রূপপুরে বিদ্যুৎ আসার অপেক্ষায় বাংলাদেশ

নিজস্ব প্রতিবেদক:

দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিচ্ছে বাংলাদেশ। প্রায় ১৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয়ে নির্মিত ২ দশমিক ৪ গিগাওয়াট ক্ষমতার এই প্রকল্পটি চালু হলে দেশের দীর্ঘদিনের বিদ্যুৎ সংকট অনেকটাই কমবে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা। তবে দেশের প্রথম পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে যেমন উচ্ছ্বাস রয়েছে, তেমনি নিরাপত্তা নিয়ে রয়েছে উদ্বেগও।

নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্ল্যান্ট কোম্পানি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জাহিদুল হাসান জানান, কেন্দ্রটির প্রথম রিঅ্যাক্টর চলতি বছরের শেষ দিকে চালুর পরিকল্পনা রয়েছে। দ্বিতীয় ইউনিটও এর এক বছরের মধ্যে চালু করার লক্ষ্য রয়েছে। পুরোপুরি চালু হলে কেন্দ্রটি দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশের বেশি সরবরাহ করতে সক্ষম হবে বলে জানান তিনি।

রাশিয়ার রাষ্ট্রীয় পরমাণু সংস্থা রোসাটমের সহযোগিতায় নির্মিত রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে একসময় নীরব থাকা এলাকাটিতেও এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। প্রকল্পের কারণে এলাকায় গড়ে উঠেছে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। স্থানীয় দোকান ও রেস্তোরাঁর সাইনবোর্ডে বাংলা ও ইংরেজির পাশাপাশি রুশ ভাষার ব্যবহারও দেখা যাচ্ছে। বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় স্থানীয় খাবারের পাশাপাশি রাশিয়ার ঐতিহ্যবাহী ‘বর্শ’ স্যুপও পাওয়া যাচ্ছে।

প্রকল্পের কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়ায় অনেক স্থানীয় বাসিন্দাই নিজ এলাকায় ফিরে এসেছেন। ২৮ বছর বয়সী মো. ইমন খান ঢাকার একটি তৈরি পোশাক কারখানার চাকরি ছেড়ে রূপপুরে ফিরে এসে বিদ্যুৎকেন্দ্রের শ্রমিকদের কাছে ফল ও শাকসবজি বিক্রি করছেন। তিনি জানান, সামান্য রুশ ভাষা বলতে পারেন এবং রুশ কর্মীরাও কিছুটা বাংলা বলতে পারেন।

রূপপুরে কর্মরত রুশ ইন্সটলেশন টেকনিশিয়ান আলেকজান্দার ভ্লাদিমিরোভিচ স্কভোর্তসোভ জানান, তুরস্ক বা বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ থাকলেও তিনি রূপপুরকে বেছে নেন। ২০২৪ সালে পরিবার নিয়ে তিনি বাংলাদেশে আসেন। তার ভাষ্য, রূপপুরের নির্মাণকাজ দেখে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন এখানে অনেক কাজ বাকি রয়েছে। প্রকল্পটি তার জীবন ও চিন্তাভাবনায় পরিবর্তন এনেছে বলেও জানান তিনি।

স্থানীয় তরুণদের মধ্যেও বিদ্যুৎকেন্দ্রকে ঘিরে তৈরি হয়েছে ভবিষ্যতে কাজের প্রত্যাশা। ১৫ বছর বয়সী শিক্ষার্থী মোহাম্মদ নাফিজ জানান, রূপপুরের কারণে তাদের এলাকা বিশ্বজুড়ে পরিচিতি পাচ্ছে। প্রকৌশল বিষয়ে পড়াশোনা শেষ করে বন্ধুদের সঙ্গে এই বিদ্যুৎকেন্দ্রে কাজ করার স্বপ্ন রয়েছে তার।

নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ

তবে প্রকল্প নিয়ে স্থানীয়দের সবাই পুরোপুরি আশ্বস্ত নন। বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে প্রায় ১৫ মিনিট হাঁটার দূরত্বে বসবাসকারী ৮০ বছর বয়সী সাবেক কাগজকল শ্রমিক মো. ইউনুস আলী ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগের কথা জানান।

সম্প্রতি কেন্দ্রের একটি কম্প্রেসার পরীক্ষার সময় বিকট শব্দে ঘুমন্ত শিশুরাও ভয় পেয়ে জেগে ওঠে বলে জানান তিনি। নিজের জীবনের চেয়ে সন্তান ও নাতি-নাতনিদের নিরাপত্তা নিয়েই বেশি চিন্তিত বলে জানান এই প্রবীণ বাসিন্দা।

অন্যদিকে রূপপুর কর্তৃপক্ষের দাবি, আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা মানদণ্ড এবং অতীতের পারমাণবিক দুর্ঘটনা থেকে পাওয়া শিক্ষা বিবেচনায় নিয়ে প্রকল্পটিতে প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা অনুসরণ করা হয়েছে।

তবে বিতর্ক ও উদ্বেগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের বড় প্রত্যাশা, কেন্দ্রটি কবে থেকে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ শুরু করবে। ৫৫ বছর বয়সী কৃষক বেলী বেগম দ্রুত বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালুর প্রত্যাশা জানিয়ে বলেন, তারা যেন এর পূর্ণ সুবিধা পান। বাড়ির কাছেই বিদ্যুৎকেন্দ্র হওয়ায় ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ পাওয়ার আশাও প্রকাশ করেন তিনি।

দীর্ঘ পথ পেরিয়ে রূপপুর

রূপপুরে পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পরিকল্পনা প্রথম নেওয়া হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন সরকারের আমলে ফ্রান্স, সৌদি আরব, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে আলোচনা হলেও কোনো চূড়ান্ত চুক্তি হয়নি।

শেষ পর্যন্ত ২০১৫ সালে রাশিয়ার সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষরের পর ২০১৭ সালে প্রকল্পটির নির্মাণকাজ আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়। তবে কোভিড-১৯ মহামারি, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এবং সরঞ্জাম পরিবহনে জটিলতার কারণে প্রকল্পের কাজ কয়েক দফা পিছিয়ে যায়।

এ ছাড়া রূপপুর প্রকল্পকে ঘিরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। তবে তারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *