মো: আনজাদ শাহ:
সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামের দ্বিতীয় স্ত্রী মোছা. মরিয়ম খাতুনের অস্বাভাবিক মৃত্যুকে ঘিরে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের ন্যাম ভবনের একটি ফ্ল্যাট থেকে রোববার (২০ সেপ্টেম্বর) মরিয়মের ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। এরপর তার মৃত্যুর ঘটনায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা হয়েছে। মামলায় সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগমকে গ্রেপ্তার দেখিয়েছে পুলিশ।
মরিয়মের মৃত্যুকে পুলিশ আপাতত অস্বাভাবিক মৃত্যু হিসেবে তদন্ত করছে। ঘটনাস্থল থেকে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ক্রাইম সিন ইউনিট। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন তৈরির পর ময়নাতদন্তের জন্য শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত এটি হত্যা নাকি আত্মহত্যা—তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে জানিয়েছে পুলিশ।
মরিয়মকে যে কক্ষে ঝুলন্ত অবস্থায় পাওয়া গেছে, সেখানে তার মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল—এ প্রশ্নের উত্তর তদন্তে গুরুত্বপূর্ণ। ঘটনার সময় ফ্ল্যাটে কারা ছিলেন, কে প্রথম মরিয়মকে দেখতে পান, দরজা কী অবস্থায় ছিল এবং মরদেহ উদ্ধারের আগে ঘটনাস্থলে কোনো পরিবর্তন করা হয়েছিল কি না—এসব বিষয় খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
পুলিশের পাশাপাশি সিআইডির ক্রাইম সিন ইউনিট ঘটনাস্থল থেকে আলামত সংগ্রহ করেছে। এসব আলামতের ফরেনসিক বিশ্লেষণ মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি বোঝার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে কোনো আঘাতের চিহ্ন ছিল কি না, মৃত্যুর ধরন কী এবং মৃত্যুর আনুমানিক সময় কখন—এসব বিষয়ে ময়নাতদন্ত থেকে তথ্য পাওয়ার কথা।
এ ছাড়া প্রয়োজন হলে ভিসেরা পরীক্ষাসহ অন্যান্য ফরেনসিক পরীক্ষার ফলও তদন্তে বিবেচনায় আসতে পারে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও অন্যান্য বৈজ্ঞানিক পরীক্ষার ফল না পাওয়া পর্যন্ত মৃত্যুর ধরন নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় একটি চিরকুটের বিষয়ও তদন্তে এসেছে। সেটি সত্যিই মরিয়মের লেখা কি না, কখন লেখা হয়েছে এবং সেখানে কী বক্তব্য রয়েছে—এসব বিষয় ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চিরকুটে কোনো ব্যক্তির নাম, অভিযোগ বা মৃত্যুর কারণ উল্লেখ থাকলে সেটিকে একক প্রমাণ হিসেবে না দেখে অন্যান্য সাক্ষ্য ও আলামতের সঙ্গে মিলিয়ে দেখা জরুরি। লেখাটি মরিয়মের নিজের কি না, তা নিশ্চিত করাও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
মরিয়ম ও গাজী নজরুল ইসলামের সম্পর্ক নিয়ে এর আগে প্রকাশ্যে বিভিন্ন আলোচনা ও বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। গাজী নজরুল নিজেই মরিয়মকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। পরে বিষয়টি নিয়ে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্কও তৈরি হয়।
তদন্তে তাই মৃত্যুর আগে তাদের পারিবারিক ও ব্যক্তিগত সম্পর্কের বাস্তব পরিস্থিতি কী ছিল, সম্প্রতি তাদের মধ্যে কোনো বিরোধ বা যোগাযোগ হয়েছিল কি না এবং মৃত্যুর আগে মরিয়ম কার সঙ্গে কথা বলেছিলেন—এসব বিষয় যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ।
এ ক্ষেত্রে মোবাইল ফোনের কললিস্ট, বার্তা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যোগাযোগ এবং অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য তদন্তে সহায়ক হতে পারে।
মরিয়ম মৃত্যুর আগে কার সঙ্গে কথা বলেছেন বা দেখা করেছেন—এ প্রশ্নের উত্তরও গুরুত্বপূর্ণ। তার মোবাইল ফোন, কল রেকর্ড, মেসেজ এবং অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস পরীক্ষা করে শেষ সময়ের যোগাযোগের একটি ধারাবাহিকতা তৈরি করা যেতে পারে।
এ ছাড়া ভবনের নিরাপত্তাকর্মী, আশপাশের বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য নেওয়ার মাধ্যমে ঘটনার সময় ফ্ল্যাটে কারা প্রবেশ বা বের হয়েছেন, সে বিষয়টিও যাচাই করা প্রয়োজন।
মরিয়মের বাবা এস এম মাসুম বিল্লাহ বাদী হয়ে শেরেবাংলা নগর থানায় আত্মহত্যায় প্ররোচনার অভিযোগে মামলা করেছেন। মামলায় গাজী নজরুল ইসলাম, তার প্রথম স্ত্রী মাকছুদা বেগম এবং মাকছুদার ভাই ওবায়দুর রহমানের নাম রয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। গাজী নজরুল ও তার প্রথম স্ত্রীকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে এবং পুলিশ তাদের জিজ্ঞাসাবাদের জন্য রিমান্ড চেয়েছে।
তবে মামলায় অভিযোগ আনা এবং আদালতে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে তদন্ত, সাক্ষ্য, ফরেনসিক আলামত এবং পরবর্তী বিচারিক প্রক্রিয়া।
পুলিশ গাজী নজরুল ইসলাম ও তার প্রথম স্ত্রীকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাত দিনের রিমান্ড চেয়েছে। তদন্তকারীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হতে পারে—মরিয়মের মৃত্যুর আগে কী ঘটেছিল, তিনি কার সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন, তার সঙ্গে কারও বিরোধ ছিল কি না এবং ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি সম্পর্কে আসামিরা কী জানেন।
তবে রিমান্ডে পাওয়া কোনো বক্তব্যকে একাই চূড়ান্ত প্রমাণ হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই। অন্যান্য আলামত ও সাক্ষ্যের সঙ্গে মিলিয়ে তার সত্যতা যাচাই করতে হবে।
মরিয়মের মৃত্যুর ঘটনায় এখন কয়েকটি প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে—মৃত্যুর সঠিক সময় কখন? মৃত্যুর আগে তিনি কার সঙ্গে ছিলেন? ঘটনাস্থলে অন্য কেউ ছিলেন কি না? মরদেহ উদ্ধারের আগে কক্ষে কী ঘটেছিল? চিরকুটটি সত্যিই তার লেখা কি না? তার মোবাইল ফোন ও ডিজিটাল যোগাযোগে শেষ মুহূর্তের কোনো গুরুত্বপূর্ণ তথ্য রয়েছে কি না? ময়নাতদন্তে মৃত্যুর কারণ সম্পর্কে কী পাওয়া যায়? ঘটনাস্থলের আলামত ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য পরস্পরের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না?
এসব প্রশ্নের উত্তর মিললে মরিয়মের মৃত্যুর প্রকৃত পরিস্থিতি সম্পর্কে একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হতে পারে।
মরিয়ম খাতুনের মৃত্যু নিয়ে ইতোমধ্যে নানা আলোচনা ও বিভিন্ন ধরনের দাবি সামনে এসেছে। তবে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে কোনো পক্ষকে মৃত্যুর জন্য দায়ী করা বা ঘটনাটিকে নিশ্চিতভাবে হত্যা কিংবা আত্মহত্যা হিসেবে চিহ্নিত করা সমীচীন নয়।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষার ফল, সাক্ষ্য-প্রমাণ এবং আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই মৃত্যুর প্রকৃত কারণ ও দায় নির্ধারিত হওয়ার কথা। বর্তমানে এ ঘটনায় মামলা তদন্তাধীন এবং পুলিশ অভিযুক্তদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় তথ্য সংগ্রহের প্রক্রিয়ায় রয়েছে।