আনোয়ারায় বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসার পর শিশুর মৃত্যু

কামরুল ইসলাম:

চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলায় সড়ক দুর্ঘটনায় আহত ছয় বছর বয়সী শিশু মো. আয়নের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে একটি বেসরকারি হাসপাতালের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে। উপজেলার বটতলী রুস্তমহাট এলাকায় অবস্থিত সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের বিরুদ্ধে এ অভিযোগ করেছেন নিহত শিশুটির স্বজনেরা। তাঁদের দাবি, হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই শিশুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। পরে শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মৃত্যু হয়।

এ ঘটনায় শিশুটির পরিবারের সদস্যদের মধ্যে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। একই সঙ্গে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে। তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা এবং অনুমোদনহীন হাসপাতাল ও ক্লিনিকের বিরুদ্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন। তবে শিশুটির মৃত্যুর সঙ্গে চিকিৎসায় কোনো অবহেলা বা ভুলের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা এখনো তদন্তাধীন।

স্থানীয় সূত্র ও স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, গত বুধবার রাতে শিশুটির মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা দেখা দেয়। একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ লোকজন সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে ভাঙচুর চালান এবং হাসপাতালের ফটকে তালা ঝুলিয়ে দেন। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

পরদিন বৃহস্পতিবার শিশুটির মরদেহ অ্যাম্বুলেন্সে করে হাসপাতালের সামনে নিয়ে বিক্ষোভ করেন স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। এ সময় তাঁরা ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত, ন্যায়বিচার এবং অনুমোদনহীন হাসপাতাল বন্ধের দাবি জানান। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, শিশুটির মৃত্যুর ঘটনার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই; চিকিৎসাসেবায় কোনো ধরনের অবহেলা হয়ে থাকলে তার যথাযথ জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

দুর্ঘটনার পর হাসপাতালে নেওয়া হয় আয়নকে

নিহত শিশু আয়ন আনোয়ারা উপজেলার বারশত ইউনিয়নের গুন্ধীপপাড়া এলাকায় তার মায়ের সঙ্গে নানার বাড়িতে থাকত। তার মা কুমকুম আকতার কর্ণফুলী ইপিজেডের (কেইপিজেড) একটি পোশাক কারখানায় কাজ করেন।

শিশুটির মামা সাইফুর রহমানের ভাষ্য অনুযায়ী, গত বুধবার বিকেলে একটি প্রাইভেট কারের ধাক্কায় আয়ন আহত হয়। দুর্ঘটনার পর স্বজনেরা দ্রুত তাকে বটতলী রুস্তমহাট এলাকার সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে নিয়ে যান।

সাইফুর রহমান বলেন, হাসপাতালে নেওয়ার পর শিশুটিকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়। এরপর তাকে বাড়িতে নিয়ে যেতে বলা হয় এবং তিন দিন পর পুনরায় চেকআপের জন্য হাসপাতালে আসতে পরামর্শ দেওয়া হয়।

তিনি আরও জানান, শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার পর রাত ৯টার দিকে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে শুরু করে। পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে উঠলে স্বজনেরা দ্রুত তাকে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক পরীক্ষা করে শিশুটিকে মৃত ঘোষণা করেন।

পরিবারের সদস্যদের অভিযোগ, দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থা যথাযথভাবে মূল্যায়ন করা হলে পরবর্তী পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত কি না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। তাঁদের দাবি, চিকিৎসার ক্ষেত্রে কোনো অবহেলা হয়ে থাকলে তা তদন্তের মাধ্যমে চিহ্নিত করে দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে।

‘পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়াই বাড়িতে পাঠানো হয়’—মায়ের অভিযোগ

ছেলেকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন মা কুমকুম আকতার। তাঁর অভিযোগ, আয়নকে হাসপাতালে নেওয়ার পর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা না করেই সেলাই ও ব্যান্ডেজ করে বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

কুমকুম আকতার বলেন, চিকিৎসক পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তি তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তাঁর ছেলে বিপদমুক্ত এবং বড় কোনো সমস্যা হবে না। সেই আশ্বাসের ভিত্তিতেই তাঁরা শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে যান বলে জানান তিনি।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে কুমকুম আকতার বলেন, বাড়িতে নেওয়ার প্রায় এক ঘণ্টা পরই তাঁর ছেলের শারীরিক অবস্থার অবনতি হতে থাকে। পরে দ্রুত চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলেও তাকে আর বাঁচানো যায়নি।

তিনি অভিযোগ করেন, সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসার ক্ষেত্রে অবহেলা করা হয়েছে এবং সেই অবহেলার কারণেই তাঁর সন্তানের মৃত্যু হয়েছে বলে তিনি মনে করেন। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার দাবি করেন।

তবে পরিবারের পক্ষ থেকে তোলা এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। চিকিৎসার নথিপত্র, দুর্ঘটনার পর শিশুটির শারীরিক অবস্থা, হাসপাতালে দেওয়া চিকিৎসা এবং পরবর্তী সময়ে তার মৃত্যুর কারণ পর্যালোচনা করলেই এ বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যেতে পারে।

তদন্তে তিন সদস্যের কমিটি গঠন

শিশুটির মৃত্যুর ঘটনায় অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ। কমিটিকে আগামী তিন কার্যদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে।

আনোয়ারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাহতাব উদ্দীন চৌধুরী জানান, জুনিয়র কনসালট্যান্ট (সার্জারি) ডা. জামসেদ গিয়াস উদ্দীনকে তদন্ত কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। মেডিকেল অফিসার ও শিশু রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ইকবাল মাহমুদ বেলালকে সদস্যসচিব এবং মেডিকেল অফিসার ডা. বিবি জয়নাব রিমাকে কমিটির অপর সদস্য হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

তিনি জানান, সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়ার পর শিশু আয়নের মৃত্যুর অভিযোগটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দিতে কমিটিকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এ তদন্তের মাধ্যমে হাসপাতালে শিশুটিকে কী ধরনের চিকিৎসা দেওয়া হয়েছিল, প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছিল কি না এবং চিকিৎসাসেবায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, তা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি হাসপাতালটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও লাইসেন্সসংক্রান্ত বিষয়ও যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. মিজানুর রহমান সাংবাদিকদের বলেন, দুর্ঘটনায় আহত হওয়ার পর শিশুটিকে তাঁদের হাসপাতালে আনা হলে চিকিৎসাসেবা দেওয়া হয়। চিকিৎসা শেষে স্বজনেরা শিশুটিকে বাড়িতে নিয়ে যান। পরে রাতে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং সেখানে শিশুটির মৃত্যু হয়।

হাসপাতাল পরিচালক আরও বলেন, শিশুটির মৃত্যুর পর রাতে তার স্বজনেরা হাসপাতালে এসে ভাঙচুর করেন।

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বক্তব্য ও স্বজনদের অভিযোগের মধ্যে চিকিৎসার যথার্থতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। এ পরিস্থিতিতে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসার নথিপত্র ও অন্যান্য প্রাসঙ্গিক তথ্য পর্যালোচনা করে নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা নির্ধারণ করা জরুরি।

পুলিশের বক্তব্য

আনোয়ারা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) জুনায়েত চৌধুরী জানান, বটতলী রুস্তমহাট এলাকার সাঙ্গু ট্রমা অ্যান্ড জেনারেল হাসপাতালে এক শিশুর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছিল। খবর পেয়ে পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় এখনো থানায় কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি।

অনুমোদনহীন হাসপাতালের বিরুদ্ধে অভিযানের দাবি

শিশুটির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে স্থানীয় বাসিন্দারা আনোয়ারা উপজেলায় পরিচালিত বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর কার্যক্রম যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। তাঁদের বক্তব্য, চিকিৎসাসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রয়োজনীয় অনুমোদন, লাইসেন্স, চিকিৎসক ও জনবলসংক্রান্ত শর্ত এবং রোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি করা প্রয়োজন।

তাঁরা আরও বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে চিকিৎসায় অবহেলা বা অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করতে হবে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

ছয় বছরের শিশু আয়নের মৃত্যু শুধু তার পরিবারকেই শোকাহত করেনি, স্থানীয় পর্যায়েও চিকিৎসাসেবার মান ও রোগীর নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে। এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন নিহত শিশুটির স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা। তাঁদের প্রত্যাশা, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্‌ঘাটিত হবে এবং কোনো অনিয়ম বা অবহেলা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *