুই ছেলে ও দুই মেয়েকে নিয়ে বৃহত্তর মধুপুর থানার ভাইঘাট এলাকায় এসে আশ্রয় নেন। বাজারের খাস জায়গায় মানবিক সহায়তায় ঝুপড়ি ও কুঁড়েঘর তুলে চরম দারিদ্র্যের মধ্যে তার সংসার চলত বলে স্থানীয়রা জানান।

নাইয়ূব আলীর দুই ছেলের মধ্যে হেলাল ছোট এবং বেলাল বড়। স্থানীয়দের দাবি, বেলাল জীবিকার প্রয়োজনে রিকশা চালাতে ঢাকায় গিয়ে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান। এরপর পরিবারের দায়িত্বের বড় অংশ হেলালের ওপর পড়ে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, বিয়ের পর হেলাল সংসার চালাতে গৃহস্থের ফরমায়েশি কাজ করতেন। তার বিরুদ্ধে চুরির অভিযোগও ছিল এবং চুরির মামলায় জেল খেটেছেন বলেও স্থানীয়দের কেউ কেউ দাবি করেন।

অভিযোগ রয়েছে, পরবর্তী সময়ে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে হেলাল বিপুল অর্থ-সম্পদের মালিক হয়েছেন। স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, বর্তমানে তিনি কোটিপতি। তবে তার সম্পদের পরিমাণ ও মাদক ব্যবসার সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক বিক্রির অভিযোগ থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় মাদক ব্যবসা বিস্তারের সুযোগ পেয়েছে। পুলিশের ভূমিকা নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্ন রয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট থানার পুলিশ কর্মকর্তার বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

এলাকাবাসীর দাবি, মাদকের বিস্তার বন্ধে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি উঠতি বয়সী যুবকদের মাদক থেকে দূরে রাখতে পরিবার, সমাজ ও প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন তারা।

মাদকের কারণে যাতে কোনো পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত না হয় এবং এলাকার স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশ বজায় থাকে, সে জন্য দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় সচেতন মহল।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *