ওমানে বিষাক্ত গ্যাসে চার ভাইয়ের মৃত্যু, রাঙ্গুনিয়াজুড়ে শোকের মাতম

কামরুল ইসলাম:

চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার লালানগর ইউনিয়নের বান্দারাজার পাড়া এলাকায় নেমে এসেছে গভীর শোকের ছায়া। যে বাড়িটিতে কয়েকদিন পর বিয়ের আনন্দে মুখর থাকার কথা ছিল, সেই বাড়িতেই এখন চলছে চার সহোদরের লাশের অপেক্ষা। ওমানে মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন একই পরিবারের চার ভাই। তাদের মৃত্যুর খবরে পুরো এলাকায় বইছে শোকের মাতম।

পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নিহতরা হলেন রাশেদ, শাহেদুল, সিরাজ ও শহিদ। তাদের মধ্যে সিরাজ ও শহিদের দেশে ফেরার কথা ছিল গত শুক্রবার। ছোট ভাই এনামের বিয়ের প্রস্তুতিও চলছিল জোরেশোরে। কিন্তু সেই আনন্দ মুহূর্তেই পরিণত হয়েছে শোকে।

স্বজনরা জানান, গত মঙ্গলবার রাতে ওমানের মুলাদ্দাহ এলাকার একটি ক্লিনিকে অসুস্থ বড় ভাই রাশেদকে ডাক্তার দেখাতে নিয়ে যান অপর তিন ভাই। চিকিৎসকের সিরিয়াল পেতে দেরি হওয়ায় তারা গাড়ির ভেতরে এসি চালিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। দীর্ঘ সময় গাড়ির ভেতরে অবস্থানকালে বিষাক্ত গ্যাসে তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন বলে ধারণা করা হচ্ছে।

মৃত্যুর আগে সিরাজ তার এলাকার প্রবাসী বন্ধু পারভেজকে একটি ভয়েস মেসেজ পাঠান। চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় পাঠানো সেই আর্তনাদ এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভয়েস মেসেজে তিনি বলেন, “পারভেজ তুরা কোথায়… তুর কাছে গাড়ি আছে না? থাকলে একটু মুলাদ্দা আয়… আমরা গাড়ি থেকে নামতে পর্যন্ত পারছি না…”। কিন্তু সাহায্য পৌঁছানোর আগেই চার ভাইয়ের মৃত্যু হয়।

ওমানে বাংলাদেশ দূতাবাসের লেবার কাউন্সিলর রাফিউল ইসলাম জানিয়েছেন, মরদেহগুলোতে কোনো আঘাতের চিহ্ন পাওয়া যায়নি। ময়নাতদন্তের প্রাথমিক প্রতিবেদনে গাড়ির এসি থেকে নির্গত বিষাক্ত গ্যাসকে মৃত্যুর কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্তমানে মরদেহগুলো ওমান পুলিশের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।

দূতাবাস সূত্রে জানা গেছে, স্পন্সরের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও ডেথ সার্টিফিকেট প্রস্তুতের কাজ চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী রোববার বা সোমবারের মধ্যে চার ভাইয়ের মরদেহ দেশে পৌঁছাতে পারে।

এদিকে বৃহস্পতিবার সকালে বান্দারাজার পাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায় হৃদয়বিদারক দৃশ্য। পুরো গ্রাম যেন শোকে স্তব্ধ। একমাত্র জীবিত ভাই এনাম শোকে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন। অসুস্থ মা ফরিদা বেগমকে এখনো পুরো ঘটনা জানানো হয়নি। তার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে বাড়ির ভেতরে বাইরের লোকজনের প্রবেশ সীমিত রাখা হয়েছে। তবুও শত শত মানুষ বাড়ির সামনে ভিড় করছেন নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানাতে।

ছোট ভাই মো. এনাম জানান, পাঁচ ভাইয়ের মধ্যে চারজনই দীর্ঘদিন ধরে ওমানে কর্মরত ছিলেন। তিনি নিজে একটি মাদ্রাসায় শিক্ষকতার পাশাপাশি কম্পিউটারের ব্যবসা করেন। সিরাজ ও শহিদের দেশে ফেরার প্রস্তুতি চলছিল এবং কেনাকাটার উদ্দেশ্যে চার ভাই একসঙ্গে বের হয়েছিলেন। এর মধ্যেই ঘটে যায় এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা।

লাশ দেশে ফেরানোর বিষয়ে সহায়তাকারী স্বজন মো. সাগর বলেন, “পুলিশের মাধ্যমে আমরা ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পেয়েছি। এসির বিষাক্ত গ্যাসের কারণেই তাদের মৃত্যু হয়েছে। হাসপাতালে সিরিয়াল পেতে দেরি হওয়ায় তারা গাড়ির ভেতরে অপেক্ষা করছিলেন। পরে দীর্ঘক্ষণ গাড়ির ভেতরে থাকায় তারা অসুস্থ হয়ে পড়েন।”

তিনি আরও জানান, স্থানীয় লোকজন গাড়ির ভেতরে চারজনকে অচেতন অবস্থায় দেখে পুলিশে খবর দেয়। পরে পুলিশ দরজা ভেঙে তাদের উদ্ধার করে হাসপাতালে নিয়ে গেলে চিকিৎসক তাদের মৃত ঘোষণা করেন।

ওমানের চট্টগ্রাম সমিতির সভাপতি মো. ইয়াসিন চৌধুরী এ ঘটনাকে প্রবাস জীবনের অন্যতম বড় ট্র্যাজেডি হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

চার ভাইয়ের একসঙ্গে মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের স্বপ্নভঙ্গ নয়, বরং পুরো রাঙ্গুনিয়াবাসীর হৃদয়ে গভীর শোকের ক্ষত তৈরি করেছে। এখন পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসীর একটাই অপেক্ষা—কবে দেশে ফিরবে চার কফিন, আর কবে শেষ বিদায়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হবেন এই চার প্রবাসী রেমিট্যান্স যোদ্ধা।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *