আজ মহান মে দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের এক গৌরবময় ও রক্তস্নাত ইতিহাসের দিন। প্রতি বছরের মতো এবারও নানা আয়োজনে দিনটি পালিত হচ্ছে। কিন্তু উৎসবের আড়ালে একটি প্রশ্ন বারবার সামনে আসছে শ্রমিকের রক্তে লেখা সেই ইতিহাসের প্রতিশ্রুতি কি আদৌ পূরণ হয়েছে?
🛅 যে ইতিহাস ভোলার নয়💠
মে দিবসের ইতিহাস শুধু একটি দিবসের ইতিহাস নয়, এটি লক্ষ শ্রমিকের রক্ত, ঘাম ও আত্মত্যাগের ইতিহাস। উনিশ শতকের শেষভাগে যুক্তরাষ্ট্রে শিল্পবিপ্লবের জোয়ারে কারখানাগুলোতে উৎপাদন বাড়লেও শ্রমিকদের জীবন ছিল চরম দুর্বিষহ। দিনে ১২ থেকে ১৬ ঘণ্টা পর্যন্ত হাড়ভাঙা পরিশ্রম করতে হতো, মজুরি ছিল নামমাত্র আর কর্মস্থলে নিরাপত্তার কোনো বালাই ছিল না। শ্রমিকদের এই মানবেতর জীবনযাপনের বিরুদ্ধে সংগঠিত হতে শুরু করেন শ্রমিক নেতারা।
১৮৮৬ সালের ১ মে যুক্তরাষ্ট্রজুড়ে প্রায় ৩ লাখ শ্রমিক একযোগে ধর্মঘটে নামেন। ৮ ঘণ্টা কর্মদিবসের দাবিতে মিছিল, সমাবেশ আর ধর্মঘটে উত্তাল হয়ে ওঠে গোটা দেশ। শিকাগো হয়ে ওঠে সেই আন্দোলনের প্রাণকেন্দ্র।
৩ মে শিকাগোর ম্যাককরমিক কারখানার সামনে ধর্মঘট ভাঙতে বিকল্প শ্রমিক ঢোকানো হলে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা প্রতিবাদ জানান। পুলিশ গুলি চালালে অন্তত ৬ জন শ্রমিক ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান। এই নির্মম হত্যাকাণ্ড শ্রমিকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বালিয়ে দেয়।
পরদিন ৪ মে হে-মার্কেট স্কয়ারে শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ সমাবেশ চলাকালে হঠাৎ একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। এরপর পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালালে বহু শ্রমিক নিহত ও আহত হন। ঘটনার জের ধরে ৮ জন শ্রমিক নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়। সরাসরি কোনো প্রমাণ না থাকলেও পক্ষপাতদুষ্ট বিচারপ্রক্রিয়ায় তাঁদের মধ্যে ৪ জনকে ফাঁসিতে ঝোলানো হয়। এই কলঙ্কিত বিচার পরবর্তীতে ১৮৯৩ সালে ইলিনয়ের গভর্নর নিজেই অন্যায় বলে স্বীকার করেন।
শিকাগোর সেই শ্রমিকদের আত্মত্যাগের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৮৮৯ সালে প্যারিসে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক সমাজতান্ত্রিক সম্মেলনে ১ মে-কে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। সেই রক্তের বিনিময়েই আজ আমরা পেয়েছি ৮ ঘণ্টার কর্মদিবস, ন্যায্য মজুরি ও নিরাপদ কর্মপরিবেশের অধিকার।
💠 বাংলাদেশের বাস্তব চিত্র উন্নয়নের আড়ালে শ্রমিকের কান্না💠
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক শিল্প, নির্মাণ, পরিবহন ও কৃষিখাতে কোটি কোটি শ্রমিক প্রতিদিন ঘাম ঝরাচ্ছেন। দেশের রপ্তানি আয়ের সিংহভাগ আসছে তাঁদের হাতের ছোঁয়ায়। দেশের অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে তাঁদের যে অবদান, তা কোনোভাবেই অস্বীকার করার সুযোগ নেই। কিন্তু এই বিশাল অবদান রাখা মানুষগুলোর জীবনের নিরাপত্তা আজও গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ।
অনেক কারখানা ও কর্মস্থলে নিরাপত্তামান যথাযথভাবে মানা হয় না। অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধস ও যন্ত্রপাতির ত্রুটিতে প্রতি বছর ঝরছে অসংখ্য তাজা প্রাণ। কম মজুরি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা এবং সামাজিক সুরক্ষার অভাব এখনো বহু শ্রমিকের নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে। এসব দুর্ঘটনা কেবল কিছু প্রাণহানির পরিসংখ্যান নয়, প্রতিটি মৃত্যু ভেঙে দেয় একটি পরিবারের সমস্ত স্বপ্ন ও ভবিষ্যৎ।
কর্মস্থলের নিরাপত্তা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক মানবাধিকার। একজন শ্রমিক যখন কাজে যোগ দেন, তখন তাঁর জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মালিকপক্ষের আইনগত ও নৈতিক উভয় দায়িত্ব। কিন্তু বাস্তবে সেই দায়িত্ব বারবার উপেক্ষিত হচ্ছে।
🔴সমস্যার শিকড় কোথায়?
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কর্মস্থলের নিরাপত্তাহীনতার পেছনে একাধিক কারণ দায়ী।
*🔸প্রথম কারণ হলো মালিকপক্ষের মুনাফামুখী মানসিকতা।ব্যয় কমাতে গিয়ে নিরাপত্তা সরঞ্জাম, প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিনিয়োগ এড়িয়ে যাওয়া হয়। স্বল্পমেয়াদি মুনাফার লোভে দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির কথা ভাবা হয় না।
*🔸দ্বিতীয় কারণ হলো শ্রম আইন বাস্তবায়নে দুর্বলতা।* দেশে শ্রম আইন থাকলেও তার যথাযথ প্রয়োগ নেই। তদারকির অভাব ও দুর্নীতি মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে। অনেক ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনকারী প্রতিষ্ঠান বছরের পর বছর পার পেয়ে যাচ্ছে।
*🔸তৃতীয় কারণ হলো শ্রমিকদের সচেতনতার অভাব।* অনেক শ্রমিক নিজেদের আইনগত অধিকার সম্পর্কে অবগত নন। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশেও তাঁরা প্রতিবাদ না করে নীরবে কাজ করে যান। জীবিকার ভয়ে মুখ বন্ধ রাখেন।
🔹 সমাধান কোন পথে?
বিশ্লেষকদের মতে, শ্রমিকের প্রকৃত নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সরকার, মালিকপক্ষ ও শ্রমিক তিন পক্ষের সমন্বিত ও আন্তরিক উদ্যোগ এখন সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি।
শ্রম আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে এবং নিয়মিত কারখানা পরিদর্শন ও মনিটরিং নিশ্চিত করতে হবে, যাতে কোনো প্রতিষ্ঠান নিরাপত্তাবিধি লঙ্ঘন করে পার পেতে না পারে। অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, জরুরি নির্গমনপথ ও সুরক্ষাসরঞ্জাম সকল কর্মস্থলে বাধ্যতামূলক করতে হবে। শ্রমিকদের নিরাপত্তা প্রশিক্ষণ ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম নিয়মিতভাবে পরিচালনা করতে হবে, কারণ সচেতন শ্রমিকই পারেন নিজের নিরাপত্তা নিজে নিশ্চিত করতে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো মালিকদের মানসিকতার পরিবর্তন। তাঁদের বুঝতে হবে, নিরাপত্তায় বিনিয়োগ কোনো অতিরিক্ত ব্যয় নয় এটি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও মুনাফা বৃদ্ধির হাতিয়ার। নিরাপদ পরিবেশে কাজ করলে শ্রমিকের মনোযোগ ও দক্ষতা বাড়ে, ফলে শিল্পও লাভবান হয়।
সর্বোপরি, শ্রমিককে কেবল উৎপাদনের হাতিয়ার হিসেবে নয়, একজন পূর্ণ মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করতে হবে। সমাজের প্রতিটি স্তরে তাঁদের প্রতি সম্মান ও সহানুভূতির মনোভাব গড়ে তুলতে হবে।
💠 মে দিবসের প্রকৃত অঙ্গীকার💠
মে দিবস কেবল একটি আনুষ্ঠানিক উদযাপনের দিন নয় এটি একটি জাতীয় দায়বদ্ধতার দিন, একটি গভীর অঙ্গীকারের দিন। শ্রমিকের অধিকার কখনো বিনামূল্যে পাওয়া যায়নি, তা অর্জিত হয়েছে রক্ত, ঘাম ও অগণিত মানুষের আত্মত্যাগের বিনিময়ে। আজ আমরা যে ৮ ঘণ্টার কর্মদিবস ভোগ করি, তার পেছনে রয়েছে শিকাগোর সেই শহিদ শ্রমিকদের জীবনদান।
যতদিন একজনও শ্রমিক অনিরাপদ কর্মস্থলে প্রাণ হারাবেন, যতদিন একজনও শ্রমিক ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত থাকবেন ততদিন মে দিবসের প্রকৃত বিজয় অর্জিত হয়নি বলেই মনে করছেন সচেতন মহল।
প্রতিটি কর্মস্থলকে নিরাপদ, স্বাস্থ্যসম্মত ও মানবিক পরিবেশে রূপান্তর করা গেলেই শিকাগোর সেই শহিদ শ্রমিকদের আত্মত্যাগ সত্যিকার অর্থে সম্মানিত হবে। শ্রমিকের মর্যাদা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই হোক এবারের মে দিবসের সবচেয়ে বড় অঙ্গীকার।
লেখক : সাংবাদিক ও কলামিস্ট মোঃআনজার শাহ
সহ-দপ্তর সচিব, জাতীয় সাংবাদিক সংস্থা, কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ।
যুগ্ম সম্পাদক :বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড প্রেস সোসাইটি,কেন্দ্রীয় কমিটি।