রাজশাহীর প্রতিটি সড়ক পাবে নাম ও নম্বর; মানহীন পণ্যের অভিযোগে তদন্তের আশ্বাস গৃহায়ণমন্ত্রীর

মোঃআনজার শাহ

আধুনিক শহরের আদলে রাজশাহী মহানগরীর ৩০টি ওয়ার্ডের প্রতিটি সড়কের নামকরণ ও নম্বরকরণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে গণপূর্তের কাজে মানহীন পণ্য সরবরাহের অভিযোগ পেলে তদন্ত এবং ভবন নির্মাণে আইন লঙ্ঘনকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী জাকারিয়া তাহের সুমন, এমপি।

মঙ্গলবার (১৪ অক্টোবর) রাজশাহীতে বিভিন্ন উন্নয়ন কার্যক্রম পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপে তিনি এসব পরিকল্পনা ও অবস্থানের কথা তুলে ধরেন। রাজশাহী মহানগরীর ১ নম্বর ওয়ার্ডে সড়ক নম্বরসংবলিত পিলারের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পর তিনি এ বক্তব্য দেন।

মন্ত্রী বলেন, নগরীতে আগত মানুষ যাতে সহজেই সড়ক ও বাসাবাড়ি শনাক্ত করতে পারেন, সেই লক্ষ্যে প্রতিটি সড়কের নামকরণ ও নম্বরকরণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উন্নত ও আধুনিক শহরগুলোর আদলে রাজশাহীতে এ ব্যবস্থা চালুর কাজ ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
তাঁর ভাষ্য, সড়কের সুনির্দিষ্ট পরিচিতি নিশ্চিত করা গেলে নগরবাসীর পাশাপাশি বাইরের জেলা থেকে আসা মানুষের চলাচলও সহজ হবে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা চেয়ে মন্ত্রী দ্রুততম সময়ের মধ্যে ৩০টি ওয়ার্ডেই নম্বরকরণের কাজ এগিয়ে নেওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।

রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ বিভিন্ন সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি সরবরাহে ঘাটতি ও মানহীন পণ্য দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে সাংবাদিকেরা প্রশ্ন তোলেন। তাঁরা হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রের (আইসিইউ) একটি লিফট দীর্ঘদিন ধরে চালু না হওয়ার জটিলতা, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্রের শর্ত পূরণ না করার অভিযোগ এবং ক্যানসার হাসপাতালের বর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য বর্জ্য শোধনাগার (এসটিপি) স্থাপনের বিষয়টিও উত্থাপন করেন।
জবাবে মন্ত্রী বলেন, সুনির্দিষ্ট ও আনুষ্ঠানিক অভিযোগ পাওয়া গেলে অবশ্যই তদন্ত করা হবে। গণপূর্তের ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মানহীন পণ্য সরবরাহের অভিযোগের সত্যতা মিললে যথাযথ প্রক্রিয়ায় তদন্ত কমিটি গঠন করে বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।
রামেক হাসপাতালের আইসিইউ লিফট সরবরাহে জালিয়াতির অভিযোগ নিয়ে গণপূর্তের উচ্চ কারিগরি কমিটি আগেই সরেজমিন পরিদর্শন করেছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনে জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেছে বলে জানা গেছে। মন্ত্রী আরও বলেন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করে রাষ্ট্র পরিচালনাই সরকারের মূল লক্ষ্য এবং তাঁর মন্ত্রণালয়ও সেই নীতি অনুসরণ করছে। এর উদাহরণ হিসেবে তিনি সম্প্রতি লটারির মাধ্যমে প্রকৌশলীদের বদলির উদ্যোগের কথা উল্লেখ করেন।

রাজশাহীসহ দেশের বিভিন্ন শহরে বহুতল ভবন নির্মাণ এবং ভবনের ছাদে অনুমোদনবহির্ভূত স্থাপনা তৈরির বিষয়ে মন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাংবাদিকেরা। জবাবে তিনি জানান, এ সংক্রান্ত বিধিমালা প্রণয়নের কাজ চলছে। বিষয়টি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের পর পুনর্বিবেচনার জন্য স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, আইনমন্ত্রী ও তাঁকে নিয়ে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে।
মন্ত্রীর ভাষ্য, বিধিমালা চূড়ান্ত হলে উন্নয়ন কর্তৃপক্ষগুলো আইন বাস্তবায়নে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে। ভবিষ্যতে কেউ আইন অমান্য করে ভবন নির্মাণ বা অন্য কোনো অনিয়ম করলে তাঁর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

আলোচনায় রাজশাহী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (আরডিএ) জনবল ও সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা এবং দায়িত্ব পালনে কর্মকর্তাদের প্রতিবন্ধকতার প্রসঙ্গও আসে। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী জানান, আরডিএর চেয়ারম্যানকে হুমকি দেওয়ার বিষয়টি তাঁর জানা আছে এবং এ ধরনের ঘটনায় প্রশাসনিক পর্যায়ে পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে। ভবিষ্যতে কেউ আইন প্রয়োগে বাধা সৃষ্টি করলে তাঁকে আইনের আওতায় আনা হবে বলেও আশ্বাস দেন তিনি।

এর আগে রাজশাহীতে পৌঁছালে শাহ মখদুম বিমানবন্দরে মন্ত্রীকে ফুলেল শুভেচ্ছায় বরণ করেন রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মাহফুজুর রহমান রিটন। এ সময় তাঁরা শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করেন।
সিটি করপোরেশনের পক্ষে উপস্থিত ছিলেন প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রেজাউল করিম, সচিব সোহেল রানা, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী খায়রুল বাকের ও নির্বাহী প্রকৌশলী (উন্নয়ন) মাহমুদুর রহমান ইমনসহ অন্য কর্মকর্তারা।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন বোয়ালিয়া থানা (পশ্চিম) বিএনপির সভাপতি শামসুল হোসেন মিলু, বোয়ালিয়া থানা (পূর্ব) বিএনপির সভাপতি আশরাফুল ইসলাম নিপু, রাজপাড়া থানা বিএনপির সভাপতি মিজানুর রহমান মিজান, কাশিয়াডাঙ্গা থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মজিউল আহসান হিমেল, মতিহার থানা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আল মামুন বাবু, শাহ মখদুম থানা বিএনপির সদস্যসচিব নাসিম খান, চন্দ্রিমা থানা বিএনপির সদস্যসচিব মনিরুল ইসলাম জনি এবং মহানগর বিএনপির ভারপ্রাপ্ত দপ্তর সম্পাদক মুঈদুর রহমান মঈদসহ বিএনপি ও এর অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা।

সড়ক চিহ্নিতকরণ, সরকারি নির্মাণকাজে মান নিশ্চিত করা এবং ভবন নির্মাণে আইন প্রয়োগের বিষয়ে মন্ত্রীর বক্তব্য নগর উন্নয়নে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার গুরুত্বকেই সামনে এনেছে। তবে এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে পরিকল্পনার সময়মতো বাস্তবায়ন, অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতার ওপর।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, ঘোষিত উদ্যোগগুলো বাস্তবায়িত হলে রাজশাহীতে ঠিকানা শনাক্তকরণ ও যাতায়াত সহজ হবে, সরকারি প্রকল্পে গুণগত মান বাড়বে এবং পরিকল্পিত নগরায়ণের পথের বাধাগুলো দূর হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *