লামায় বন ধ্বংসের মাস্টারমাইন্ড কে এই কবির? ডেপুটি রেঞ্জারের নিজস্ব সিন্ডিকেটে ‘সিল মারা’ সেগুন গাছ পাচারের জালিয়াতি ফাঁস!

মো. রাসেল:

পাহাড়ের সবুজ ফুসফুসখ্যাত বান্দরবানের লামা বনাঞ্চলে এখন চলছে মূল্যবান সেগুন গাছ উজাড়ের মহোৎসব। তবে সাধারণ কোনো চোরাকারবারি নয়, খোদ বন রক্ষার প্রধান দায়িত্বে থাকা ডেপুটি রেঞ্জার কে এম কবিরের নিজস্ব নেতৃত্বেই এই অঞ্চলে গড়ে উঠেছে এক শক্তিশালী ও বেপরোয়া গাছ পাচার সিন্ডিকেট। বনাঞ্চল রক্ষা করার বদলে সরকারি পদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিজেই এখন বনের মূল ধ্বংসকারীতে পরিণত হয়েছেন বলে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। তাঁর প্রত্যক্ষ ইশারা, লাইসেন্সবিহীন প্রশ্রয় এবং পকেট সিন্ডিকেটের কারণেই প্রতিদিন নির্বিচারে পাচার হয়ে যাচ্ছে সংরক্ষিত বনের শতবর্ষী ও দামি সেগুন কাঠ।

টিপি চেকিংয়ে রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্পে জালিয়াতি ফাঁস, দুই ট্রাক সেগুন কাঠ আটক

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ২২ জুন ২০২৬ তারিখ রাতে মূল্যবান গোল সেগুন কাঠবোঝাই দুটি বিশালাকার ট্রাক ট্রান্সপোর্ট পারমিট (TP) পরীক্ষা করার উদ্দেশ্যে রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্পে যায়। সেখানে দায়িত্বরত সেনাসদস্যরা তল্লাশির সময় কাঠ পরিবহনের বৈধ কাগজপত্র দেখতে চান। কিন্তু তল্লাশিকালে ট্রাকে থাকা ব্যক্তিরা কোনো সঠিক ও বৈধ কাগজপত্র দেখাতে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। সেনাবাহিনীর সতর্ক ও তীক্ষ্ণ জেরার মুখে মুহূর্তেই ফেঁসে যায় চোরাকারবারিরা। বেরিয়ে আসে যে, সংরক্ষিত বনের সেগুন গাছগুলো সম্পূর্ণ অবৈধ পন্থায় পাচারের উদ্দেশ্যে ভুয়া ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছিল।

ডেপুটি রেঞ্জার কবিরের জালিয়াতি ও সরকারি ‘সিল’ কারসাজির সহযোগী ফরেস্ট জুলহাস

এই ঘটনার সবচেয়ে বিস্ফোরক ও চাঞ্চল্যকর দিক হলো, আটককৃত চোরাই সেগুন গাছগুলোর গায়ে বন বিভাগের অফিসিয়াল ‘হাতুড়ি সিল’ বা মার্কিং মারা ছিল। সরকারি বিধি মোতাবেক, কোনো গাছের গায়ে বন বিভাগের সিল থাকার অর্থ হলো সেটি সম্পূর্ণ আইনসম্মত এবং বৈধ। কিন্তু সেনাবাহিনীর হাতে আটক হওয়া দুই ট্রাক গাছের কাগজপত্র যেখানে ভুয়া প্রমাণিত হলো, সেখানে খোদ বন বিভাগের নিজস্ব সিল কীভাবে এলো—তা নিয়ে আর কোনো রহস্য বাকি নেই।

স্থানীয় ও নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, ডেপুটি রেঞ্জার কে এম কবিরের সরাসরি নির্দেশে এবং তাঁর বিশ্বস্ত সহযোগী ফরেস্ট জুলহাসের সরাসরি ফিল্ডওয়ার্ক বা যোগসাজশের মাধ্যমেই এই সরকারি সিলের অপব্যবহার করা হয়েছে। চোরাকারবারিদের হাতে সরকারি সিল তুলে দেওয়া কিংবা নিজেই সিল মেরে অবৈধ কাঠকে বৈধতা দেওয়ার এই পুরো প্রক্রিয়ার মাস্টারমাইন্ড খোদ কবির এবং তাঁর মাঠপর্যায়ের বিশ্বস্ত ঘুঁটি ফরেস্ট জুলহাস।

তীব্র ক্ষোভের মুখে বন বিভাগের এই সিন্ডিকেট

লামার স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবেশবাদীদের অভিযোগ, কে এম কবির এই অঞ্চলে দায়িত্ব নেওয়ার পর এবং ফরেস্ট জুলহাসকে সঙ্গে নিয়ে পকেট সিন্ডিকেট গড়ে তোলার পর থেকেই বনের গাছ চুরি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। নিয়মিত টহল বন্ধ রাখা এবং সিন্ডিকেটের সদস্যদের নির্বিঘ্নে পথ করে দেওয়ার কারণেই একের পর এক বনাঞ্চল ন্যাড়া হয়ে যাচ্ছে। ২২ জুন রাতে দুই ট্রাক সেগুন গাছ আটকের পর স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের সেই আশঙ্কাই সত্যে পরিণত হলো। সরকারি সিল মারা কাঠ পাচারের মতো এমন চরম জালিয়াতি চক্রের নেতৃত্ব দেওয়ার কারণে তীব্র ক্ষোভ ও সমালোচনার মুখে পড়েছে এই চক্রটি।

হুমকিতে পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য

এই পকেট সিন্ডিকেটের কারণে পাহাড়ের বুক থেকে একের পর এক মূল্যবান সেগুন গাছ কেটে পাচার করার ফলে লামা অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য সম্পূর্ণ ধ্বংসের মুখে। বনের ভেতর বন্যপ্রাণীর খাদ্য ও আবাসস্থল সংকুচিত হওয়ায় প্রায়ই লোকালয়ে বন্য হাতির আক্রমণ বাড়ছে। একই সঙ্গে বর্ষা মৌসুমে ভয়াবহ পাহাড়ধস ও আকস্মিক বন্যার চরম ঝুঁকিতে রয়েছে স্থানীয় সাধারণ মানুষ।

রূপসীপাড়া আর্মি ক্যাম্পের এই সফল অভিযানের পর নড়েচড়ে বসেছে সচেতন মহল। তারা অবিলম্বে এই বনদস্যু সিন্ডিকেটের মূল হোতা ডেপুটি রেঞ্জার কে এম কবির এবং তাঁর সহযোগী ফরেস্ট জুলহাসকে সাময়িক বরখাস্ত করে উচ্চপর্যায়ের বিভাগীয় তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানিয়েছেন।

এই জালিয়াতি সিন্ডিকেটের নেপথ্যে কবির ও জুলহাসের সঙ্গে আর কোন কোন প্রভাবশালী মহলের হাত রয়েছে? কোন কোন রুটে যাচ্ছে এই চোরাই সেগুন কাঠ? তা জানতে অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। বিস্তারিত তথ্য, গোপন নথিপত্র এবং মাঠপর্যায়ের প্রমাণসহ চোখ রাখুন আমাদের পরবর্তী প্রতিবেদনে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *