রাজউকের শাহিদা শারমিনের বিরুদ্ধে ‘নোটিশ বাণিজ্যের’ অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার:

রাজধানীর শ্যামপুর থানাধীন জুরাইনের শাহাদাৎ হোসেন সড়কের হোল্ডিং নম্বর-১৬৯/ট-এ রাজউকের অনুমোদিত নকশা ও প্রযোজ্য বিধিবিধান যথাযথভাবে অনুসরণ না করে বহুতল ভবন নির্মাণের অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে নির্মাণাধীন ভবনটির মালিককে নোটিশ দেওয়ার পর অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করে দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে রাজউক জোন-৭-এর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সেটব্যাক ও ফাঁকা জায়গা রাখা হয়নি। এমনকি পাশের ভবনের গা ঘেঁষে ভবনের কাঠামো নির্মাণের ফলে দুই ভবনের মধ্যে প্রয়োজনীয় দূরত্ব, আলো-বাতাস চলাচল এবং নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, গত ১৩ আগস্ট ২০২৬ রাজউক জোন-৭-এর কর্মকর্তারা হোল্ডিং-১৬৯/ট-এর নির্মাণাধীন ভবনটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনের সময় ভবন মালিক ডাক্তার মো. কাফি রাজউকের অনুমোদিত নকশা, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নির্মাণ অনুমোদনপত্র দেখাতে পারেননি বলে জানা গেছে।

এরপর রাজউকের পক্ষ থেকে ভবন মালিককে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রসহ নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাজউক কার্যালয়ে উপস্থিত হওয়ার জন্য নোটিশ দেওয়া হয়। নোটিশে অনুমোদিত নকশা, ভূমি ব্যবহার ছাড়পত্র ও নির্মাণ অনুমোদনপত্র দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিষয়টির নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়। নোটিশের একটি অনুলিপি শ্যামপুর থানায়ও দেওয়া হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তবে স্থানীয়দের দাবি, রাজউকের পক্ষ থেকে নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হলেও বাস্তবে ভবনটির নির্মাণকাজ বন্ধ হয়নি। ১৩ আগস্ট পরিদর্শনের সময় ভবনটির প্রথম তলার ছাদ নির্মাণের কাজ চলছিল। পরবর্তীতে প্রথম তলার কাজ শেষ করে দ্বিতীয় তলার নির্মাণকাজ শুরু করা হয়েছে বলে সরেজমিনে দেখা গেছে বলে স্থানীয়রা দাবি করেছেন।

এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে, রাজউকের লিখিত নির্দেশনার পরও যদি নির্মাণকাজ অব্যাহত থেকে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ধরনের আইনগত বা প্রশাসনিক ব্যবস্থা নিয়েছে। পাশাপাশি নোটিশ দেওয়ার পর ভবনটি পুনরায় পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না, নির্মাণকাজ বন্ধের নির্দেশ বাস্তবায়ন হয়েছিল কি না এবং ভবন মালিক নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দাখিল করেছিলেন কি না—এসব বিষয় নথিপত্রের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।

নকশা ও সেটব্যাক নিয়ে প্রশ্ন

অভিযোগ রয়েছে, ভবনটির নির্মাণে অনুমোদিত নকশা যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়নি। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সেটব্যাক ও ফাঁকা জায়গা রাখার ক্ষেত্রেও অনিয়ম হয়েছে বলে স্থানীয়দের দাবি।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, ভবনটির কাঠামো পাশের ভবনের খুব কাছাকাছি নির্মাণ করা হয়েছে। এতে ভবন দুটির মধ্যে প্রয়োজনীয় দূরত্ব, আলো-বাতাস চলাচল এবং অগ্নি ও অন্যান্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, ভূমি ব্যবহার সংক্রান্ত অনুমোদন এবং প্রযোজ্য ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে কি না, তা যাচাই করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। অনুমোদনবহির্ভূত নির্মাণের বিষয়টি প্রমাণিত হলে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে।

দেড় লাখ টাকা লেনদেনের অভিযোগ

এদিকে সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে নোটিশ জারির পর অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসা করার বিষয়ে। স্থানীয়দের দাবি, ভবন মালিকের কাছ থেকে দেড় লাখ টাকা নেওয়ার বিনিময়ে ভবন নির্মাণের অনিয়মের বিষয়টি মিটিয়ে দেওয়া হয়েছে।

তবে অর্থ লেনদেনের এ অভিযোগের পক্ষে স্বাধীনভাবে যাচাই করা কোনো নথি বা প্রমাণ এই প্রতিবেদকের হাতে আসেনি। ফলে অভিযোগটির সত্যতা নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন।

ভবনটি পরিদর্শনের দায়িত্বে থাকা রাজউক জোন-৭-এর নির্মাণ পরিদর্শক শাহিদা শারমিন এবং অথোরাইজড কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস হোসেনের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয়রা।

