স্টাফ রিপোর্টার:
রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) দুই নিম্নপদস্থ কর্মচারী—অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর ফারহানা সিদ্দিকা এবং জোন-৮ এর অফিস সহকারী মো. আনোয়ার হোসেন ওরফে আলমকে ঘিরে নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের প্রকৃত পেশাগত পরিচয় গোপন করে তারা পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাটাগরিতে তিন কাঠার একটি প্লটের দখল নিয়েছেন। একই সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে তদবির, প্রভাব খাটানো, প্লট বাণিজ্য এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের মাধ্যমে কয়েক কোটি টাকার মালিক হওয়ার অভিযোগও রয়েছে এই দম্পতির বিরুদ্ধে। যদিও এসব অভিযোগের বেশিরভাগই এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে প্রমাণিত হয়নি এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যকর তদন্তও দৃশ্যমান নয়।
তথ্য অনুযায়ী, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে সাধারণ ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাটাগরির ৩ কাঠার একটি প্লট (আইডি নং-২০-৩০১-০০৪) বুঝে নিতে ২০২৫ সালের ১০ অক্টোবর রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করেন ফারহানা সিদ্দিকা। আবেদনে তিনি নিজের স্বামী হিসেবে মো. আনোয়ার হোসেনের নাম উল্লেখ করেন এবং ঠিকানা হিসেবে ১৬/২, উত্তর-পশ্চিম যাত্রাবাড়ী (১২ নম্বর গলি, ৫ম তলা), ঢাকা উল্লেখ করেন। কিন্তু আবেদনের কোথাও উল্লেখ করা হয়নি যে, আবেদনকারী এবং তার স্বামী দুজনই রাজউকের কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ফারহানা সিদ্দিকা রাজউকের অর্থ ও নিরীক্ষা শাখায় অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটর হিসেবে কর্মরত। অন্যদিকে তার স্বামী মো. আনোয়ার হোসেন ওরফে আলম রাজউকের জোন-৮ এ অফিস সহকারী হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ রয়েছে, নিজেদের সরকারি চাকরির পরিচয় গোপন রেখে ক্ষতিগ্রস্ত কোটায় প্লট গ্রহণের সুযোগ নিয়েছেন তারা। এ বিষয়টি নিয়ে রাজউকের ভেতরেও নানা আলোচনা রয়েছে।
বিষয়টি নিয়ে সময়নিউজের পক্ষ থেকে ফারহানা সিদ্দিকার মোবাইল ফোনে (০১৮৩০***৮৮৩) যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, তিনি প্লটটির মূল বরাদ্দগ্রহীতা আব্দুল জব্বার মীরের নিযুক্ত আম-মোক্তার। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বরাদ্দগ্রহীতা প্লটের সব কিস্তি পরিশোধ করার পর নিয়ম অনুযায়ী দখল বুঝে নিতে চেয়ারম্যানের কাছে আবেদন করা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, ইতোমধ্যে প্লটটি তার স্বামীর নামে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে বরাদ্দগ্রহীতার পরিবর্তে কেন তার স্বামীর নামে প্লট হস্তান্তর করা হলো—এমন প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন।
এদিকে এই দম্পতির বিরুদ্ধে অভিযোগ নতুন নয়। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৩ সালের ১৪ আগস্ট দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) উপ-পরিচালক জেসমিন আক্তার রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে একটি চিঠি পাঠান। সেখানে রাজউকের অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ তদন্তের লক্ষ্যে ১২ জনের একটি তালিকা সংযুক্ত করা হয়। তালিকার পাঁচ ও ছয় নম্বরে ছিল আনোয়ার হোসেন আলম এবং ফারহানা সিদ্দিকার নাম। একই সঙ্গে ৩০ আগস্টের মধ্যে সংশ্লিষ্টদের রেকর্ডপত্র সরবরাহেরও অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে অভিযোগ রয়েছে, এরপর দুদক কিংবা রাজউক—কোনো পক্ষ থেকেই কার্যকর তদন্ত বা দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি সেই তদন্তের ফলাফলও কখনো প্রকাশ্যে আসেনি বলে দাবি সংশ্লিষ্ট সূত্রের।
এরই মধ্যে ২০২৫ সালের ৫ নভেম্বর রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন মিথিলা ফারজানা নামের এক নারী। অভিযোগে তিনি উল্লেখ করেন, রাজউকের এস্টেট-০১ শাখার এস্টেট পরিদর্শক মুকিদ উল হাফিজ বহিরাগত ব্যক্তি তন্ময় সরকারের সঙ্গে যোগসাজশ করে অবৈধভাবে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। অভিযোগে আরও বলা হয়, তন্ময় সরকার একসময় রাজউকের মোবাইল কোর্ট পরিচালনার সময় এস্টেট-০১ শাখা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। তখন তার ব্যবহৃত ল্যাপটপ থেকে রাজউক-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ তথ্য উদ্ধার করা হয়েছিল। পরে তিনি আর কখনো রাজউকে প্রবেশ করবেন না এবং অবৈধ কর্মকাণ্ডে জড়াবেন না—এ মর্মে ৩০০ টাকার স্ট্যাম্পে মুচলেকা দিয়ে মুক্তি পান। কিন্তু বর্তমানে তিনি আবারও রাজউকের এস্টেট-০১ শাখায় সক্রিয় থেকে নিজেকে রাজউকের কর্মচারী পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগে আরও বলা হয়, তন্ময় সরকার জোন-৮ এর অফিস সহকারী আনোয়ার হোসেন আলমের ভাগিনা।
রাজউকের একাধিক সূত্রের দাবি, ফারহানা-আলম দম্পতি দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরির আড়ালে তদবির, দালালি এবং প্রভাব বিস্তারের মাধ্যমে বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। মাসিক প্রায় ৫০ হাজার টাকা বেতনের চাকরি করলেও ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাদের নামে ও বেনামে একাধিক প্লট, ফ্ল্যাট, বাড়ি এবং জমি রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে জমা দেওয়া অভিযোগে তাদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পদের পরিমাণ ৫০ কোটিরও বেশি বলে দাবি করা হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমেও একাধিকবার সংবাদ প্রকাশিত হলেও এখন পর্যন্ত কার্যকর তদন্ত কিংবা দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
পরবর্তীতে একই অভিযোগকারী মিথিলা ফারজানা আবারও রাজউক চেয়ারম্যানের কাছে আরেকটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। সেখানে উল্লেখ করা হয়, আনোয়ার হোসেন আলম তার নির্ধারিত কর্মস্থল জোন-৮ এ নিয়মিত উপস্থিত না থেকে অধিকাংশ সময় রাজউকের প্রধান কার্যালয়ে তদবির ও দালালি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। এমনকি হাজিরা খাতায় নিজে স্বাক্ষর না করে অন্যের মাধ্যমে নিয়মিত জাল স্বাক্ষর করানোর অভিযোগও করা হয়। আরও অভিযোগ করা হয়, তিনি নিজের প্রকৃত জেলা সিরাজগঞ্জ গোপন করে জামালপুর জেলার ঠিকানা ব্যবহার করে রাজউকে চাকরিতে যোগদান করেছিলেন।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে এই দম্পতির ২১০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ও একটি ছয়তলা বাড়ি রয়েছে। উত্তরার উত্তরখান মৌজায় ৪ দশমিক ৭৫ কাঠার একটি প্লট, রানাভোলা মৌজায় ৫ কাঠা জমির ওপর প্রায় সম্পন্ন ছয়তলা ভবন, পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পে একাধিক প্লট এবং রাজধানীর গুলিস্তানের মুক্তিযোদ্ধা মার্কেটে দোকানও রয়েছে বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
মিথিলা ফারজানার অভিযোগে আরও দাবি করা হয়েছে, ২০১৫ সালে অবৈধ ডলার বহনের অভিযোগে মিরপুর এলাকা থেকে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন আনোয়ার হোসেন আলম। এছাড়া পল্লবী থানার একটি ফৌজদারি মামলার (নং-৪৬, তারিখ ১৭/০৮/২০২৫) এক নম্বর আসামিও তিনি। অভিযোগে বলা হয়, কয়েক বছর আগে পূর্বাচলে প্লট দেওয়ার প্রলোভন দেখিয়ে আবুল হোসেন নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা গ্রহণ করে ভুয়া দলিলের মাধ্যমে প্রতারণা করা হয়েছিল। একইসঙ্গে গুলশান এস্টেটের একটি ফাইল গায়েব হওয়ার ঘটনাতেও তার নাম উঠে এসেছিল বলে অভিযোগে উল্লেখ রয়েছে।
রাজউকের ভেতরের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘ দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে রাজউকে কর্মরত থেকে তদবির ও দালালি কেন্দ্রিক একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছেন আনোয়ার-ফারহানা দম্পতি। কোন ফাইল কোথায় রয়েছে, কোন প্লটের নথি আটকে আছে কিংবা কার নকশা অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে—এসব বিষয়ে আলমের বিস্তারিত ধারণা থাকায় তিনি এসব তথ্যকে পুঁজি করে একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এদিকে অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর উপজেলার মাজনাবাড়ি এলাকায় নিজের ছোট ছেলের নামে “বাইতুর রাইয়ান নূরানী ও হাফিজিয়া মাদ্রাসা” প্রতিষ্ঠা করেছেন আনোয়ার হোসেন আলম। টিনশেড ভবনে পরিচালিত ওই প্রতিষ্ঠানে শিশু শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত পাঠদান করা হয়। এলাকাবাসীর অনেকেই তাকে রাজউকের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা বলে মনে করেন এবং স্থানীয়ভাবে তিনি “আলম স্যার” নামেই পরিচিত। দামি গাড়িতে চলাফেরা, ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানে অনুদান প্রদান এবং বিভিন্ন আর্থিক সহায়তার কারণে এলাকায় তার আলাদা প্রভাব রয়েছে বলেও স্থানীয়রা জানান।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, তাদের ধারণা ছিল আলম রাজউকের বড় কর্মকর্তা। পরে জানতে পারেন তিনি মূলত কেরানি পদে কর্মরত। তিনি দাবি করেন, গ্রামের বিভিন্ন এলাকায় নিজের এবং আত্মীয়স্বজনের নামে বিপুল পরিমাণ জমি কিনেছেন আলম। এলাকায় কেউ জমি বিক্রির উদ্যোগ নিলেই তার লোকজন আগে খবর পেয়ে যান এবং বাজারমূল্যের চেয়েও বেশি দামে জমি কিনে নেন। একই সঙ্গে মসজিদ, মাদ্রাসা নির্মাণ ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে অনুদান দেওয়ার কারণে স্থানীয়দের একটি অংশ তাকে “দানবীর” হিসেবেও বিবেচনা করেন।
রাজউকের এক কর্মচারী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, দুইজনই নিম্নপদস্থ সরকারি কর্মচারী হলেও রাজধানীর উত্তর-পশ্চিম যাত্রাবাড়ীর শহীদ ফারুক রোডে তাদের দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে। এছাড়া নারায়ণগঞ্জের সাইনবোর্ড এলাকায় একটি বাড়ি, উত্তরা ও পূর্বাচলে একাধিক প্লট, যাত্রাবাড়ীর ওয়াসা রোডের একটি নয়তলা ভবনের অধিকাংশ ফ্ল্যাট এবং আত্মীয়স্বজনের নামেও বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তিনি আরও বলেন, তাদের ব্যবহৃত বিলাসবহুল গাড়িটির পেছনেই প্রতি মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা ব্যয় হয়, যা প্রায় তাদের মাসিক বেতনের সমান।
এসব অভিযোগের বিষয়ে জানতে আনোয়ার হোসেন আলমের মোবাইল ফোনে (০১৭১১৩৬***৫) যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, যাত্রাবাড়ীতে একটি ফ্ল্যাট, ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য একটি গাড়ি এবং উত্তরায় সাড়ে তিন কাঠার একটি জমি ছাড়া তাদের আর কোনো সম্পদ নেই। তিনি দাবি করেন, তিনি ও তার স্ত্রী দুই যুগেরও বেশি সময় ধরে রাজউকে চাকরি করছেন। ২০০৬ সালে জমি এবং ২০১০ সালে ফ্ল্যাট কিনেছেন। তাদের ট্যাক্স ফাইলে সব সম্পদের হিসাব উল্লেখ রয়েছে বলেও তিনি জানান। তবে উত্তরার রানাভোলা মৌজায় পাঁচ কাঠা জমির ওপর ছয়তলা ভবন নির্মাণের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর না দিয়ে মোবাইল ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। পরে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কিংবা ফারহানা সিদ্দিকার বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।
অন্যদিকে এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে রাজউক চেয়ারম্যানের দপ্তরে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার সঙ্গে দেখা করা সম্ভব হয়নি। ফলে অভিযোগগুলোর বিষয়ে রাজউকের আনুষ্ঠানিক কোনো বক্তব্যও পাওয়া যায়নি।
সব মিলিয়ে পরিচয় গোপন করে প্লট গ্রহণ, বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ, দীর্ঘদিনের তদবির বাণিজ্য, প্লট ও জমি নিয়ে অনিয়ম এবং প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের নানা অভিযোগে আবারও আলোচনায় এসেছে রাজউকের এই দম্পতি। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো পূর্ণাঙ্গ তদন্ত বা আইনি নিষ্পত্তি না হওয়ায় অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের ওপরই নির্ভর করছে।