মোহাম্মদ হোসেন সুমন:
কক্সবাজার জেলা কারাগারের পশ্চিম পাশে দেয়ালঘেঁষা মাটিয়াতলী এলাকায় সরকারি খাসজমিতে পাহাড় ও মাদার ট্রি গাছ কেটে অবৈধ স্থাপনা ও বিভিন্ন আস্তানা গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, এসব আস্তানা থেকে মাদক ব্যবসা, বিশেষ করে ইয়াবা পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড পরিচালিত হচ্ছে। অপরাধীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গাছের সঙ্গে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। প্রশাসনের কোনো কর্মকর্তা বা অপরিচিত ব্যক্তি এলাকায় প্রবেশ করলে সিসিটিভির মাধ্যমে তা নজরদারি করে সতর্ক হয়ে যায় অপরাধীরা—এমন দাবি এলাকাবাসীর।
স্থানীয়দের অভিযোগ, মাটিয়াতলী এলাকার পাহাড়ি অংশ ক্রমেই মাদক ও সন্ত্রাসের অভয়ারণ্যে পরিণত হচ্ছে। একাধিক অপরাধী চক্র এবং বিভিন্ন মামলার আসামিরা সেখানে সক্রিয় রয়েছে বলে দাবি তাদের। এসব কারণে এলাকাটি ভবিষ্যতে ‘দ্বিতীয় জঙ্গল সলিমপুরে’ পরিণত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল।
এলাকাবাসীর দাবি, একটি প্রভাবশালী চক্র দীর্ঘদিন ধরে পাহাড় দখল করে বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। তাদের অভিযোগ, শামশু সওদাগরের কথিত অপরাধ চক্রসহ আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সমন্বয়ে একাধিক সিন্ডিকেট সেখানে পাহাড় কেটে মাটি ও খণ্ড খণ্ড জমি বিক্রি, মাদার ট্রি গাছ নিধন, মাদক ও অস্ত্র কারবারিদের আস্তানা তৈরির সঙ্গে জড়িত।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, এসব চক্রের সঙ্গে জড়িত অনেকের বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকসহ বিভিন্ন মামলা রয়েছে। প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে বা প্রতিবাদ করতে সাহস পাচ্ছেন না সাধারণ মানুষ। দ্রুত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ ও পাহাড় কাটা বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে মাটিয়াতলী এলাকা ভবিষ্যতে জঙ্গল সলিমপুরের মতো অপরাধপ্রবণ এলাকায় পরিণত হতে পারে বলে উদ্বেগ জানিয়েছেন তারা।
জেলা প্রশাসনের চিঠি, ছয় মাসেও ব্যবস্থা নেই
এদিকে মাটিয়াতলী এলাকায় পাহাড় কাটা, মাদার ট্রি গাছ নিধন ও অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগের বিষয়ে গত ২০ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে ১২৩ নম্বর স্মারকে কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কক্সবাজার সদর উপজেলা ভূমি কর্মকর্তার কাছে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য চিঠি দেওয়া হয়।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, চিঠি দেওয়ার প্রায় ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও দৃশ্যমান কোনো উচ্ছেদ অভিযান বা কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এতে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও সাধারণ মানুষের মধ্যে প্রশ্ন ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
জেলা প্রশাসনের চিঠির বিষয়ে জানতে চাইলে কক্সবাজার সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন সুলতানা বলেন, অবৈধভাবে পাহাড় কাটা, মাদার ট্রি গাছ নিধন এবং প্রকৃতি ও পরিবেশ ধ্বংস করে অবৈধ স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগের বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় থেকে একটি চিঠি তার কাছে এসেছে। এ বিষয়ে তহসিলদারের মাধ্যমে সরেজমিন তদন্ত করা হয়েছে এবং তদন্ত প্রতিবেদনও পাওয়া গেছে। ওই প্রতিবেদনের ভিত্তিতে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
আবুল কাশেমের বিরুদ্ধে ছয় মামলা
অভিযোগে উঠে আসা আবুল কাশেমের বিষয়ে কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসি (অপারেশন) বাদল শোভনের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আবুল কাশেমের কথিত আস্তানা সম্পর্কে পুলিশ অবগত হয়েছে। তার বিরুদ্ধে অস্ত্র ও মাদকসহ মোট ছয়টি মামলা রয়েছে। বর্তমানে তিনি ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি। তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কারাগারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ
কক্সবাজার জেলা কারাগারের আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ বসতি ও বিভিন্ন স্থাপনা গড়ে ওঠায় কারাগারের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ দেখা দিয়েছে।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেল সুপার মো. ওবায়দুল হক বলেন, কারাগারের আশপাশের পাহাড়ি এলাকায় অবৈধ বসতি গড়ে ওঠায় নিরাপত্তাঝুঁকি সৃষ্টি হয়েছে। কারা কর্তৃপক্ষ কারাগারের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারলেও বাইরের পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা তাদের পক্ষে সম্ভব নয়। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনকে জানানো হয়েছে। কারাগারের নিরাপত্তার স্বার্থে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছে, কক্সবাজার জেলা কারাগারের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনার পাশের পাহাড়ি এলাকায় যদি অবৈধ দখল, পাহাড় কাটা, মাদক ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রণ করা না যায়, তাহলে ভবিষ্যতে তা বড় ধরনের নিরাপত্তাঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তাই সরকারি খাসজমি ও পাহাড় রক্ষা, অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ এবং অপরাধী চক্রের বিরুদ্ধে দ্রুত সমন্বিত অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন তারা।