বিশেষ করে নোটিশ জারির পর নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়ে থাকলে তা বাস্তবে কার্যকর হয়েছিল কি না, পরবর্তীতে ভবনটি পুনরায় পরিদর্শন করা হয়েছিল কি না এবং অনিয়ম অব্যাহত থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কী ব্যবস্থা নিয়েছে—এসব বিষয় খতিয়ে দেখার দাবি জানিয়েছেন তারা।

কর্মকর্তাদের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে রাজউক জোন-৭-এর নির্মাণ পরিদর্শক শাহিদা শারমিন বলেন, ভবন মালিককে নোটিশ দেওয়া হয়েছিল এবং ১৫ দিনের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছিল। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তারা জবাব দেননি।

তবে অর্থ লেনদেন কিংবা নোটিশ বাণিজ্যের অভিযোগের বিষয়ে তার কাছ থেকে বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

অন্যদিকে অথোরাইজড কর্মকর্তা মো. ইলিয়াস হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে সাংবাদিক পরিচয় জানার পর তিনি ব্যস্ত থাকার কথা বলে ফোন কেটে দেন। পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

ভবন মালিক ডাক্তার মো. কাফির সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি রাজউকের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে বিষয়টি মীমাংসা করেছেন বলে জানান।

নয়তলা ভবনের অনুমোদন নিয়েও প্রশ্ন

স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবনটি নয়তলা পর্যন্ত নির্মাণের অনুমোদন যথাযথ প্রক্রিয়ায় নেওয়া হয়েছিল কি না, সেটিও যাচাই করা প্রয়োজন।

তাদের মতে, তদন্তের মাধ্যমে অন্তত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা দরকার। এর মধ্যে রয়েছে—অনুমোদিত নকশায় ভবনের উচ্চতা, তলা সংখ্যা, ভূমি ব্যবহার ও সেটব্যাক কতটুকু নির্ধারণ করা হয়েছিল; ১৩ আগস্টের পরিদর্শনে কী কী অনিয়ম বা অসংগতি পাওয়া গিয়েছিল; কোন বিধান বা শর্তের ভিত্তিতে নোটিশ জারি করা হয়েছিল এবং নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ বাস্তবে কার্যকর করা হয়েছিল কি না।

এ ছাড়া নির্ধারিত ১৫ দিনের মধ্যে ভবন মালিক কোনো জবাব বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়েছিলেন কি না, পরবর্তীতে রাজউক কর্তৃপক্ষ ভবনটি পুনরায় পরিদর্শন করেছে কি না এবং কোনো অনুমোদন, নকশা সংশোধন, বৈধকরণ কিংবা লিখিত নিষ্পত্তির সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে তার আইনগত ও প্রশাসনিক ভিত্তি কী—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি

এ ঘটনায় রাজউক চেয়ারম্যানসহ সংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা। তাদের বক্তব্য, শুধু ভবন মালিক অনুমোদিত নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ করেছেন কি না, সেটি যাচাই করলেই হবে না; বরং নোটিশ জারি থেকে শুরু করে পরবর্তী সময়ে বিষয়টি কীভাবে নিষ্পত্তি হয়েছে, সেই পুরো প্রক্রিয়াটিও নথিভিত্তিকভাবে খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।

রাজধানীতে ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে অনুমোদিত নকশা, ভূমি ব্যবহার এবং প্রযোজ্য নির্মাণবিধি অনুসরণ করা গুরুত্বপূর্ণ। অনুমোদন ছাড়া বা অনুমোদিত নকশার ব্যত্যয় ঘটিয়ে নির্মাণ হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিধি অনুযায়ী প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত পদক্ষেপ নিতে পারে।

একইভাবে কোনো সরকারি কর্মকর্তা দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগের মুখে পড়লে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে তদন্ত করে দেখা প্রয়োজন।

রাজউক চেয়ারম্যানের বক্তব্য

রাজউক চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম-এর ভাষ্যমতে, কিছু অসাধু কর্মকর্তার কর্মকাণ্ডের কারণে বিভিন্ন সময়ে রাজউকের সব কর্মকর্তা-কর্মচারীকে সমালোচনার মুখে পড়তে হয়।

সচেতন মহলের মতে, রাজউকের কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পাওয়া গেলে তা নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা প্রয়োজন। তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইন ও বিধিমালা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।

জুরাইনের হোল্ডিং-১৬৯/ট-এর ভবন নির্মাণ, রাজউকের নোটিশ, নির্মাণকাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ, পরবর্তী নির্মাণ কার্যক্রম এবং অর্থের বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার অভিযোগ—সবকিছু নথিপত্রের ভিত্তিতে যাচাই করে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *