স্পোর্টস ডেস্ক ::
ক্রিকেটে যেমন ভারত-পাকিস্তান ম্যাচ ঘিরে থাকে তীব্র উত্তেজনা, ফুটবলে তেমনি আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড লড়াই শুধু একটি ম্যাচ নয়—এটি ইতিহাস, আবেগ, রাজনীতি ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার এক অনন্য অধ্যায়। মাঠের ৯০ মিনিটের লড়াই যেন কয়েক দশকের ক্ষোভ, গৌরব ও প্রতিশোধের প্রতীক হয়ে ওঠে।
দীর্ঘ ২৪ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে মুখোমুখি হতে যাচ্ছে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী। কোয়ার্টার ফাইনালে নিজ নিজ ম্যাচ জয়ের পর সেমিফাইনালে তাদের বহুল প্রতীক্ষিত লড়াই নিশ্চিত হয়েছে। আগামী বুধবার আটলান্টায় ফাইনালে ওঠার লড়াইয়ে মুখোমুখি হবে ফুটবলের দুই পরাশক্তি।
ম্যাচের আগেই উত্তাপ
শেষ ষোলোতে নাটকীয় জয়ের পর আর্জেন্টিনার ড্রেসিংরুমে ইংল্যান্ডবিরোধী গান গাইতে দেখা যায় লিওনেল মেসি, এমিলিয়ানো মার্টিনেজসহ সতীর্থদের। একইভাবে বুয়েনস আইরেস ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত আর্জেন্টাইন সমর্থকরাও ইংল্যান্ডবিরোধী স্লোগানে মুখর ছিলেন।
কোয়ার্টার ফাইনালে সুইজারল্যান্ডকে ৩-১ গোলে হারানোর পরও গ্যালারিতে ধ্বনিত হয় সেই পরিচিত স্লোগান—“যে লাফাবে না, সে-ই ইংরেজ।” এতে স্পষ্ট, মাঠের লড়াইয়ের আগেই শুরু হয়ে গেছে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ।
ফকল্যান্ড যুদ্ধের রক্তাক্ত স্মৃতি
আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ডের এই বৈরিতার সবচেয়ে বড় কারণ ১৯৮২ সালের ফকল্যান্ড যুদ্ধ। দক্ষিণ আটলান্টিকের ফকল্যান্ড (আর্জেন্টিনার ভাষায় মালভিনাস) দ্বীপপুঞ্জের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ৭৪ দিনের সেই যুদ্ধে আর্জেন্টিনার ৬৪৯ এবং ব্রিটেনের ২৫৫ সেনা নিহত হন।
যুদ্ধে পরাজয়ের ক্ষত আজও আর্জেন্টাইনদের মনে গভীরভাবে রয়ে গেছে। সেই ক্ষোভের প্রতিফলন বারবার দেখা গেছে ফুটবল মাঠে।
ম্যারাডোনার ‘হ্যান্ড অব গড’
ফকল্যান্ড যুদ্ধের মাত্র চার বছর পর, ১৯৮৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ইংল্যান্ডকে ২-১ গোলে হারায় আর্জেন্টিনা।
সেই ম্যাচেই ডিয়েগো ম্যারাডোনা করেন ইতিহাসের দুটি বিখ্যাত গোল—একটি বিতর্কিত ‘হ্যান্ড অব গড’, অন্যটি মাঝমাঠ থেকে একক নৈপুণ্যে করা ‘শতাব্দীর সেরা গোল’।
ম্যারাডোনা পরে স্বীকার করেছিলেন, এই জয় ছিল ফকল্যান্ড যুদ্ধে নিহত আর্জেন্টাইনদের প্রতি এক ধরনের ফুটবলীয় শ্রদ্ধা ও প্রতিশোধ। আত্মজীবনীতে তিনি লিখেছিলেন, ‘আমি ফকল্যান্ডের কথা ভেবেই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে খেলেছিলাম।’
বৈরিতার শুরু আরও আগে
দুই দেশের ফুটবলীয় তিক্ততার সূচনা অবশ্য ১৯৮২ সালের যুদ্ধেরও আগে। ১৯৬৬ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে আর্জেন্টিনার অধিনায়ক আন্তোনিও রাতিনকে বিতর্কিতভাবে লাল কার্ড দেখানো হয়।
ম্যাচ শেষে ইংল্যান্ডের কোচ আলফ রামসে আর্জেন্টাইন ফুটবলারদের ‘পশু’ বলে মন্তব্য করেন। আর্জেন্টিনায় এই মন্তব্যকে অপমানজনক ও বর্ণবাদী হিসেবে দেখা হয়। এরপর থেকেই দুই দেশের সম্পর্ক আরও তিক্ত হয়ে ওঠে।
এবার মেসির সামনে নতুন অধ্যায়
লিওনেল মেসি তার দীর্ঘ আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে কখনোই ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অফিসিয়াল ম্যাচ খেলেননি। ফলে এবারের বিশ্বকাপ সেমিফাইনাল তার জন্য হতে যাচ্ছে প্রথম ইংল্যান্ড পরীক্ষা।
আর্জেন্টাইনদের কাছে এই ম্যাচ শুধু ফাইনালে ওঠার লড়াই নয়, বরং ম্যারাডোনার উত্তরাধিকার ধরে রাখার আরেকটি সুযোগ।
রেফারিদের ক্ষেত্রেও অলিখিত নিয়ম
এই বৈরিতার প্রভাব রেফারি নিয়োগেও দেখা যায়। সাধারণত ফিফা আর্জেন্টিনার ম্যাচে ইংলিশ রেফারি কিংবা ইংল্যান্ডের ম্যাচে আর্জেন্টাইন রেফারি নিয়োগ দেয় না। নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করতেই এমন অলিখিত নীতি অনুসরণ করা হয়।
বিশ্বকাপে মুখোমুখি
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এখন পর্যন্ত পাঁচবার মুখোমুখি হয়েছে আর্জেন্টিনা ও ইংল্যান্ড।
- ১৯৬২ ও ১৯৬৬ সালে জয় পায় ইংল্যান্ড।
- ১৯৮৬ সালে ম্যারাডোনার জাদুতে জিতে পরে বিশ্বকাপও জেতে আর্জেন্টিনা।
- ১৯৯৮ সালে টাইব্রেকারে জয় পায় আর্জেন্টিনা।
- ২০০২ সালে ডেভিড বেকহামের পেনাল্টি গোলে ১-০ ব্যবধানে জিতে প্রতিশোধ নেয় ইংল্যান্ড।
দীর্ঘ বিরতির পর আবারও বিশ্বকাপের মঞ্চে এই দুই চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীর মুখোমুখি হওয়া ফুটবলপ্রেমীদের জন্য নিঃসন্দেহে এক ঐতিহাসিক মহারণের অপেক্ষা।