মোঃ আনজার শাহ
দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অস্থিরতা, অর্থনৈতিক সংকট ও প্রশাসনিক দুর্বলতা কাটিয়ে দেশকে সঠিক পথে ফিরিয়ে নিতে সরকার নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে বলে জানিয়েছেন গৃহায়ন ও গণপূর্তমন্ত্রী এবং কুমিল্লা-৮ (বরুড়া) আসনের সংসদ সদস্য জাকারিয়া তাহের সুমন। তিনি বলেছেন, সরকারের বয়স মাত্র কয়েক মাস; এত অল্প সময়ে সবকিছু বদলে দেওয়া সম্ভব নয়। তবে কাজের প্রস্তুতি ইতোমধ্যে সম্পন্ন হয়েছে। আগামী ডিসেম্বর থেকে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের দৃশ্যমান অগ্রগতি দেখা যাবে।
আইনের শাসন প্রসঙ্গে মন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দলীয় পরিচয় এমনকি বিএনপির নেতা-কর্মী হলেও অন্যায় করলে কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে এবং সবার জন্য আইন সমানভাবে প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
সম্প্রতি বরুড়ায় স্থানীয় নেতা-কর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় তিনি এসব কথা বলেন।
‘সাত মাসে সব ঠিক করা সম্ভব নয়’:
জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, দীর্ঘ ১৭ বছর পর জনগণ ভোটের মাধ্যমে বিএনপিকে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব দিয়েছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর সরকারকে একটি ভঙ্গুর অর্থনীতি, দুর্বল প্রশাসন এবং নানা সংকটের মুখোমুখি হতে হয়েছে। এসব সমস্যা রাতারাতি সমাধান করা সম্ভব নয়; তবে সরকার সাধ্যমতো আন্তরিকভাবে কাজ করে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, “গত সাত মাসে আমরা মূলত কাজের প্রস্তুতি নিয়েছি। এখন ধীরে ধীরে কাজ দৃশ্যমান হবে। ডিসেম্বর থেকে আপনারা এর বাস্তব চিত্র দেখতে পাবেন।”
মন্ত্রী জানান, যেকোনো সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পরিকল্পনা, প্রশাসনিক অনুমোদন, অর্থসংস্থান ও টেন্ডারসহ বিভিন্ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। এর সঙ্গে বর্ষা মৌসুমের বিষয়টিও জড়িত। শুষ্ক মৌসুম শুরু হলে সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের কাজ আরও দৃশ্যমানভাবে এগিয়ে নেওয়া হবে।
লালমাই-বরুড়া সড়ক হবে ২৪ ফুট:
বরুড়ার সড়ক যোগাযোগ উন্নয়নের বিষয়ে গণপূর্তমন্ত্রী জানান, লালমাই–বরুড়া সড়কটি ১৮ ফুট থেকে ২৪ ফুটে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রকল্পের টেন্ডার প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে।
পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) আওতাধীন ইউনিয়ন পর্যায়ের ছোট-বড় বিভিন্ন সড়ক উন্নয়নের জন্যও প্রকল্প চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে বরুড়ার সঙ্গে আশপাশের উপজেলা ও গুরুত্বপূর্ণ জনপদের যোগাযোগব্যবস্থা আরও সহজ ও গতিশীল হবে।
এর আগে বরুড়ার ছোট-বড় প্রায় ৩০০টি সড়ক বিভিন্ন প্রকল্পের আওতায় আনার উদ্যোগের কথা জানিয়েছিলেন মন্ত্রী। স্থানীয় পর্যায়ে সড়ক যোগাযোগের সার্বিক উন্নয়নে পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণমুখী কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নিয়েও পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।
মেগা প্রকল্পে ব্যয়ের যৌক্তিকতা জরুরি:
গত কয়েক বছরের মেগা প্রকল্প প্রসঙ্গে জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, পদ্মা সেতু, মেট্রোরেলসহ বিভিন্ন বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে; তবে এসব প্রকল্পের ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। উন্নয়ন অবশ্যই করতে হবে, কিন্তু জনগণের অর্থের সর্বোচ্চ সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, কোনো প্রকল্প গ্রহণের আগে এর প্রয়োজনীয়তা, ব্যয়, সম্ভাব্য সুফল এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিবেচনা করতে হবে। অপচয় ও অনিয়মের সুযোগ রেখে উন্নয়ন করলে তা জনগণের প্রকৃত কল্যাণ বয়ে আনবে না।
বিদ্যুৎ উৎপাদন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের পরিবর্তে সৌরবিদ্যুতে আরও বেশি বিনিয়োগের সুযোগ কাজে লাগানো যেত বলে তিনি মনে করেন। আগামী পাঁচ বছরে দেশে ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
অন্যায় করলে দলীয় পরিচয়ে ছাড় নয়:
আইনের শাসনের প্রসঙ্গ টেনে গণপূর্তমন্ত্রী বলেন, সম্প্রতি রাজধানীর একটি ঘটনায় বিএনপির নেতা-কর্মীদের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠেছে। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অভিযোগে সেখানে দলীয়ভাবেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তাঁর ভাষায়, “আমাদের নেতা-নেত্রী বা দলের লোক হলেও অন্যায় করলে ছাড় দেওয়া হবে না। কারও জমি বা সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ থাকলে আইনগত পথে যেতে হবে। পুলিশ, প্রশাসন ও আদালতের মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে হবে। কেউ নিজের হাতে আইন তুলে নিতে পারবেন না।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের ভোটে নির্বাচিত। তাই জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহি রয়েছে। দীর্ঘ সময় পর মানুষ ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ পেয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করাই সরকারের প্রধান দায়িত্ব।
‘পাঁচ বছরে আরও বেশি কাজের চেষ্টা করব’
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কর্মতৎপরতার প্রশংসা করে জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, দেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনতে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করছেন। দেশ ও জনগণের স্বার্থে সরকার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা পাঁচ বছর কাজ করার সুযোগ পেলে, ইনশাআল্লাহ গত ১৫ বছরে যেসব উন্নয়ন হয়নি, তার চেয়ে বেশি কাজ করার চেষ্টা করব।”
মতবিনিময় সভায় নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, ক্ষমতায় থাকা মানে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব করা নয়; বরং জনগণের কাছে দায়বদ্ধ থেকে কাজ করা। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অনিয়ম বা অন্যায় করলে তাঁর বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শিক্ষার মানোন্নয়নে ভবনের পাশাপাশি শিক্ষকও জরুরি:
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের উন্নয়ন প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, শুধু সুন্দর ভবন নির্মাণ করলেই শিক্ষার মান উন্নত হয় না। দক্ষ শিক্ষক, ভালো ব্যবস্থাপনা এবং দায়িত্বশীল পরিচালনা কমিটি থাকলেই একটি প্রতিষ্ঠান প্রকৃত অর্থে এগিয়ে যেতে পারে।
তিনি বলেন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোর পাশাপাশি শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও ব্যবস্থাপনার মানোন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে। কারণ একটি ভবন শিক্ষার পরিবেশ তৈরি করতে পারে, কিন্তু দক্ষ ও মানবিক শিক্ষকই শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্মাণ করেন।
সভায় উপস্থিত নেতা-কর্মীদের উদ্দেশে জাকারিয়া তাহের সুমন বলেন, “আপনারা আমাদের ভোট দিয়ে দায়িত্ব দিয়েছেন। সেই দায়িত্বের প্রতি আমাদের জবাবদিহি আছে। আপনাদের প্রত্যাশা পূরণে আমরা কাজ করে যাব।”
গ্রাম-শহরের যোগাযোগ উন্নয়ন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের অর্থের সুষ্ঠু ব্যবহারের ওপর মন্ত্রীর বক্তব্যে বিশেষ গুরুত্ব পায়। তাঁর আশ্বাস, পরিকল্পনা ও প্রস্তুতির পর্ব পেরিয়ে এখন বরুড়ার উন্নয়নকাজ ধীরে ধীরে বাস্তবের মাটিতে দৃশ্যমান হবে।