কক্সবাজার প্রতিনিধি:
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে গভীর নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসে লাগা আগুন ৩৩ ঘণ্টার বেশি সময়েও নেভানো সম্ভব হয়নি। মঙ্গলবার (২৭ অক্টোবর) সকাল ৮টার দিকে শুরু হওয়া আগুন বুধবার (২৮ অক্টোবর) বিকেল সাড়ে ৫টা পর্যন্ত জ্বলছিল। আগুন নিয়ন্ত্রণে ফায়ার সার্ভিসের চারটি ইউনিট কাজ করলেও ভূগর্ভ থেকে অবিরাম গ্যাস নির্গত হওয়ায় পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা যাচ্ছে না।
আগুনের শিখা বিদ্যুতের তারে ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। দুর্ঘটনা এড়াতে ঘটনাস্থলের আশপাশের অন্তত ২০০ মিটার এলাকায় মানুষের চলাচল সীমিত করেছে প্রশাসন। এ ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
মঙ্গলবার সকালে উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ইনানী ছোট খাল সেতুর কাছে মোহাম্মদ আবদুল্লাহর বসতভিটায় গভীর নলকূপ স্থাপনের কাজ চলছিল। এ সময় মাটির নিচ থেকে দুর্গন্ধযুক্ত গ্যাস বের হতে শুরু করে। কিছুক্ষণের মধ্যেই সেখানে আগুন ধরে যায়। এরপর থেকে আগুন একটানা জ্বলছে।
পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে মঙ্গলবার রাতে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানির (বাপেক্স) দুই সদস্যের বিশেষজ্ঞ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) এসএম নাফিফুন আরহামের নেতৃত্বে দলটি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। বুধবার সকাল ও দুপুরেও বিশেষজ্ঞরা সেখানে গিয়ে গ্যাসের নির্গমন ও আগুনের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেন, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, ওই এলাকায় প্রাকৃতিক গ্যাস রয়েছে। এ কারণে এলাকাটি নিরাপত্তাবেষ্টনীর আওতায় এনে বাপেক্সকে খবর দেওয়া হয়েছে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এসএম নাফিফুন আরহামের প্রাথমিক ধারণা, নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভের প্রায় এক হাজার ফুট গভীরে গ্যাসের স্তরের কাছাকাছি পৌঁছানো হয়েছিল। সেখান থেকে ভূগর্ভের ফাটল বা ভূতাত্ত্বিক চ্যুতির মধ্য দিয়ে গ্যাস ওপরে উঠে নলকূপের গর্ত দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, গ্যাসের চাপ ও নির্গমনের তীব্রতা বেশি থাকায় সরাসরি আগুন নেভানোর চেষ্টা করলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অন্য স্থানেও আগুন ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। গ্যাসের স্তরের ওপরের অংশ উন্মুক্ত হয়ে গেলে ভূগর্ভের বিভিন্ন ফাটল দিয়ে কয়েক দিন পরও গ্যাস ভূপৃষ্ঠে উঠে আসতে পারে। কোনো উৎস থেকে স্ফুলিঙ্গ তৈরি হয়ে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। মানুষের কর্মকাণ্ড কিংবা বৈদ্যুতিক স্ফুলিঙ্গ থেকেও আগুন লাগতে পারে।
আগুনের রং ও ধোঁয়া দেখে গ্যাসে তুলনামূলক ভারী হাইড্রোকার্বন থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন বাপেক্সের এই কর্মকর্তা। তবে নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষাগারে বিশ্লেষণ না করা পর্যন্ত গ্যাসের প্রকৃতি ও উপাদান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে না। ওই এলাকায় গ্যাসের মজুত আছে কি না, থাকলে কী পরিমাণে রয়েছে, সেটিও এখনো জানা যায়নি।
নাফিফুন আরহাম বলেন, গ্যাসের নির্গমন বন্ধ করতে বা এর চাপ আটকে দেওয়ার চেষ্টা করলে ভূগর্ভের অন্য কোনো দুর্বল স্থান দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আসতে পারে। এতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে। এ কারণে আপাতত মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে সবাইকে দূরে রাখাই গুরুত্বপূর্ণ।
উখিয়ার উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) পান্না আক্তার জানান, বাপেক্সের বিশেষজ্ঞ দলের পরামর্শ অনুযায়ী আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ চলছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করছে উপজেলা প্রশাসন। নিরাপত্তার স্বার্থে ঘটনাস্থল থেকে অন্তত ২০০ মিটার দূরে থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পুলিশ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা লোকজনকে নিরাপদ দূরত্বে সরিয়ে নিচ্ছেন।
উখিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের চারটি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে। স্টেশন কর্মকর্তা সাইদুল ইসলাম জানান, খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে গিয়ে আগুন নেভানোর চেষ্টা শুরু করেন। কিন্তু ভূগর্ভ থেকে অবিরাম গ্যাস বের হওয়ায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়নি। জনবল ও কারিগরি সরঞ্জামের সীমাবদ্ধতার বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পরে বাপেক্স, পেট্রোবাংলাসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকেও বিষয়টি অবহিত করা হয়।
আগুনের শিখা বিদ্যুতের তারে ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে—এ আশঙ্কায় মনখালী থেকে পাটুয়ারটেক পর্যন্ত প্রায় ১৫ কিলোমিটার এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে ওই এলাকার বাসিন্দাদের পাশাপাশি পর্যটন ব্যবসায়ীরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। কখন বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে।
ঘটনাস্থলে থাকা উখিয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সোলতান মাহমুদ চৌধুরী বলেন, সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো বারবার চেষ্টা করেও আগুন নেভাতে পারছে না। সম্প্রতি অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যুর শোক ও আতঙ্ক কাটতে না কাটতেই আবারও আগুনের ঘটনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়েছে।
এর আগে ইনানীর পাটুয়ারটেক এলাকার টুপটুপ রিসোর্টে অগ্নিকাণ্ডে ১০ জনের মৃত্যু হয়। ওই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কাছাকাছি এলাকায় গ্যাসের আগুন জ্বলতে থাকায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় পর্যটন ব্যবসায়ী জাহাঙ্গীর আলম ও আবু সৈয়দ জানান, দূর থেকেও আগুনের শিখা দেখা যাচ্ছে। আগুন কখন নিভবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তায় রয়েছেন এলাকার মানুষ।