বিনোদন ডেস্ক: সিনেমা ভালো হলে দর্শক হলে ছুটবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু কোনো সিনেমা ‘এতটাই খারাপ’ যে সেটি দেখতেই মানুষ টিকিট কাটতে শুরু করে, এমন ঘটনা সিনেমার দুনিয়ায় খুবই বিরল। চীনের স্বল্প বাজেটের অ্যানিমেশন সিনেমা ‘Niu Lai’ ঘিরে এখন ঠিক এমনই এক অবিশ্বাস্য ঘটনা ঘটেছে। সিনেমাটির দুর্বল অ্যানিমেশন, অদ্ভুত গল্প ও অপেশাদার নির্মাণ নিয়েই শুরু হয়েছিল আলোচনা। আর সেই সমালোচনাই শেষ পর্যন্ত সিনেমাটিকে পরিণত করেছে ভাইরাল বক্স অফিস হিটে।
চীনা ভাষায় ‘Niu Lai’ নামের এই সিনেমাটির ইংরেজি অর্থ ‘The Cow Is Coming’। ৫ আগস্ট চীনের প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি পায় সিনেমাটি। মুক্তির আগে বড় কোনো প্রচারণা ছিল না, পরিচিত তারকাও ছিলেন না। এমনকি সিনেমাটি তৈরি করেছেন মাত্র দুজন—এক মা ও তার ছেলে। দীর্ঘ পাঁচ বছরে অত্যন্ত স্বল্প বাজেটে তারা ছবিটি তৈরি করেন।
শুরুতে দর্শকই ছিল না
মুক্তির পর প্রথম কয়েক দিন সিনেমাটির অবস্থা ছিল প্রায় করুণ। প্রথম নয় দিনে ‘Niu Lai’ আয় করে মাত্র ৭ হাজার ১৬৯ ইউয়ান। দর্শকসংখ্যা ছিল ৩০০-এরও কম। অর্থাৎ সিনেমাটি যে বড় কোনো সাফল্য পাবে, তার কোনো সম্ভাবনাই তখন দেখা যাচ্ছিল না।
কিন্তু এরপরই বদলে যায় পুরো গল্প।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দর্শকরা সিনেমাটির অ্যানিমেশন ও গল্প নিয়ে মজা করতে শুরু করেন। কেউ এর অ্যানিমেশনকে ‘বিপর্যয়কর’ বলে মন্তব্য করেন, আবার কেউ সিনেমাটির পোস্টার ও চরিত্র নিয়ে তৈরি করেন নানা ধরনের মিম। ধীরে ধীরে সিনেমাটিকে ঘিরে কৌতূহল বাড়তে থাকে।
‘কতটা খারাপ?’—এই প্রশ্নেই হলে ভিড়
অদ্ভুতভাবে দর্শকদের একটি অংশ সিনেমাটি দেখতে শুরু করেন ভালো লাগার আশায় নয়, বরং সিনেমাটি আসলে কতটা খারাপ—তা নিজের চোখে দেখার জন্য।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের আলোচনা যত বাড়তে থাকে, ততই বাড়তে থাকে সিনেমাটির প্রতি মানুষের আগ্রহ। আর সেই আগ্রহই সরাসরি প্রভাব ফেলে বক্স অফিসে।
প্রথম নয় দিনে মাত্র ৭ হাজার ইউয়ান আয় করা সিনেমাটি পরবর্তী সময়ে কয়েক মিলিয়ন ইউয়ান আয় করে ফেলে। বিভিন্ন সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে এর আয় ১ কোটি ৪৯ লাখ ইউয়ানের বেশি হওয়ার কথা বলা হয়েছে।
বড় বাজেটের সিনেমার পাশেও ‘Niu Lai’
সবচেয়ে অবাক করার বিষয় হলো, অল্প বাজেটে মাত্র দুজনের তৈরি এই সিনেমা এখন চীনের বক্স অফিস আলোচনায় জায়গা করে নিয়েছে বড় বড় আন্তর্জাতিক সিনেমার পাশে।
ক্রিস্টোফার নোলানের বহুল প্রতীক্ষিত ‘The Odyssey’ এবং ‘Spider-Man: Brand New Day’-এর মতো বড় বাজেটের সিনেমার সঙ্গেও ‘Niu Lai’-কে তুলনা করছেন চীনা দর্শকরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে তৈরি হচ্ছে নানা মিম ও রসিকতা।
তবে এর অর্থ এই নয় যে ‘Niu Lai’ সমালোচকদের কাছে একটি ভালো সিনেমা হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। বরং সিনেমাটির দুর্বলতাই এর সবচেয়ে বড় প্রচারণায় পরিণত হয়েছে।
নেতিবাচক প্রচারণাই হলো ইতিবাচক ব্যবসা
সিনেমাটির ঘটনা চলচ্চিত্র বিপণনের একটি অদ্ভুত বাস্তবতাও সামনে এনেছে। সাধারণত কোনো সিনেমার খারাপ রিভিউ হলে দর্শক কমে যায়। কিন্তু ‘Niu Lai’-এর ক্ষেত্রে ঘটেছে সম্পূর্ণ উল্টো।
দর্শকদের নেতিবাচক মন্তব্য → সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা → মিম ও ভাইরাল পোস্ট → মানুষের কৌতূহল → প্রেক্ষাগৃহে দর্শক—এই ধারাবাহিকতাই সিনেমাটির ব্যবসা বাড়িয়ে দিয়েছে।
অর্থাৎ ‘খারাপ’ বলেই যে সিনেমা ব্যবসা করতে পারবে না, ‘Niu Lai’ যেন তারই উল্টো উদাহরণ।
AI-এর যুগে কেন এত আলোচনা?
আরেকটি বিষয়ও সিনেমাটিকে আলাদা করে তুলেছে। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অত্যাধুনিক প্রযুক্তির কারণে সিনেমার অ্যানিমেশন ক্রমেই নিখুঁত হচ্ছে। সেই সময়ে ‘Niu Lai’-এর হাতে তৈরি, অসম্পূর্ণ ও অপরিপাটি ভিজ্যুয়াল অনেকের কাছে ভিন্ন ধরনের আকর্ষণ তৈরি করেছে।
কেউ কেউ সিনেমাটির এই অপেশাদার নির্মাণশৈলীকেও মানবিক ও স্বতন্ত্র হিসেবে দেখছেন। ফলে শুধু ‘খারাপ সিনেমা’ হিসেবেই নয়, বরং ইন্টারনেট সংস্কৃতি কীভাবে একটি অখ্যাত কাজকে রাতারাতি আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে আসতে পারে—তার উদাহরণ হিসেবেও ছবিটি সামনে এসেছে।
সব মিলিয়ে ‘Niu Lai’-এর গল্প সিনেমার প্রচলিত সাফল্যের ধারণাকেই যেন উল্টে দিয়েছে। যেখানে কোটি কোটি টাকা খরচ করে প্রচারণা চালিয়েও অনেক সিনেমা দর্শক টানতে পারে না, সেখানে মাত্র দুজনের তৈরি, শুরুতে প্রায় দর্শকশূন্য একটি অ্যানিমেশন নিজের দুর্বলতাকেই জনপ্রিয়তার হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে।
সিনেমাটি সত্যিই ভালো কি না—তা নিয়ে বিতর্ক থাকতেই পারে। তবে একটি বিষয় ইতোমধ্যে পরিষ্কার: কখনো কখনো একটি সিনেমাকে ভাইরাল করার জন্য ভালো হওয়ার চেয়েও ‘অবিশ্বাস্য রকম খারাপ’ হওয়াই যথেষ্ট!