এইচ এম হাকিম:
ইটের পর ইট গেঁথে যে স্বপ্নের সূচনা হয়েছিল দ্বীনি শিক্ষা আর মানবসেবার উদ্দেশ্যে, আজ তা প্রভাবশালীদের বুলেট, রামদা আর ক্ষমতার দাপটে রক্তাক্ত হতে বসেছে। সাভার-আশুলিয়ার গণকবাড়ীতে অবস্থিত আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. সৈয়দ আলী আশরাফ (রহ.)-এর স্মৃতিবিজড়িত ‘আশরাফ চ্যারিটেবল ট্রাস্ট’ এবং এর পরিচালিত ‘তাহফিজুল কোরআনিল কারিম ফাজিল (স্নাতক) মাদ্রাসা’ আজ এক চিহ্নিত দখলদার সন্ত্রাসী চক্রের হাতে চরমভাবে জিম্মি হয়ে পড়েছে। বিগত প্রায় দুই দশক ধরে চলা রাজনৈতিক নিপীড়ন, ক্যাডারদের তাণ্ডব এবং অমানবিক লুণ্ঠনে দিশেহারা ট্রাস্ট পরিবার ও শত শত সাধারণ শিক্ষার্থী। বিজ্ঞ আদালত থেকে সম্পত্তি রক্ষার জন্য স্পষ্ট ‘স্থিতাবস্থা’ (Status Quo) নির্দেশ থাকা সত্ত্বেও আইন-আদালতকে তোয়াক্কা না করে বারবার চালানো হচ্ছে দখলের তাণ্ডব। তাই শেষ সম্বল রক্ষায় এবার বিএনপি হাইকমান্ড ও গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি আকুল দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন প্রতিষ্ঠাতার স্বজনেরা।
ঘটনার বিবরণ থেকে জানা যায়, গত ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬, শুক্রবার বিকেল আনুমানিক সাড়ে চারটার দিকে সাভারের শ্রীপুরস্থ মাদ্রাসা ও ট্রাস্টের নিজস্ব মার্কেট প্রাঙ্গণে হঠাৎ পুরো এলাকা প্রকম্পিত করে একদল সশস্ত্র ভাড়াটে সন্ত্রাসী হাজির হয়। ১ নম্বর বিবাদী আশুলিয়া থানা শ্রমিক লীগের বিতর্কিত নেতার ভাই ইমাম হাসান, ‘ছুছা’ জাকির, ‘শুটার’ মামুন, ‘সুপার’ কালু এবং মারুফ হোসেন মুকুলের নির্দেশে প্রায় ৫০-৬০ জনের এক সংঘবদ্ধ দল রামদা, লোহার রড ও দেশীয় অস্ত্রে সজ্জিত হয়ে মাদ্রাসার সীমানাপ্রাচীর টপকে বেআইনি জনতাবদ্ধে অনধিকার প্রবেশ করে। এ সময় মাদ্রাসার সিকিউরিটি ইনচার্জ ৬৫ বছর বয়সী মোঃ আলতাব হোসেন বাধা দিলে তাঁর বুকে পিস্তল ও রামদা ঠেকিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয় এবং মুহূর্তের মধ্যেই পুরো এলাকায় মারাত্মক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। সন্ত্রাসীরা একে একে ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয় মাদ্রাসার জানালা, কলাপসিবল গেট ও ক্লাসরুমের মূল্যবান আসবাবপত্র এবং ঘটনার প্রমাণ ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে প্রথমেই ভেঙে চুরমার করে দেওয়া হয় পুরো প্রাঙ্গণের প্রায় ২০টি সিসিটিভি ক্যামেরা, যার আনুমানিক ক্ষতি অন্তত ১৫ লাখ টাকা। শুধু তাই নয়, সন্ত্রাসীরা অফিসের লকার ভেঙে লুট করে নিয়ে যায় মাদ্রাসা পরিচালন ও ট্রাস্টের সংরক্ষিত নগদ ২০ লাখ টাকা, ২টি ল্যাপটপ এবং ১০টি ডেস্কটপ মনিটরসহ মোট প্রায় ২৩ লাখ ৪০ হাজার টাকার সম্পদ।
এ অনাকাঙ্ক্ষিত ও লুণ্ঠনের ঘটনার খবর পেয়ে ট্রাস্টের কর্মকর্তা ও শিক্ষকেরা পৌঁছানোর আগেই পুরো প্রতিষ্ঠানকে লণ্ডভণ্ড করে উল্লাস করতে করতে স্থান ত্যাগ করে হামলাকারীরা। পরবর্তীতে এ ঘটনার তীব্র নিন্দা ও আইনি প্রতিকার চেয়ে মাদ্রাসার উপ-পরিচালক (প্রশাসন) সৈয়দ সানজিদ বাদী হয়ে গত ২৮ সেপ্টেম্বর আশুলিয়া থানায় ১৪ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা ৫০-৬০ জনের বিরুদ্ধে একটি এজাহার দায়ের করেন, যার প্রেক্ষিতে পুলিশ মামলা নং-১১৩ (ধারা: ১৪৩/৪৪৭/৪৪৮/৩৮০/৪২৭/১১৪/৫০৬ পেনাল কোড) রুজু করেছে।
অন্যদিকে, জমি ও মার্কেটের মালিকানা রক্ষার্থে এবং একের পর এক জবরদখল চেষ্টার বিরুদ্ধে ট্রাস্টের সেক্রেটারি সৈয়দ আলী রায়হান বাদী হয়ে বিজ্ঞ ২য় যুগ্ম জেলা জজ আদালত, ঢাকায় দেওয়ানি মোকদ্দমা নং-৪৫৯/২০২৬ দায়ের করেছিলেন। বিজ্ঞ জজ বাহাদুর সমস্ত তথ্যপ্রমাণ ও নথিপত্র পর্যালোচনা করে আশরাফ চ্যারিটেবল ট্রাস্টের আওতাধীন তাহফিজুল কোরআনিল কারিম স্নাতক ফাজিল মাদ্রাসা (EIIN-১৩৪০২৮, কোড-১১০৮৯) এবং আসিয়া আশরাফ মহিলা মাদ্রাসাসহ তফসিলভুক্ত সম্পূর্ণ সম্পত্তির ওপর স্পষ্ট স্থিতাবস্থা (Status Quo) বজায় রাখার আদেশ দেন এবং বিবাদীদের প্রতি কারণ দর্শানোর (Show Cause) নোটিশ প্রদান করেন। কিন্তু আদালতের এই স্পষ্ট আদেশ ও স্থগিতাদেশ থাকা সত্ত্বেও অভিযুক্ত চক্রটি দিনের আলোতেই বারবার আইন অমান্য করে জবরদখল ও তাণ্ডব চালিয়ে যাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ট্রাস্ট সূত্রে জানা গেছে, এই বিপুল পরিমাণের ট্রাস্ট সম্পত্তি ও মার্কেটের ওপর কুদৃষ্টি বহু পুরোনো। বিগত ১৭ বছর ধরে তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী নেতা ও সাবেক মন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানকের প্রত্যক্ষ মদদে ও রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় মারুফ হোসেন মুকুল, ডাক্তার সালেহউদ্দিন সাঈদ, আওয়ামী শ্রমিক লীগ নেতা ইমাম হাসান ও ‘ছুছা’ জাকির গং ট্রাস্টের এই শতকোটি টাকার মার্কেট ও দ্বীনি প্রতিষ্ঠানটি অবৈধভাবে দখলে রেখেছিল।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানে স্বৈরাচারী সরকারের পতন ঘটলেও এবং পরবর্তীতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় পার হলেও থমকে যায়নি এই অশুভ চক্রের দৌরাত্ম্য। সুযোগ বুঝে তারা বারবার পবিত্র এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে এবং ট্রাস্টের প্রকৃত মালিকপক্ষ দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনের দরজায় দরজায় ঘুরেও কোনো স্থায়ী প্রতিকার পাচ্ছেন না।
পবিত্র কোরআনের আলো ছড়ানো এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দেশের শীর্ষস্থানীয় প্রজ্ঞাবান আলেম ও প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ প্রফেসর ড. সৈয়দ আলী আশরাফ (রহ.)। আজ তাঁর গড়ে তোলা দ্বীনি আমানত ধূলিসাৎ হতে দেখে চোখে জল প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্যদের। ট্রাস্টের সদস্য ও মাদ্রাসার উপ-পরিচালক সৈয়দ সানজিদ এবং ট্রাস্টের সেক্রেটারি সৈয়দ আলী রায়হান অত্যন্ত আবেগঘন কণ্ঠে জানান, তাঁদের প্রখ্যাত চাচা প্রফেসর ড. সৈয়দ আলী আশরাফ (রহ.) সারাজীবন শিক্ষা ও ইসলামের সেবা করে গেছেন এবং তাঁর জীবনের শেষ চিহ্ন এই প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড় করানো হয়েছে। এতিম ও সাধারণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষার ব্যয় নির্বাহের জন্য গচ্ছিত টাকা এবং নথিপত্র সন্ত্রাসীরা কেড়ে নিয়ে গেছে। তাই উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিচার ও সহায়তার আকুল আরজি জানিয়ে দেশের বর্তমান অভিভাবক বিএনপি প্রধান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপ কামনা করে তাঁরা বলেছেন, “মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, মহান আল্লাহর দেওয়া ২৪টি ঘণ্টার ভেতর থেকে আমাদের দুই ভাইয়ের আকুতি শোনার জন্য মাত্র ৫টি মিনিট সময় দিন; আপনি ছাড়া এই অন্যায় থামানোর আর কেউ নেই, তাই কোরআনের আলো ছড়ানো এ প্রতিষ্ঠান রক্ষায় আপনার সুদৃঢ় পদক্ষেপ কামনা করছি।”
এদিকে, দ্বীনি শিক্ষার পবিত্র পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে এবং ভূমিখেকোদের হাত থেকে এই ঐতিহ্যবাহী মাদ্রাসা ও ট্রাস্ট রক্ষা করতে অনতিবিলম্বে আশুলিয়া থানার ১১৩ নম্বর মামলার এজাহারভুক্ত আসামিদের গ্রেপ্তার, লুণ্ঠিত অর্থ ও মালামাল উদ্ধার এবং আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় আপামর জনতা ও সচেতন ধর্মপ্রাণ মুসলমানেরা।