মোঃআনজার শাহ
পুরান ঢাকার আদালত প্রাঙ্গণে জামিনের শুনানিতে এসে সংবাদকর্মীদের সঙ্গে অপ্রীতিকর ঘটনায় জড়িয়েছেন চিত্রনায়িকা পরীমণি—এমন অভিযোগ তুলেছেন দৈনিক সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইন রাজু। তাঁর দাবি, ভিডিও ধারণের সময় পরীমনি তাঁর মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেন এবং ট্রাইপড ভেঙে ফেলেন; পরে তাঁকে গালিগালাজ ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিতও করেন।
তবে পরীমনির পক্ষ থেকে রাজুর বিরুদ্ধে গায়ে হাত দেওয়ার যে অভিযোগ আনা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট বলে দাবি করেছেন তিনি। ঘটনাটি ঘিরে সাংবাদিকদের পেশাগত নিরাপত্তা, আদালত প্রাঙ্গণে সংবাদ সংগ্রহের পরিবেশ এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্ব পালনের বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
রাজু জানান, পরীমনির আদালতে আসার খবর পেয়ে সকাল থেকেই গণমাধ্যমকর্মীরা আদালত প্রাঙ্গণে অপেক্ষা করছিলেন। নির্ধারিত সময়ের আগেই আদালতে পৌঁছে তিনি দীর্ঘক্ষণ গাড়িতে অবস্থান করেন; পরে বেলা ১২টার কিছু আগে আদালতের ডাক এলে গাড়ি থেকে নেমে আদালতের দিকে এগিয়ে যান।
এ সময় উপস্থিত সাংবাদিকেরা তাঁর ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে থাকেন। রাজুর ভাষ্য, পরীমনির সঙ্গে ১০ জনের বেশি দেহরক্ষী ছিলেন; তাঁদের কয়েকজন সাংবাদিকদের সঙ্গে আক্রমণাত্মক আচরণ করেন এবং ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেন। একপর্যায়ে কয়েকজন সংবাদকর্মী মাটিতে পড়ে যান বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
লিফটের পাশে মোবাইল ফোন কেড়ে নেওয়া, ভাঙে ট্রাইপড
ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে রাজু বলেন, তিনি আদালতের লিফটের এক পাশে দাঁড়িয়ে ভিডিও ধারণ করছিলেন। প্রথমে পরীমনির একজন দেহরক্ষী তাঁকে সরে যেতে বললে তিনি কিছুটা সরে দাঁড়ান।
এরপর পরীমনি লিফটে প্রবেশের সময় তাঁর মোবাইল ফোনে থাবা দিয়ে সেটি কেড়ে নেন। একই সময় তাঁর ট্রাইপডও ভেঙে যায়; পরে পরীমনির হাত থেকে নিজের মোবাইল ফোনটি ফিরিয়ে নেন বলে দাবি করেন তিনি।
নিচে নেমে গালিগালাজ ও গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগ
রাজুর দাবি, জামিন শুনানি শেষে নিচে নেমে তাঁকে দেখামাত্র পরীমনি তাঁর দিকে তেড়ে আসেন। এ সময় তাঁর গায়ে হাত দেওয়ার পাশাপাশি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন।
রাজু বলেন, “আমি শুধু বলেছিলাম, আপনি আমার মোবাইল টান দিয়েছেন, আবার ট্রাইপডও ভেঙেছেন। এর বাইরে তাঁর সঙ্গে কোনো খারাপ শব্দ ব্যবহার করিনি। তিনি যেভাবে গালিগালাজ করেছেন, তা মুখে বলার মতো নয়।”
পরীমনির পক্ষ থেকে তাঁর বিরুদ্ধে গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে রাজু বলেন, “এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বানোয়াট। বরং তিনিই আমার গায়ে হাত দিয়েছেন।” এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
এক হাতে কাজ করি, অন্য হাতটি রিজার্ভ ছিল:
ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তাঁকে নিয়ে ট্রল ও কটূক্তি করা হচ্ছে বলে জানান রাজু। তাঁর জন্মগত শারীরিক সীমাবদ্ধতা নিয়েও নানা মন্তব্য করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে তিনি বলেন, “এটি আমার জন্মগত সমস্যা। তবে আমি এটিকে প্রতিবন্ধকতা মনে করি না। কারণ, আমি এক হাত দিয়েই ভালোভাবে কাজ করতে পারি।” নিজের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের জবাবে রাজু বলেন, “পরীমনি বলছেন, আমি তাঁর গায়ে হাত দিয়েছি। প্রশ্ন হলো, কোন হাত দিয়ে দেব? আমি সব সময় বাম হাত দিয়ে কাজ করি। ঘটনার সময় সেই হাতে ছিল ট্রাইপড ও ক্যামেরা। অন্য হাতটি রিজার্ভ ছিল। তাই তাঁর এই অভিযোগকে আমি সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে মনে করি।”
রাজুর অভিযোগ, ঘটনাটি শুধু তাঁর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; আদালত প্রাঙ্গণে উপস্থিত অন্য সাংবাদিকেরাও পরীমনি ও তাঁর দেহরক্ষীদের আচরণের শিকার হয়েছেন। তাঁর দাবি, ‘আগামী সময়’-এর একজন নারী রিপোর্টারকে খামচি দেওয়ায় তাঁর হাত থেকে রক্ত বের হয়। এ ছাড়া জাগো নিউজ ও কালের কণ্ঠের কয়েকজন সংবাদকর্মীকেও ধাক্কা দেওয়া হয় এবং দেহরক্ষীরা কয়েকজনকে কিল-ঘুষি মেরে আহত করেন।
রাজু বলেন, “তাঁরা শিল্পী, আমরা সাংবাদিক। আমরা পেশাগত দায়িত্ব পালন করতেই সেখানে যাই। কিন্তু তাঁর আচরণ আমাদের হতাশ করেছে। একজন চলচ্চিত্রশিল্পী প্রকাশ্যে এভাবে একজন গণমাধ্যমকর্মীকে গালিগালাজ করবেন, এটি প্রত্যাশিত নয়। এ ধরনের আচরণে শিল্পীসমাজের ভাবমূর্তিও ক্ষুণ্ন হয়।”
তাঁর মতে, আদালত প্রাঙ্গণে সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন আচরণ কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তার প্রশ্নকে সামনে এনেছে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সংবাদকর্মীরা যদি বাধা, হামলা কিংবা লাঞ্ছনার শিকার হন, তাহলে স্বাধীন ও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিবেশ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
ঘটনার প্রতিকার ও পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজু বলেন, “এখানে আমি একা ক্ষতিগ্রস্ত হইনি, আমার অনেক সহকর্মীও হামলার শিকার হয়েছেন। প্রাথমিকভাবে আমার অফিস বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করছে। আমাদের সম্পাদকমণ্ডলীর প্যানেল রয়েছে। অফিস যেভাবে ব্যবস্থা নেবে এবং আহত সহকর্মীরা যৌথভাবে যে সিদ্ধান্ত নেবেন, সেটি বিবেচনায় নিয়েই আমরা পরবর্তী পদক্ষেপ নেব।”
উল্লেখ্য, ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর মামলায় বৃহস্পতিবার ঢাকার সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মাহফুজুর রহমানের আদালতে আত্মসমর্পণ করে ৫০০ টাকা মুচলেকায় জামিন পান পরীমনি।
আদালত প্রাঙ্গণ একটি সংবেদনশীল ও গুরুত্বপূর্ণ স্থান। সেখানে বিচারপ্রার্থী, আইনজীবী, বিচারক, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং গণমাধ্যমকর্মীদের উপস্থিতি থাকে। এমন স্থানে সংবাদ সংগ্রহের সময় সাংবাদিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।