মোঃআনজার শাহ
কুমিল্লা বিমানবন্দরের রানওয়েতে দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে ওঠানামা করে না কোনো যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ। নেই যাত্রীর কোলাহল, নেই উড্ডয়ন-অবতরণের চিরচেনা ব্যস্ততা। দীর্ঘ নিস্তব্ধতায় রানওয়ের কোথাও কোথাও আগাছা ও ঝোপঝাড়ে ঢেকে গেছে, এমনকি বিমানবন্দরের অভ্যন্তরের কিছু অংশে গড়ে উঠেছে কৃষিজমিও। বাইরে থেকে দেখলে পরিত্যক্ত মনে হলেও বাস্তবে এর কার্যক্রম পুরোপুরি স্তব্ধ হয়ে যায়নি আকাশপথে চলাচলকারী উড়োজাহাজকে নেভিগেশন সেবা দিয়ে নিয়মিতভাবে রাজস্ব আয় করে চলেছে এই বিমানবন্দর।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের স্মৃতি বহনকারী স্থাপনা:
কুমিল্লা নগরের ঢুলিপাড়া, নেউরা ও রাজাপাড়া এলাকাজুড়ে প্রায় ৭৭ একর জমির ওপর অবস্থিত এই বিমানবন্দরটি নির্মিত হয়েছিল ১৯৪০ সালে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে। পরবর্তী সময়ে এটি যাত্রীবাহী ফ্লাইট পরিচালনার জন্য ব্যবহৃত হলেও ১৯৯৪ সালে পুনরায় চালুর মাত্র দুই সপ্তাহের মাথায় যাত্রী সংকটের কারণে বন্ধ হয়ে যায় ফ্লাইট চলাচল। এরপর থেকে পেরিয়ে গেছে দীর্ঘ তিন দশকেরও বেশি সময়।
নিস্তব্ধ রানওয়ে, তবু সচল নেভিগেশন ব্যবস্থা:
যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের চাকা রানওয়ে স্পর্শ না করলেও বিমানবন্দরের নেভিগেশন ব্যবস্থা এখনো পুরোদমে কার্যকর। বর্তমানে এখানে কর্মরত আছেন ২২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। ডিভিওআর (DVOR) ও ডিএমই (DME) নেভিগেশন সিগন্যাল ব্যবহার করে প্রতিদিন ভারত, সিঙ্গাপুর, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের প্রায় ২৫ থেকে ৩০টি উড়োজাহাজ আন্তর্জাতিক আকাশপথে নিয়মিত চলাচল করছে।
সংশ্লিষ্টদের দাবি অনুযায়ী, এই নেভিগেশন সুবিধা থেকেই প্রতি মাসে সরকারের ঘরে জমা হচ্ছে প্রায় চার থেকে পাঁচ কোটি টাকা রাজস্ব। অর্থাৎ রানওয়েতে যাত্রীবাহী বিমান না নামলেও কুমিল্লা বিমানবন্দরের আকাশপথ কেন্দ্রিক কার্যক্রম থেকে সরকারের আয় থেমে নেই।
প্রয়োজন সংস্কার ও আধুনিকায়ন:
কুমিল্লা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান উদবাতুল বারী আবু বলেন, কুমিল্লা বিমানবন্দর কেবল একটি দীর্ঘদিনের অব্যবহৃত রানওয়ের নাম নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে এই অঞ্চলের মানুষের বহু বছরের লালিত স্বপ্ন, সম্ভাবনা ও অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার আকাঙ্ক্ষা। তিনি বলেন, বিমানবন্দরটিকে পুনরায় যাত্রীসেবায় ফিরিয়ে আনতে হলে প্রথমেই রানওয়ের প্রয়োজনীয় সংস্কার ও আধুনিকায়ন করতে হবে। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থা, নিয়ন্ত্রণ টাওয়ারে আধুনিক ভিএইচএফ যোগাযোগব্যবস্থা এবং উড্ডয়ন-অবতরণের জন্য প্রয়োজনীয় অন্যান্য অবকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, শুধু রানওয়ে সংস্কার করলেই চলবে না; এর আশপাশের সামগ্রিক পরিবেশ ও নিরাপত্তাও পরিকল্পিতভাবে সাজাতে হবে। টেক-অফ ও ল্যান্ডিং এলাকার আশপাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা ভবনগুলো ভবিষ্যতে বিমান চলাচলের নিরাপত্তার জন্য বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে পারে। তাই সমন্বিত পরিকল্পনা, যথাযথ অবকাঠামো ও দীর্ঘমেয়াদি বাস্তবায়ন উদ্যোগের মাধ্যমে কুমিল্লা বিমানবন্দরকে আধুনিক ও নিরাপদ বিমানবন্দরে রূপান্তর করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার:
কুমিল্লা দেশের অন্যতম প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা। একই সঙ্গে এখানে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পকারখানা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডও দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে। ফলে কুমিল্লা বিমানবন্দর পুনরায় চালু হলে শুধু কুমিল্লার মানুষই নয়, বরং বৃহত্তর কুমিল্লা অঞ্চলের প্রবাসী, ব্যবসায়ী, বিনিয়োগকারী ও সাধারণ যাত্রীদের যোগাযোগব্যবস্থায়ও নতুন গতি সঞ্চার হতে পারে।
বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, বিমানবন্দরটি চালু হলে রাজধানী ঢাকার ওপর অভ্যন্তরীণ যাতায়াতের চাপ কিছুটা কমার পাশাপাশি কুমিল্লাকে ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্য, পর্যটন ও বিনিয়োগের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে প্রবাসী-অধ্যুষিত এই জেলার মানুষের আন্তর্জাতিক যোগাযোগ আরও সহজ ও সাশ্রয়ী হতে পারে।
৭৭ একরের বিমানবন্দর, আকাশপথে এখনো সচল:
কুমিল্লা নগরীর মূল শহর থেকে মাত্র ৩ দশমিক ৩ কিলোমিটার দূরে ৭৭ একর জমির ওপর অবস্থিত এই অভ্যন্তরীণ বিমানবন্দরটি দীর্ঘ ৩২ বছর ধরে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজ ওঠানামা ছাড়াই পড়ে থাকলেও এর নেভিগেশনাল সুবিধা আন্তর্জাতিক আকাশপথে উড়োজাহাজ চলাচলে এখনো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছে। ডিভিওআর ও ডিএমই সিগন্যাল ব্যবহারের মাধ্যমে বিমানবন্দরটি নিয়মিত রাজস্ব আয় অব্যাহত রেখেছে, ফলে যাত্রীবাহী ফ্লাইট বন্ধ থাকলেও এর কার্যক্রম পুরোপুরি থেমে নেই।
স্থানীয়দের দীর্ঘদিনের দাবি প্রয়োজনীয় সংস্কার, আধুনিকায়ন ও পরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে কুমিল্লা বিমানবন্দরকে পুনরায় যাত্রীসেবায় ফিরিয়ে আনা হোক। যে রানওয়ে তিন দশকের বেশি সময় ধরে যাত্রীবাহী উড়োজাহাজের অপেক্ষায় নিস্তব্ধ পড়ে আছে, সেই রানওয়েতে আবারও একদিন উড্ডয়ন-অবতরণের প্রাণবন্ত ব্যস্ততা ফিরবে এটাই এখন কুমিল্লাবাসীর প্রাণের প্রত্যাশা।