রোয়াংছড়ি স্টেশনে মাদকের স্বর্গরাজ্য: জিম্মি এলাকাবাসী, থানায় অভিযোগ দায়ের, দ্রুত অভিযানের দাবি

বান্দরবান প্রতিনিধি:

বান্দরবান পৌরসভা এলাকার ২ নম্বর ওয়ার্ডের রোয়াংছড়ি স্টেশন এলাকায় দিন দিন ভয়াবহ আকার ধারণ করছে মাদক ব্যবসা ও সেবনের প্রবণতা। স্থানীয়দের অভিযোগ, হাত বাড়ালেই মিলছে মরণনেশা ইয়াবা, গাঁজা ও চোলাই মদ। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা কোনো ধরনের তোয়াক্কা না করেই একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। ফলে পুরো এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয়েছে আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতা। বিশেষ করে তরুণ ও কিশোরদের একটি বড় অংশ মাদকের ভয়াল ছোবলে বিপথগামী হয়ে পড়ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, রোয়াংছড়ি স্টেশন এলাকা বর্তমানে মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থলে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যা নামার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রকাশ্যে চলে মাদক কেনাবেচা ও সেবনের আসর। এর ফলে এলাকার স্বাভাবিক সামাজিক পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অভিভাবকদের মধ্যে বিরাজ করছে চরম উদ্বেগ, কারণ তাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে তারা শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন।

নেপথ্যে দুই সহোদর রাসেল ও আরাফাত, থানায় লিখিত অভিযোগ

অনুসন্ধানে এবং বান্দরবান সদর থানায় দায়ের করা লিখিত অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, রোয়াংছড়ি স্টেশন এলাকায় সক্রিয় মাদক সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে কাজ করছে ২ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সাইদুল হকের দুই ছেলে—রাসেল ও আরাফাত। স্থানীয়দের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে তারা একটি সংঘবদ্ধ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে এলাকায় মাদক ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছে।

তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ দায়ের করেছেন একই এলাকার বাসিন্দা রঞ্জিত বড়ুয়া ও সাজিদা বড়ুয়ার ছেলে রনি। অভিযোগপত্রে রাসেল ও আরাফাতকে বিবাদী করা হয়েছে। অভিযোগকারী রনি দাবি করেন, এই দুই সহোদর এবং তাদের সহযোগীদের নিয়ন্ত্রণে এলাকায় দিন-রাত সমানতালে মাদক ব্যবসা চলছে। শুধু মাদক বিক্রিই নয়, তাদের বিরুদ্ধে ভয়ভীতি প্রদর্শন, হুমকি এবং প্রতিবাদকারীদের ওপর নির্যাতনেরও অভিযোগ রয়েছে।

প্রতিবাদ করলেই হুমকি ও নির্যাতনের অভিযোগ

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, মাদক ব্যবসায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কেউ মুখ খুলতে সাহস পান না। কারণ, প্রতিবাদ করলেই বিভিন্নভাবে হুমকি, ভয়ভীতি ও হয়রানির শিকার হতে হয়। এমনকি অনেকেই নিরাপত্তার স্বার্থে প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী জানান, মাদক ব্যবসায়ীদের একটি শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে উঠেছে, যার কারণে সাধারণ মানুষ কার্যত জিম্মি হয়ে পড়েছেন। তারা বলেন, প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ না থাকলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

যুবসমাজ ধ্বংসের মুখে, উদ্বিগ্ন অভিভাবকরা

স্থানীয়দের অভিযোগ, এলাকার বহু তরুণ ও কিশোর সহজেই মাদকের সংস্পর্শে চলে যাচ্ছে। স্কুল-কলেজপড়ুয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যেও মাদকের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। ফলে সামাজিক অবক্ষয়, অপরাধ প্রবণতা এবং পারিবারিক অশান্তি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

একজন প্রবীণ বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “রোয়াংছড়ি স্টেশন এখন মাদকের সম্রাটদের অভয়ারণ্য হয়ে গেছে। প্রতিদিন নতুন নতুন তরুণ মাদকের ফাঁদে জড়িয়ে পড়ছে। আমরা আমাদের সন্তানদের ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর উদ্বেগে আছি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে পুরো প্রজন্ম ধ্বংস হয়ে যাবে।”

আরেকজন বাসিন্দা বলেন, “আমরা কোনো রাজনৈতিক বিভাজন চাই না। দল-মত নির্বিশেষে সবাই মাদকমুক্ত একটি নিরাপদ পরিবেশ চাই। প্রশাসনের কাছে আমাদের একটাই দাবি—মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।”

প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা

থানায় অভিযোগ দায়েরের পর ভুক্তভোগী ও স্থানীয়রা আশা করছেন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দ্রুত বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করবে এবং অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে। তারা এলাকার শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখা, সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এলাকাবাসীর দাবি

রোয়াংছড়ি স্টেশন এলাকার বাসিন্দাদের জোর দাবি, বান্দরবান সদর থানায় দায়েরকৃত অভিযোগের ভিত্তিতে রাসেল, আরাফাতসহ মাদক সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত সকল ব্যক্তিকে দ্রুত গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হোক। একইসঙ্গে এলাকায় নিয়মিত অভিযান পরিচালনা, মাদক বিক্রির স্পটগুলো চিহ্নিত করে বন্ধ করা এবং পুরো এলাকাকে স্থায়ীভাবে মাদকমুক্ত ঘোষণা করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন তারা।

এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে রোয়াংছড়ি স্টেশনকে মাদক ব্যবসার অভয়ারণ্য থেকে একটি নিরাপদ ও বসবাসযোগ্য এলাকায় পরিণত করা হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *